কাজী নজরুল: আফসোসের কবি
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৬:৪০
প্রভাষ আমিন: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামের পাশে বিশেষণের শেষ নেই। নজরুলের মনে হয় দিব্য দৃষ্টি ছিল, তাই তো তিনি নিজেই লিখে গেছেন ‘যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। …দেশপ্রেমী, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী- বিশেষণের পর বিশেষণ, টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে, বক্তার পর বক্তা!’ তাঁর আশঙ্কা সত্যি হয়েছে, বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি, সাম্যের কবি- বিশেষণের পর বিশেষণ। কিন্তু কাজী নজরুল আমার কাছে আফসোসের কবি। কেন? জীবনে আমার অনেক ভুল আছে, কিন্তু কোনো অনুতাপ নেই। আমার ধারণা এই ভুলগুলো মানবিক। তবে জীবনে কয়েকটা আফসোস আছে আমার। সবচেয়ে বড় আফসোসটা হলো অল্পের জন্য কাজী নজরুলকে দেখতে না পারা। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে মারা যান কাজী নজরুল ইসলাম। ঐ সময় আমিও পিজি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম, একই ব্লকে, একই ভবনে। নেফ্রাইটিস নামে কিডনির এক অসুখে প্রায় মরতে বসেছিলাম। ঢাকা থেকে আমার গ্রামের বাড়ি ৫০ কিলোমিটার, এখন যেতে এক ঘণ্টা লাগে। তখন তিনটি ফেরি পার হয়ে আসতে দিন পেরিয়ে যেতো। সবাই যখন ধরে নিয়েছে আমি মরে যাচ্ছি, তখন শেষ আশা হিসেবে আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় তখনকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই সম্ভবত অধ্যাপক মতিউর রহমানের অধীনে ভর্তি থেকে নতুন জীবন পেয়েছি। কাজী নজরুল যেদিন মারা যান, সেদিন বিকালে কাকা এলেন আমাকে দেখতে। বললেন, আজকে এখানে অনেক ভিড়। আমি বললাম, কেন? বললেন, তুই চিনবি না। কাজী নজরুল নামে কবি অসুস্থ ছিলেন। পিজি হাসপাতালেই ছিলেন। আজ মারা গেছেন। শুনে উত্তেজনায় আমি কাঁপতে থাকি। কাজী নজরুল ইসলাম এই হাসপাতালেই ছিলেন? আমি পারলে তখনই ছুটে যাই। কিন্তু কাকা বললেন, দাফন হয়ে গেছে। আমি প্রায় কেঁদে ফেললাম। কাকার প্রতি অনেক রাগ হলো। কাকার ধারণা ছিল, ক্লাশ থ্রি’তে পড়া একটি ছেলে হয়তো কাজী নজরুল সম্পর্কে জানবে না বা জানলেও অত আগ্রহ থাকবে না। কিন্তু আমি মনে হয় একটু ইচড়েপাকা। ছেলেবেলা থেকেই ‘আউটবই’ পড়ার বদভ্যাস ছিল। তাই নজরুল তখনই আমার অনেক প্রিয় ছিলেন। এই আফসোস আমার কখনোই যাবে না। একই ভবনে থেকেও প্রিয় কাজী নজরুল ইসলামকে দেখা হলো না।
ছেলেবেলা থেকেই নজরুল ইসলাম আমার প্রিয়। পরে যতই পড়েছি, ততই মুগ্ধতা বেড়েছে। কবিতা, গল্প তো আছেই তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় তার গান। প্রিয় গান অনেক। তাই উদাহরণ দিলে জায়গা নষ্ট হবে শুধু। তবে নজরুলকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য।
এখন তো ভারত ভেঙ্গে তিন টুকরা হয়ে এক ধরনের স্থিতি এসেছে। কিন্তু নজরুলের সময় হিন্দু আর মুসলমানরা সবসময় মুখোমুখি অবস্থানে থাকতো। এখনও হিন্দু-মুসলমানদের প্রেম হয়। কিন্তু বিয়ের সময় যে কোনো একজন ধর্মান্তরিত হয়ে যান। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের মত আধুনিক মানুষও সাবিনা ইয়াসমিনকে বিয়ে করার জন্য কবির সুমন হয়ে যান। কিন্তু নজরুল-প্রমীলার সংসারে ধর্মীয় বিশ্বাস কখনো বাধা হয়নি। নজরুলকে মুসলমানরা কাফের বলতেও ছাড়েননি। আবার তার গান ছাড়া মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব আটকে যায়।
বাংলায় হামদ-নাত বলতে আমি যা বুঝি তার প্রায় সবই নজরুলের লেখা। আবার হিন্দুদের পুজায়ও লাগে নজরুলের গান। তার চেয়ে ভালো শ্যামা সঙ্গীত আমি খুব বেশি শুনিনি। নজরুলকে একটু উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না ‘কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দু’টোর কোনটাই নয়। আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’
সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক চেতনা মানেই নজরুল। আমার মনের কথাগুলো লিখে গেছেন অনেক আগেই ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’ আহা আমরা যদি সবাই ধর্মটাকে এভাবে আলাদা করে ফেলতে পারতাম।
নজরুলের সবচেয়ে পরিচিত বিশেষণ বিদ্রোহী কবি। কিন্তু তিনি নিজেই বলেছেন ‘আমাকে বিদ্রোহী বলে খামোখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।’ বিদ্রোহী কবির কাছেই মিললো বিদ্রোহীর সংজ্ঞা ‘বিদ্রোহী মানে কাউকে না মানা নয়। যা বুঝি না, তা মাথা উঁচু করে বুঝি না বলা।’ হায়, আমরা যে বুঝি না, সেটাই তো আমরা বুঝি না, বিদ্রোহ করবো কিভাবে?
কবি বলেছিলেন ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো, তবু আমারে দেবো না ভুলিতে।’ কিন্তু নজরুলকে ভোলা কি অত সহজ? (লেখাটি পুরোনো। তবু জাতীয় কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আবার শেয়ার করেছেন লেখক।)
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

