বিল গেটসকে নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নেপথ্যে

বিল গেটসকে নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নেপথ্যে
বিল গেটস । মাইক্রোসফট

উত্তরদক্ষিণ : রবিবার ০৭ জুন ২০২০ । ১৯:০৬

বিল গেটস, বিশ্ব জুড়ে এক নামেই পরিচিতি। কম্পিউটার জগতের অন্যতম অধিপতি গেটস মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। বিশ্বের শীর্ষ ধনী। অঢেল টাকাপয়সার মালিক এই ব্যক্তিত্ব নিয়ে নানা রকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চালু রয়েছে। তার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ যে সব প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের চর্চা থেমে থাকেনি। এমনকি করোনা ভাইরাসের টিকা নিয়েও অভিযোগ ওঠেছে।

বিল গেটস ও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত সংবাদ মাধ্যম ‘বিবিসি’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিবিসি’র কৃতজ্ঞা প্রকাশ করে প্রতিবেদনটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলঃ

২০১৫ সালে ভ্যাংকুভারে টেড (টেকনোলজি, এন্টারটেইনমেন্ট, ডিজাইন) কনফারেন্সে হাজির হলেন বিল গেটস। তার হাবভাব দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনিই বিল গেটস। সম্মেলন থেকে তিনি এক চরম হুঁশিয়ারি দিলেন।

সম্মেলনে তিনি বললেন,“আগামী কয়েক দশকের মধ্যে যদি কোন কিছুর কারণে এক কোটি মানুষ মারা যায়, সেটি কোন যুদ্ধের ফলে নয়, বরং কোন সংক্রামক ভাইরাসের কারণে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”

তার এই দূরদর্শী বক্তব্য সেসময় বিবিসি সহ কিছু সংবাদ মাধ্যমে প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তার কথায় খুব একটা কান দেননি।

কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির পর তার সেই বক্তৃতা লোকে শুনেছে অন্তত ৬ কোটি ৪০ লক্ষ বার। বেশিরভাগ মানুষের আগ্রহ বিল গেটস কি বলেছেন সেটাতে নয়, কেন তিনি এমনটি বলেছিলেন, সে বিষয়ে।

বিল গেটসকে নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। অনেকের অভিযোগ, বিল গেটস আসলে বিশ্বের এলিট বা সুবিধাভোগী শ্রেণীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্য কিছু মানুষের বিশ্বাস, বিল গেটস আসলে পৃথিবীকে জনশূন্য করার চেষ্টা করছেন।

আবার অন্য একদল আছেন, যাদের অভিযোগ, বিল গেটস টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করছেন। কেউ কেউ আরও একধাপ এগিয়ে অভিযোগ তুলছেন, বিল গেটস সব মানুষের শরীরে মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দিতে চান।

‘জাদুর পুতুল‌’ বিল গেটস

বিল গেটসকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।
বিল গেটস

রোরি স্মিথ ‘ফার্স্ট ড্রাফট নিউজ’ নামের এক ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইকারি ওয়েবসাইটে কাজ করেন। তিনি বলছেন, বিল গেটসকে নিয়ে বহু রকমের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হয়েছে।

‍“তিনি এমন এক জাদুর পুতুল, যাকে নানা ধরণের গোষ্ঠী তাদের হরেক রকমের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে খুঁচিয়ে চলেছে। আর তিনি যে জাদুর পুতুলে পরিণত হয়েছেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে করতে তিনি এর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।”

করোনাভাইরাসের সঙ্গে বিল গেটসকে জড়িয়ে যেসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো গত ফেব্রুয়ারি হতে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে টেলিভিশন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তত ১২ লক্ষ বার উল্লেখ করা হয়েছে। এই সমীক্ষাটি চালিয়েছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং জিগনাল ল্যাবস।

এরকম ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সাধারণত ফেসবুক গ্রুপে ছড়ানো হয়, এরপর সেগুলো শেয়ার করা হয় লক্ষ লক্ষ বার।

ফার্স্ট ড্রাফট নিউজ দেখেছে, টিকটক নামের চীনা ভাইরাল ভিডিও সাইটটি এধরণের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নতুন আখড়া হয়ে উঠেছে।

Cartoons

বিল গেটসকে নিয়ে যতরকমের আজগুবি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চালু আছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে বিবিসির এন্টি-ডিসইনফরমেশন বা ভুয়া তথ্য বিরোধী টিম।

  • এরকম তত্ত্বের মধ্যে একটি হচ্ছে, ‘বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’ আফ্রিকা এবং ভারতে শিশুদের ওপর টিকা নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছে। এর ফলে সেখানে হাজার হাজার শিশু হয় মারা গেছে, নয়তো অপূরণীয় শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। একটি পোস্টে তো এমন দাবিও করা হয়েছে যে এ কারণে ভারতে বিল গেটসের বিচার চলছে।
  • বিল গেটসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, কেনিয়ায় তিনি এক টিটেনাসের টিকা চালু করেছেন যার মধ্যে আসলে আছে গর্ভপাতের ঔষধ।
  • ‘দ্য নিউ আমেরিকান ম্যাগাজিন‌’ বলে এক ওয়েবসাইটের ফেসবুক পাতায় একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এখানেও সেই একই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব- বিল গেটস টিকা আর গর্ভপাতের মাধ্যমে বিশ্বকে মানবশূন্য করতে চাইছেন। এটিতে আবার বিল গেটসের সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির গাঁটছড়া আছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ভিডিও শেয়ার হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার বার এবং দুই লাখ বারের বেশি এটি দেখা হয়েছে।
  • এদিকে আবার আরেকটি ভিডিওতে অভিযোগ করা হচ্ছে বিল গেটস মানুষের শরীরে মাইক্রোচিপ ঢোকাতে চান। ইউটিউবে এই ভিডিওটি বিশ লাখ বার দেখা হয়েছে।

বিল গেটস কেন টার্গেট

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, যিনি কীনা তার নিজের এবং স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠিত দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের জন্য শত শত কোটি ডলার ঢেলেছেন, তিনি কিভাবে কোভিড-১৯ ষড়যন্ত্র তত্ত্বকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেন?

ইউনিভার্সিটি অব মায়ামির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোসেফ উসিনস্কি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে বেশ কিছু বই লিখেছেন। তার মতে, বিল গেটস ধনী এবং বিখ্যাত বলেই ষড়যন্ত্রকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।

‌“বেশিরভাগ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আসলে ক্ষমতাবান লোকদের নিয়েই, তাদের বিরুদ্ধে মারাত্মক কোন কিছুর অভিযোগ আনা হয়‌”, বলছেন তিনি। “আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো প্রায় একই রকম, শুধু নামগুলো বদলে যায়।”

“বিল গেটসের আগে ছিল জর্জ সোরোস, কিংবা রথচাইল্ডস বা রকেফেলারদের নাম।”

বেশিরভাগ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মৃত্যু ঘটে আসলে খুব বেশি ডালপালা গজাবার আগেই। তবে কিছু টিকে থাকে। সাধারণত যেসব তত্ত্বে ভিলেনরা থাকে খুব বড় কেউ এবং যে ইস্যুতে মানুষের খুব বেশি আগ্রহ থাকে, সেরকম ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো বেশ দীর্ঘ আয়ু পায়।

জোসেফ উসিনস্কি বলেন, “ধনী লোকজন এবং বড় কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে মানুষের শরীরে মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রের এই যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, এর কারণ এরকম আশংকা আমাদের মধ্যে আছে।”

“এরকম ভয় বা আশংকা আসলে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এক বিরাট মশলা।”

জোসেফ উসিনস্কি মনে করেন এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই, কিন্তু তারপরও মানুষ এগুলো বিশ্বাস করতে পছন্দ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক চতুর্থাংশ মানুষ এবং ৪৪ শতাংশ রিপাবলিকান বিশ্বাস করে বিল গেটস কোভিড-১৯ টিকা ব্যবহার করে মানুষের চামড়া নিচে মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দিতে চায়। এই জরিপটি চালিয়েছিল ইয়াহু নিউজ এবং ইউগভ।

কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্বে হয়তো একদানা সত্য আছে, যেটিকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফাঁদা হয়েছে।

যেমন, বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন গত বছর একটি গবেষণার জন্য তহবিল দিয়েছিল, যেটি চালিয়েছিল ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। কোন রোগীর টিকা নেয়ার রেকর্ড বা ইতিহাস বিশেষ কোন রঙের প্যাটার্নের মধ্যে সংরক্ষণ করা যায় কীনা, সেটা দেখা ছিল এই গবেষণার লক্ষ্য। সাদা চোখে এটি দেখা যাবে না এবং এটি টিকা দেয়ার সময় একসঙ্গে মানুষের চামড়ার নীচে ঢুকিয়ে দেয়া যাবে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের শুরুটা কিভাবে তা অনুমান করা কঠিন। কিন্তু ইন্টারনেট অনেক সহজ করে দিয়েছে এরকম আজগুবি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বহু মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি।

“ইন্টারনেট যুগের আগে এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তাদের নিজেদের মধ্যেই আবদ্ধ থাকতো, কিন্তু এখন ইন্টারনেটের বদৌলতে ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তার মানুষ, ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দ্রুত এসব ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাজেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এখন ইন্টারনেটের আগের জমানার চেয়ে অনেক বেশি মূলধারায় চলে আসার সুযোগ পাচ্ছে।”

তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিশ্ব মহামারির সময় আরও বেশি বাড়ছে, কারণ মানুষ এখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেক বেশি নাজুক অবস্থায় আছে।

তার মতে মানুষ এরকম সংকটের সময় সবার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কোন কিছুর অর্থ বোঝার চেষ্টা করে।

কোভিডের টিকা নিয়ে ল্যাবে পরীক্ষা
Image captionবিবিসিকে বিল গেটস বলেছিলেন মানুষ যদি এরকম একটা ষড়যন্ত্রের কথা শোনে এবং লোকে টিকা নিতে না চায় তখন তো এই রোগে মানুষ মরা অব্যাহত থাকবে।

“যে কোন তথ্য পেলেই আমরা তার মানে বোঝার চেষ্টা করি, আর তখনই শুরু হয় গুজব ছড়ানোর কাজ। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তখন এই শূন্যস্থান পূরণ করতে থাকে, বিশেষ করে বিল গেটস জাতীয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।”

বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় এপর্যন্ত ৩০ কোটি ডলার দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। একের পর এক মিথ্যে প্রচার আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মুখেও এই ফাউন্ডেশন তাদের কাজের নিয়ে খুবই আশাবাদী।

বিবিসির কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন বলেছে, “আমাদের সম্পর্কে অনলাইনে যেসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে এবং এর ফলে জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হতে পারে সেটা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।”

“এরকম একটা সময়, যখন বিশ্ব এক অভূতপূর্ব স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সংকটের মুখে, তখন কিছু লোক যে এভাবে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, তা খুবই পীড়াদায়ক। অথচ এখন আমাদের সবার উচিত মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সহযোগিতা করা। কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে যে ভালো কাজটা এখন আমরা সবাই করতে পারি তা হলো সঠিক তথ্য প্রচার করা।”

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস বলেন, তাকে ঘিরে যে এতসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে সেটি জেনে তিনি বিস্মিত।

“এরকম পাগলামি যে চলছে, তা আসলেই যন্ত্রণাদায়ক। আমরা যখন টিকা তৈরি করবো, আমরা চাই মোট জনসংখ্যার ৮০ ভাগ মানুষ এই টিকা নিক। এখন যদি তারা এরকম একটা ষড়যন্ত্রের কথা শোনে এবং লোকে টিকা নিতে না চায় তখন তো এই রোগে মানুষ মরা অব্যাহত থাকবে।”

“আমি একরকম বিস্মিত যে, এসব আমাকে ঘিরেই বলা হচ্ছে। আমরা তো কেবল অর্থ দিচ্ছি, চেক লিখছি.. হ্যাঁ, আমরা চাই শিশুদের যেন রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু এর সঙ্গে তো মাইক্রোচিপ বা সেরকম কিছুর সম্পর্ক নেই। এসব শুনলে মাঝে-মাঝে হাসি পায়।”

SekFaruk

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading