আমরা মানুষ হব কবে?
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার ১৯ জুন ২০২০ । ২১:৩০
মোহাম্মদ শিহাব: ভুল চিকিৎসা বা অবহেলায় হাসপাতাল-ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু নতুন নয়। এমন অভিযোগ সব সময়ই কম-বেশি শুনি আমরা। বিশেষ করে যারা মিডিয়াকর্মী তাদের কাছে এসব অভিযোগ একটু বেশিই আসে। এমন অভিযোগে কখনও কখনও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামলা, ভাঙচুর কিংবা সংঘর্ষও হয়। এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত মামলা, গ্রেপ্তার ও আদালত পর্যন্ত গড়ানো বা রাজনৈতিক মীমাংসা একটি পুরোনো ইস্যু। সব সময় অভিযোগ যে মিথ্যা হয়, এমনটা নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসক, নার্স বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা ভুলের প্রমাণ মিলে। অবশ্য সব সময় সব অভিযোগ যে সত্য হয়- এমনটাও নয়। কিন্তু গত ১৫ জুনের আগে কেউ কি কোনওদিন শুনেছেন যে, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর কারণে চিকিৎসককেই পিটিয়ে হত্যা করেছে মৃতের স্বজনারা? আমি এমন ঘটনটা দ্বিতীয়টা শুনিনি। হয়তো এমনটা স্মরণ অতীতকালে হলে হতেও পারে..! কথা হচ্ছে- এটা কি সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ করতে পারেন?
প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মানুষ একথা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের জন্ম-মৃত্যু মহান স্রষ্টার এখতিয়ারে। মানুষ ইচ্ছা করলেই অন্য মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আবার ইচ্ছে করলেও বাঁচাতে পারে না। যদি মানুষ তথা চিকিৎসক ইচ্ছে করলেই রোগীকে বাঁচাতে পারতেন তাহলে অন্তত চিকিৎসক নিজে এবং তার আত্মীয়-স্বজন কখনই মারা যেতেন না। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? না। পৃথিবীর কোনও মানুষই অনন্তকাল বেঁচে থাকে না। কেউ কাউকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। একদিন না একদিন প্রত্যেক মানুষ তথা প্রতিটি প্রাণীকেই মরতে হয়, হবে। আমরাও মরে যাবো একদিন। সেই মৃত্যুর কারণ যাই হোক না কেন। সুতরাং একজন মৃত্যুর পর সেই মৃত্যুতে আরেকজনের ভুল চিকিৎসা ছিল এই ধারণায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলতে হবে- এটা কোন ধরনের মানসিকতা? এত পশুর চেয়েও অধম ছাড়া আর কি!
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আমি মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ আকৃতিতে/গঠনে সৃষ্টি করেছি। আর (মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে) তাদের নিকৃষ্টতম অবস্থায় পৌঁছে দেই।’ অন্যত্র বলেছেন, ‘তারা (কতিপয় মানুষ) চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ার বা এর চেয়েও নিকৃষ্ট।’
আমরা একটা কথা জানি, আল্লাহ’র অসংখ্য সৃষ্টি জীবের মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হচ্ছে মানুষের ভালো-মন্দ বিবারের জ্ঞান, বুদ্ধি বা বিবেক। কিন্তু মানুষ যখন সেই জ্ঞান বা বিবেককে কাজে লাগায় না, তখন সেই মানুষ প্রকৃত অর্থেই হিংস্র জানোয়ারের চেয়ে নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ড ঘটায়। এটি শুধু খুলনায় ডা. আব্দুর রকিব খান হত্যার ক্ষেত্রেই নয়। মানুষরূপী এক শ্রেণীর জানোয়ারের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজ অশান্ত হচ্ছে। খুন, ধর্ষণ, অবৈধ কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি- এসব তারই প্রমাণ।
এরা অপকর্ম বা অন্যায় কারার আগে একবারও ভাবে না এর ফলাফল কী হতে পারে? যদি কোনও মানুষ পরকালে বিশ্বাস নাও করে, শুধু পার্থিব জীবনে সচেতন হন তাহলেও এসব কাজ ওই মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কারণ, একটি রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে যেটি শস্তিযোগ্য অপরাধ, কোনও সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ সেই কাজ করতে পারে না। তিনি তো যেকোনও কাজ করার আগে এর ফলাফল কী হতে পারে সেটা ভাববেন। কিন্তু যারা সেই ফলাফল না ভেবেই হুট করে যখন যা খুশি করে ফেলে- এরা প্রকৃত মানুষ নয়। এদের কোনও স্বাধীন দেশে বা মনুষ্য সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার থাকতে পারে না।
আমি মনে করি, রাষ্ট্র তার আইন ও বিচার ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এসব বিবেক বর্জিত মানুষরূপী ‘জানোয়ার’ মুক্ত সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে- সেটাই প্রত্যাশা শান্তি প্রিয় দেশবাসীর। লেখক: সাংবাদিক।

