টিকার মাধ্যমে পৃথিবী থেকে যেসব রোগ নির্মূল হয়েছে
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২০ । আপডেট ১৮:৪০
সাইয়েদা আক্তার : ভ্যাকসিন যেকোনও সংক্রামক রোগের আক্রমণ থেকে বাঁচতে টিকা বা ভ্যাকসিনের গুরুত্বের কথা আমরা সবাই হয়তো জানি। কিন্তু গেল দুই শতাব্দীতে পৃথিবী থেকে টিকার মাধ্যমে ক’টি রোগ নির্মূল হয়েছে, তা কি জানেন? এর উত্তর হলো, খুব বেশি নয়- মাত্র দু’টি।
ঠিকই পড়ছেন আপনি। পৃথিবী থেকে মাত্র দু’টি রোগই নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে। এর একটি হলো স্মল পক্স, বাংলায় যাকে গুটি বসন্ত বলা হয়। আর অন্যটি রাইন্ডারপেস্ট নামে একটি ব্যাধি, যা মূলত গবাদিপশুর হতো। এ মুহূর্তে অন্তত কয়েক ডজন রোগের টিকা চালু আছে পৃথিবীতে। ভিন্ন ভিন্ন রোগ প্রতিরোধে দেয়া হচ্ছে এসব ভ্যাকসিন। কিন্তু এসব রোগ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকা দেওয়ার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ শিশুর প্রাণরক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, রোগ নির্মূলই যদি করা না যায়, তাহলে টিকা দেয়া হয় কেন?
টিকা দেয়ার কারণ
বাংলাদেশে সরকারের মহামারি ও সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট বা আইইডিসিআর-এর ভাইরলজি বিভাগের প্রধান তাহমিনা শিরিন বলেছেন, সংক্রামক ব্যাধি ঠেকানোর জন্য ভ্যাকসিন বা টিকা অত্যাবশ্যক। তিনি বলেন, টিকা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তাহমিনা শিরিন আরও বলেন, ভ্যাকসিন একটি জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে মানবশরীরে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সহায়তা করে। যদি বাংলাদেশের ইপিআই বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন ইনফেকশনের কারণে দেশে শিশু মৃত্যুর হার অনেক হ্রাস পেয়েছে।
কোন রোগ কখন নির্মূল হয়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্রতিষেধক টিকার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছে সংস্থাটি। প্রথমে নির্মূল, এরপর দূরীকরণ এবং পরে নিয়ন্ত্রণ।
অন্তত এক দশক সময়ের মধ্যে বিশ্বের কোনও অঞ্চলেই যখন কোনও একটি রোগের অস্তিত্ব দেখা যাবে না, অর্থাৎ একজন মানুষও আক্রান্ত হবেন না, সাধারণত তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করে যে ওই রোগটি নির্মূল হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা যায়, প্রকৃতিতে নির্দিষ্ট কোনও রোগের জীবাণুর রিজার্ভার অর্থাৎ আধার যদি সংরক্ষিত থাকে, তাহলেই কেবল সেই রোগটি পুনরায় দেখা দিতে পারে। না হলে আর কখনো ওই রোগ ফিরে আসবে না।
ভাইরোলজিস্টরা বলেন, এক্ষেত্রে ধরে নেয়া হয় যে, কেবলমাত্র গবেষণার জন্য হয়তো কোনও পরীক্ষাগারে নির্মূল হওয়া রোগের জীবাণু সংরক্ষিত রয়েছে। এখন পর্যন্ত নির্মূল হওয়া রোগের তালিকায় রয়েছে কেবলমাত্র গুটি বসন্ত এবং রাইন্ডারপেস্ট, যে রোগ গরুর বসন্ত নামেও পরিচিত ছিল। গুটি বসন্তের টিকা আবিষ্কার হয়েছিল সেই ১৭৯৮ সালে।
রোগ দূরীকরণ
রোগ নির্মূলের পরের ধাপ দূরীকরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৬টি মহাদেশীয় অঞ্চলের মধ্যে অন্তত চারটিতে যদি কোনও রোগে এক দশক সময়ের মধ্যে কেউ আক্রান্ত না হন, তাহলে ধরে নেয়া হয় সেই রোগটি দূর হয়েছে। যেমন ধরা যাক হামের কথা- পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশে এখন আর মানুষের হাম হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হামের টিকা ব্যবহারে এ রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৮০ শতাংশ কমে আসে। বাংলাদেশে মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচির সাবেক প্রধান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশে শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের সরকার যে বিনামূল্যে টিকা দেয়, তার মাধ্যমে ডিপথেরিয়া, হামসহ বেশ কয়েকটি রোগ দূর করা সম্ভব হয়েছে। পোলিও রোগও প্রায় নির্মূল হওয়ার পথে, বলতে গেলে দেশে এখন প্রায় শোনাই যায় না।
বাংলাদেশে ১০টি টিকা বিনামূল্যে দেয়া হয়
সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশে ১০টি টিকা বিনামূল্যে দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, পোলিও, মাম্পস, নিউমোকক্কাল, হেপাটাইটিসের মতো বেশ কয়েকটি টিকা। এর ফলে নিশ্চিতভাবেই সংক্রমণ-জনিত রোগে শিশু এবং মাতৃমৃত্যু অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর আলম।
কয়েক দশক আগেও সারা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ব কিংবা মৃত্যুবরণ করতেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে বর্তমানে পোলিও, টিটেনাস, রুবেলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস বি এবং এ, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা অর্থাৎ হিব, হাম, হুপিং কাশি, নিউমোকক্কাল ডিজিজ, রোটাভাইরাস, মাম্পস, চিকেন পক্স এবং ডিপথেরিয়া দূর হয়ে গেছে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যেকোনও একটি অঞ্চলে নির্দিষ্ট রোগের উপস্থিতি না থাকা মানে পুরোপুরিভাবে ওই রোগের ঝুঁকি মুক্ত হওয়া বোঝায় না। বরং বিশ্বের অন্য কোনও অংশে ওই রোগের জীবাণুর উপস্থিতি থাকতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ
এর অর্থ হচ্ছে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিষেধক বা টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে কোনও রোগকে প্রতিরোধ করা। এর মধ্যে রয়েছে টাইফয়েড, ম্যালেরিয়ার মতো বেশ কয়েকটি রোগ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানুষের মৃত্যু হার হ্রাস করা সম্ভব হয় ভ্যাকসিনের মাধ্যমে। প্রতিষেধকের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর অন্তত ৬০ লক্ষ মৃত্যু ঠেকানো হচ্ছে। এছাড়া, বিভিন্ন রোগের আক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে নানা ধরণের গবেষণা চলছে।
ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী ব্যাধির বিরুদ্ধে এখনো কোনও ভ্যাকসিন উদ্ভাবিত হয়নি। কিন্তু যেহেতু ক্রনিক হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ফলে লিভারের ক্যান্সার হয়, তাই ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-এর প্রতিষেধকের মাধ্যমে এই ধরণের ক্যান্সার থামানো যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত গবেষণা আর প্রতিষেধকের সহজপ্রাপ্যতার কারণে উন্নত বিশ্বে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে এমন অনেক ব্যাধি এখনো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে বিরাজ করছে। সৌজন্যে: বিবিসি বাংলা।

