বিদায় ড. এমাজউদ্দীন আহমদ

বিদায় ড. এমাজউদ্দীন আহমদ

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২০ । আপডেট: ১৩:৩৩

সৈয়দ আবদাল আহমেদ : রাষ্ট্র বিজ্ঞান আর এমাজউদ্দীন আহমদ এক সমার্থক শব্দ। জীবনের ৫০টি বছর তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন দেশ, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা ও চর্চায়। এই চর্চা ছিল তাঁর মননে, মগজে। রাজনীতির লেখা মানে এমাজউদ্দীন আহমদ। রাজনীতির সুন্দর বক্তৃতা মানে এমাজউদ্দীন আহমদ। আর বাংলাদেশের রাজনীতির বিশ্লেষণ, এককথায় এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য! তুলনামূলক রাজনীতি, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসন বিষয়ে তাই তাঁর বইয়ের সংখ্যাও কম নয়, ৫০টির অধিক।

না, তিনি আমাদের আর রাজনীতির কথা শোনাবেন না। তাঁর থেকে পাওয়া যাবে না আর রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা। কোনো সংবাদপত্রের বিশেষ সংখ্যায় দেখা যাবে না তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। তিনি ৮৭ বছর বয়সে আজ শুক্রবারের (১৭ জুলাই ২০২০) পবিত্র এ দিনে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে। মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেছেন তাঁরই কাছে।

স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাঁর লেখালেখির যেকোন ভালো উদ্যোগে তিনি আমাকে ডাকতে ভুলতেন না। আমার প্রথম জীবনীগ্রন্হ “নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া”র ভূমিকা তাঁর লিখে দেয়া। এর ৫ম সংস্করণ হয়েছে। প্রতিটি সংস্করণে তিনি ভূমিকাটাও আপডেট করে দিতেন। তাঁর এ ঋণ শোধ হবার নয়। খুব খারাপ লাগছে তাঁর মুখ থেকে আর ‘বাপু’ ডাকটি শুনব না। শুনব না বাপু এটা নিয়ে লিখো, এটা করে দাও, বাপু বাসায় এসো তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে। তাঁর চিরবিদায়ের এ মূহুর্তে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মাগফিরাত চাইছি। দয়াময় মেহেরবান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন, আমীন।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ এ উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান রাষ্ট্র বিজ্ঞানী। দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি সারাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয়। দেশের কল্যাণ হোক সবসময় তিনি চেয়েছেন। দেশের রাজনীতির দূরাবস্থা সবসময় তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। তবে তিনি ছিলেন আশাবাদী মানুষ। বলতেন এবং তাঁর প্রতিটি লেখায় উল্লেখ করতেন, “রাজনীতির এই অসুস্থতা শিগগিরই দূর হবে। দূর হবে সমাজজীবনে অগ্রহণযোগ্য শত উপসর্গ। আবারও এ সমাজে দেখা দেবে উজ্জ্বল আলোক রশ্মি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রাণ। তিনি ছিলেন এ বিদ্যাপীঠের ছাত্র এবং শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। যে কয়জন ভাইস চ্যান্সেলরের সুখ্যাতি ও নামডাক, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। তাঁর প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ড. এমাজউদ্দীন আহমদ লিখেন,”এ সমাজে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু গৌরবের তার সবকিছুতেই রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোঁয়া।”

গণতন্ত্রের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। তাই তিনি বলতেন, “জাতীয় স্বার্থেই গণতন্ত্রের চর্চা প্রয়োজন।” তিনি বলতেন, “রাজনৈতিক দলের চেয়ে শ্রেষ্টতর ও মহত্তর হলো জাতীয় স্বার্থ”। তিনি আরো বলতেন, “দলীয় স্বার্থের কারণেই দেশে হিংসাত্মক কার্যক্রমের মাত্রা আজ উচ্চতর হয়েছে। কিন্তু সবাইকে বুঝতে হবে আমরা সবাই চাই, গণতন্ত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।” ক্ষমতাসীনদের প্রতি তাঁর সবশেষ আহ্বান ছিল- “হিংসা-বিদ্ধেষ পরিহার করে উদার হোন, মানুষের কথা ভাবুন, দেশের কথা ভাবুন। সংবাদপত্রকে, গণমাধ্যমকে তার সৃষ্টিশীল স্রোতধারায় এগিয়ে যেতে দিন।”

তাঁর প্রথম জানাযা কাঁটাবন বাজমে কাদেরিয়া জামে মসজিদে হয়েছে। খতিব জানালেন, এ মসজিদে তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসতেন, তসবিহ তাহলিল পড়তেন। এ মসজিদের লীজ তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকারের কাছ থেকে তিনিই ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছিলেন। জানাযা নামাজ পড়া শেষে শেষ বারের মতো তাঁর অমায়িক চেহারার মুখখানি দেখলাম। সত্যিই পিতৃতুল্য একজন মানুষ ছিলেন তিনি। অভিভাবক বলতে যা বোঝায়, তিনি তা-ই ছিলেন। বিএফইউজের (একাংশের) পক্ষ থেকে মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, কবি আবদুল হাই শিকদার, নুরুল আমীন রোকন, কবি রফিক লিটনসহ আমরা ফুল দিয়ে স্যারকে শেষ শ্রদ্ধা জানালাম। বাদ আসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাযা ও শ্রদ্ধা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্ত্রীর কবরের পাশেই সমাহিত হবেন জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান ও গুণী এ মানুষটি।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading