তিতাসের গ্যাস থেকেই মসজিদে আগুন, অন্যের উপর দায়!
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ । আপডেট ২০:১০
মসজিদ কমিটি এবং দু’জন গ্রাহকের ওপরে দায় চাপিয়ে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলো তিতাস। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের হাতে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তিতাসের তদন্ত কমিটি। এ সময় জ্বালানি সচিব আনিছুর রহমান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল ফাত্তাহ, তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. মামুন, তদন্ত কমিটির প্রধান আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার উপস্থিত ছিলেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে তিতাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই বিস্ফোরণে তিতাসের কোনও দায় নেই।
গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে এশার নামাজ আদায়ের সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩১ জন মারা গেছেন। বিস্ফোরণের পর ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধ অবস্থায় ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অন্য দগ্ধদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এক ব্যক্তি কেবল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
তিতাসের প্রতিবেদন গ্রহণ করে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, দায় শুধু এককভাবে কাউকে দেয়া যাচ্ছে না। তিতাসের পাইপলাইনে যেমন সমস্যা ছিল, তেমনি গ্রাহকেরও দায় আছে। দুই পক্ষেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তিতাসের প্রতিবেদন আমরা হাতে পেলাম। এখন সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেবো। তিনি বলেন, ডিপিডিসির অবৈধ লাইনের বিষয়ে তদন্ত চলছে এখনো। কেউ দায়ী হলে তিতাসের মতোই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে তিতাসের ৮ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে সাসপেন্ড করেছি। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, তিতাসের লিকেজ মেরামতসহ পুরোনো পাইপলাইন বদলে নতুন পাইপলাইন করার বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে৷ অনুমোদন পেয়েছি আমরা। এখন দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্ত প্রধান আব্দুল ওহাব বলেন, এই দুর্ঘটনার পরপরই আমাকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি গত ৯ দিন কাজ করেছি। আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার চেষ্টা করেছি। মূলত গ্যাসের লিকেজ কিভাবে হলো- তা দেখতে মসজিদের আশেপাশের সব মাটি তুলে ফেলে অনুসন্ধান করেছি। এতে আমরা দেখতে পাই মসজিদ নির্মাণের সময় আমাদের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তারা। সেখানে আমরা চার জায়গায় পাইপের র্যাপিং উঠে গিয়ে মরিচা পড়ে লিকেজের তথ্য পাই। এদিকে মসজিদের অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় নানা দিক থেকেই গ্যাস লিকেজ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এর বাইরে বিদ্যুতের দুই লাইন থাকায় একটি লাইনে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আরেকটি লাইন চালু করতে গেলে স্পার্ক হওয়া স্বাভাবিক। এই স্পার্ক থেকে মসজিদের ভেতরে জমে থাকা গ্যাস থেকে আগুন লাগতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, ওই এলাকার মো. শওকত ও বারাক নামে দু’জন ১৯৯৬ সালে গ্যাসের দুটি লাইন নেয়। এরপর তারা তিতাসের অনুমতি ছাড়া রাইজার স্থাপন করে। পরে তারা ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাবার সময় সেই রাইজার মাটির নিচে ঢুকিয় দেয়। পরিত্যক্ত রাইজারটি বন্ধ না করে মাটির নিচে দেওয়ার কারণেও গ্যাসের লিকেজ হতে পারে। সুতরাং গ্যাস লিকেজের জন্য ওই দুই ব্যক্তিও দায়ী বলে তিনি জানান। তবে এতদিনে তিতাস সেই লিকেজের খবর কি জানতে পারেনি, নাকি জানার পরও তা মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি- সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
এদিকে, দুর্ঘটনার পর মসজিদ কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেন, লিকেজে মেরামতের জন্য তিতাসের স্থানীয় অফিসে জানানো হলে তারা ঘুষ চায়। ঘুষের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. মামুন বলেন, আমরা ঘুষের বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করে দেখেছি। অনেকে গণমাধ্যমের সামনে এই অভিযোগ করলেও বাস্তবে এর কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেনি। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেছি। এমনি গত ৬ মাসে তিতাসের ফতুল্লা অফিসের অভিযোগ কল রেকর্ড চেক করেছি। এমন কোনও অভিযোগ কেউ করেনি। তিনি বলেন, আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। তিতাসের ৮জন এখন বরখাস্ত আছে। সত্যিই কেউ যদি দোষী হয়- তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

