ইন্ডিয়ায় সংক্রমণ-মৃত্যু বাড়ছে, তবুও উঠে যাচ্ছে বিধিনিষেধ

ইন্ডিয়ায় সংক্রমণ-মৃত্যু বাড়ছে, তবুও উঠে যাচ্ছে বিধিনিষেধ

উত্তরদক্ষিণ রবিবার ৩১ মে ২০২০। আপডেট ১৪:০০

করোনাইরাস মহামারিতে সংক্রমণ রোধ করতে ইন্ডিয়ায় যে লকডাউন চলছে দুমাসেরও বেশি সময় ধরে, তার পঞ্চম পর্যায় শুরুর ঘোষণা করা হয়েছে শনিবার (৩০) সন্ধ্যায়। এই পর্যায়টিকে অবশ্য বলা হচ্ছে ‘আনলক- ১’। কারণ, কনটেনমেন্ট জোনের বাইরে বহু পরিষেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে প্রতিদিন যখন করোনা সংক্রমণে ও মৃত্যুর হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তখনই এই ঘোষণা এসেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে।

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইন্ডিয়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি, মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ১৮৫ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ২০৫ জনের। রবিবার (৩১ মে) ওয়ার্ল্ডওমিটারে সবশেষ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ইন্ডিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৩৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২০৫ জনের।

এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, কীভাবে সোয়া দু`মাস লকডাউনের পরে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে এগোনো হবে। যেসব এলাকা সংক্রমণের জন্য ঘিরে দেওয়া হয়েছে, সেখানে জুনের শেষ পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। জরুরি পরিষেবা ছাড়া অন্য কিছুই সেখানে খোলা থাকবে না।

‘আনলক’ করার প্রথম পর্যায় শুরু হবে ৮ জুন থেকে। সেদিন থেকে ধর্মীয় স্থান, হোটেল, রেস্তোঁরা, বিপনীবিতান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রাত্রিকালীন কার্ফূয়ের সময়ও কমিয়ে রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, জুলাই মাসে ভাবনা চিন্তা করা হবে- কবে থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে।

আর তৃতীয় দফায় খতিয়ে দেখা হবে- আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা, মেট্রো রেল, সিনেমা হল, ধর্মীয় বা সামাজিক- রাজনৈতিক জমায়েত করতে দেওয়া হবে কি না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিয়ান পাবলিক হেল্থ এসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ বলছিলেন, “মহামারি রোধ করতে লকডাউনের উদ্দেশ্য হল কিছুটা সময় কেনা, যাতে এই সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়। দেশের যা জনসংখ্যা, তার পাঁচ শতাংশও যদি সংক্রমিত হন, তাদের তো হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করতে হবে। সেই ব্যবস্থা তো দেশে নেই। লকডাউনের সময়ে সেটাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তো আমাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেই হবে।”

ডা. ঘোষ বলেন, “লকডাউন কোনও দীর্ঘকালীন ব্যবস্থা হতে পারে না। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে মহামারি রুখতে পরামর্শ দুটো – আরও বেশী সংখ্যায় পরীক্ষা করো, সংক্রমিত এলাকাকে ঘিরে রাখো, কাশির সময়ে সচেতন থাক আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখো। আমাদের এই ভাইরাস নিয়ে থাকতে হবে, আবার স্বাভাবিক অবস্থায়ও ফিরতে হবে। এগুলোই আমাদের ‘নিউ-নর্ম্যাল’।”

কেন্দ্রীয় সরকার ‘আনলক’ ঘোষণার আগে শুক্রবারই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ১ জুন থেকেই বেশ কিছু শিথিলতার ঘোষণা করেছিলেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশ আসার পরে রাজ্যের সেই সব ঘোষণা সরকারি নির্দেশ হিসেবে প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ।

সেখানে বলা হয়েছে, ৮ জুন থেকে সরকারি দপ্তরগুলিতে ৭০% কর্মী আসতে পারবেন। বেসরকারি সংস্থাগুলিতে কত কর্মী আনা হবে, সেটা মালিকরাই ঠিক করবেন। দোকান, বাজার ইতিমধ্যেই অনেকাংশে খুলে গেছে। চটকল, নির্মাণ শিল্প আর চাবাগানে ১০০% শ্রমিক দিয়েই কাজ করানো যাবে বলেও ঘোষণা করা হয়েছে।

রাজ্যের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস চলাচলের বিষয়ে বলা হয়েছে যত বসার আসন আছে, সেই সংখ্যায় লোক নেওয়া যাবে বলে যে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, তাতে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা কঠিন বলে মন্তব্য ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষের। “এই সিদ্ধান্তটা ভুল। যত আসন আছে বাসে, সেখানে যদি গা ঘেঁষে বসেন যাত্রীরা, তাহলে সামাজিক দূরত্ব মানা কখনই সম্ভব নয়। এই সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”

যেভাবে লকডাউন তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে পরিকল্পনার অভাব আছে বলে মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্স এর সাধারণ সম্পাদক ডা. মানস গুমটার।

তিনি বলেছেন, এইভাবে লকডাউন তুলে নেওয়া হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমিতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়বে। “যেভাবে অপরিকল্পিত ভাবে লকডাউন চালু হয়েছিল দেশে, তার জন্য সাধারণ মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক – সবাইকেই চূড়ান্ত দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে। আবার লকডাউন তোলার সময়েও যদি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে,” বলছিলেন ডা. গুমটা।

“লকডাউন তোলার আগে মানুষকে তো আশ্বস্ত করার দরকার ছিল যে আমরা ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে প্রস্তুত। লকডাউনের উদ্দেশ্যই তো ছিল কিছুটা সময় কেনা – যাতে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়। তার পরিবর্তে একটা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানুষের ওপরেই সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হল।”

কেন্দ্র আর রাজ্য – দুই সরকারের নির্দেশনায় কিছু ফারাক থাকায় কার নির্দেশ কার্যকরী হবে, তা নিয়ে আইনী জটিলতাও দেখা দিয়েছে।

আইনজীবিদের একাংশ বলছেন, যেহেতু দেশে এখন জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা আইন চালু আছে, তাই কেন্দ্রীয় নির্দেশই গ্রাহ্য হবে। কোনও রাজ্য কঠোরতর নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাকে লঘু করতে পারে না। আবার অন্য অংশের মন্তব্য রাজ্য সরকারগুলোকে পরিস্থিতি যাচাই করে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারই তো দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading