‘অধ্যাপক গোপাল শংকর স্যারের মৃত্যু, আমরা হতাশায় ডুবে যাই’
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার ২৮ জুন ২০২০ । আপডেট ২০:৪০
অধ্যাপক ডা. আবদুল ওহাব: ভর্তির তেরতম দিন আজ (২৮ জুন) ৷ এরমধ্যে বন্ধু আজিজ ভাবিসহ ভর্তি হলো ছয়দিন। গতকাল (২৭ জুন) আমাদের অধ্যাপক গোপাল শংকর স্যার মারা যাবার পর মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অস্থিরতা, বিচলতা বেড়ে গেছে৷ আমাদের হাতে গোনা কয়েকজন প্রফেসর। তাও স্যারের মতো একজন অমায়িক শিক্ষক যখন এভাবে বিদায় নেন আমাদের কষ্টের শেষ থাকে না। আমরা হতাশা দূর করার কারিগররাও নিজেরা হতাশায় ডুবে যাই!
রোববার সকালের দিকে ব্রিগেডিয়ার আজিজ টেলিফোনে জানালো রাত দেড়টার দিকে তার অক্সিজেন লেগেছে- এখন ভালো। দুপুরে দেখা করতে গিয়ে শুনলাম সিটি স্ক্যান করতে রেডিওলোজি ডিপার্টমেন্টে গেছে। আমার আর কিছু ভাবতে ভালো লাগছে না। মেজর জেনারেল মুসা, আমি (অবসর প্রাপ্ত মেজর আবদুল ওহাব), ব্রিগেডিয়ার আজিজ, ব্রিগেডিয়ার তাহা, ব্রিগেডিয়ার লতিফ একসাথে আইএসএসবি করি। সবার ভূমিকা চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে ৷ আজিজ ওর ভারী শরীর নিয়ে একটা জাম্প দিয়ে আমাদের গ্রুপকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
আজিজের সাথে আমার বন্ধুত্ব লিখে প্রকাশের মতো কোনও বিষয় না। আমাদের দু’জনার পারিবারিক সম্পর্ক গভীরের- বড় ছেলেরা বন্ধু আর ছোট ছেলে দুটো নিজেরা বন্ধু। নিজেদের সমঝোতা দেখার মতো। আমি তার পরে কোর্সে আসি। একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করি।
বলেছিল- সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে আমাদের এক স্টেশনেতো পোস্টিং হবে না। আমি হেসে বলেছিলাম- তাতো ভাবিনি। আরেকদিন বন্ধুত্ব নিয়ে কথা প্রসঙ্গে সে আমাকে বন্ধু হিসেবে একশতে একশো দিয়ে দিল। আমি বিস্মিত হয়ে এক লুক দেই। কি মারাত্মক অকৃপন মার্কিং!
বন্ধু আমার ইঞ্জেক্টেবল এন্টিবায়োটিক নেয় তিনবেলা। কাল অক্সিজেন লেগেছে। ভয়েই জিজ্ঞেস করি না- জানি নাতো কী জবাব দেবে। আমি কি তার কষ্ট লাঘব করতে পারছি, নিয়ে নিতে পারছি ইঞ্জেক্টেবল এন্টিবায়োটিক? এতো অসহায় লাগছে কেন! ভয় পাচ্ছি না, হেল্পলেস লাগছে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে বিশ্ব বিজ্ঞান কত অসহায়! ভাবতেই খারাপ লাগে।
ব্রিগেডিয়ার আজিজ নিজেও অনেক সাহসী স্ট্রং মানুষ। তাকে কাছ থেকে সাহস জোগানোই আমার একমাত্র কাজ। বন্ধু আজিজের জন্য, বাংলাদেশের সকল করোনা আক্রান্ত মানুষের জন্য, বিশ্বের সকল ভুক্তভোগীদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন।
সবাই মিলে- সূরা ফাতিহা পড়ি, সূরা ইখলাস পড়ি, সূরা বাকারা থেকে আয়তাল কুরসী পড়ি, সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পড়ি ….., যেখানে আল্লাহর গুনবাচক পরিচয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে খুব নিখুঁতভাবে ৷ দরূদ শরীফ পড়ি বারবার আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকি।
আল্লাহ বলবেন “কুন্ ফা ইয়া কুন্- হও অমনি হয়ে যাবে।” আমাদের আবেদনের একাগ্রতার উপর নির্ভর করবে আমরা কি আল্লাহকে রাজি খুশি করতে পারবো। আপনারা আমার বন্ধুটির জন্য মনভরে দোআ কুরুন।
(লেখক- একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক। বর্তমানে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন)।

