সামাজিক ব্যাধি ‘সাইবার বুলিং’: সচেতনতাই রুখতে পারে

সামাজিক ব্যাধি ‘সাইবার বুলিং’: সচেতনতাই রুখতে পারে

শব্দনীল | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: বুধবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

তথ্যপ্রযুক্তির উর্ধগতির সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অতপরত ভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশই তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির ব্যবহার করে নিজেদের বিভিন্ন ধরণের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। সাধারণ চোখে বিষয়টি ভালো দেখালেও সাইবার বুলিং নামক এক আতঙ্ক মাকড়সার জালের মতো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরমে কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করা, ভয় দেখানো বা মানসিক নির্যাতন বা অন্যায় কোনো কিছুতে প্রলুব্ধ করা ইত্যাদি সাধারণত সাইবার বুলিং। প্রতিনিয়ত নেটিজেনরা শিকার হচ্ছেন এই ধরনের বিড়ম্বনার। বিড়ম্বনার শিকার হওয়া নটিজেনদের ভেতরে দেশের ৬৮ শতাংশ নারী। আবার এদের অধিকাংশই ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী।
যদিও প্রথম দিকে কিশোর-কিশোরীরাই এই ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্রপট ভিন্ন। এখন মধ্যবয়সীরাও এ ফাঁদে পা দিচ্ছেন। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ সাইবার বুলিংয়ের শিকার। তথ্য বলছে দেশের ৪৯ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী সাইবার বুলিংয়ের নিয়মিত শিকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, দেশের তিন-চতুর্থাংশ নারীই সাইবার বুলিংয়ের শিকার।
সিআইডি ও পুলিশ সদর দফতরের সূত্র বলছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার নারীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, ব্লাকমেইল, ফেসবুক আইডি হ্যাক, অর্থ আদায় এবং হত্যার হুমকি উল্লেখযোগ্য। তবে এ বিষয়টি অপ্রকাশিতই থেকে যায়। মাত্র ২৬ শতাংশ অনলাইনে নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ করে অভিযোগ দায়ের করেন। বাকিরা ভয়ে থাকেন অভিযোগ করলেই তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে হবে।
সাইবার বুলিং ছাড়াও মোবাইল ফোন বা ই-মেইলেও এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এসবের ফলে নারীদের মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, অনিদ্রা ইত্যাদি নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। এমনকি আত্মহননের ঘটনাও ঘটছে কখনও কখনও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, তুচ্ছ ঘটনায় সম্পর্ক নষ্ট করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় এসব ঘটনা বারবার ঘটছে। অনেকের মতে শুধু আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই এ ধরনের অনেক ঘটনা কমে যাবে বলে মনে করেন।
রাজধানীতে একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তৃষা (ছদ্মনাম)। ভার্সিটির প্রথম বর্ষ থেকেই ক্লাসমেটের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। ছয় মাসের পর তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। একজনের সঙ্গে অন্যজনের কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনার এক বছর পর তৃষা আরেকটি নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তখন তার সাবেক প্রেমিক সফিকুল ইসলাম এই সম্পর্ক না চালানোর জন্য জবরদস্তি করেন। তৃষা রাজি না হলে, তাদের আগেকার কাটানো কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফুটেজ ভার্সিটির বন্ধুদের দেখাতে শুরু করেন সফিকুল। তার ফোন নম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সাইটেও ছড়াতে শুরু করেন। তৃষা সকলের সামনে বিব্রত হতে থাকেন। এধরণের ঘটনা প্রতিনিয়তোই ঘটছে কিন্তু তার অল্প কিছু সকলের সামনে আসে। অধিকাংশ ভুক্তভোগীরা সমাজের লজ্জা এবং ভয়ে সাইবার বুলিং এর বিড়ম্বনা চুপচাপ সহ্য করে যায়। এতে অপরাধীরা আরও সুযোগ পেয়ে যায় এবং তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। যদিও তৃষা চুপ করে থাকেনি।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অন্য একটি ঘটনার দিকে তাকালে বুঝা যায় কতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে অপরাধীরা। অতন্ত ১৫ জন তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের নামে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে ভিডিও ধারণ করে মোহাম্মদ ইয়াসিন রাতুল নামের এক তরুণ। ওইসব ভিডিও দেখিয়ে ব্লাকমেইল করে অর্থ আত্মসাৎ করে আবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্যও করে সে।
সিআইডির তথ্যসূত্রে জানা যায় তরুণীদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার পর প্রেমিকার মোবাইল ফোন দিয়েই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সুযোগ বুঝে সেই ফোন চুরি করতো রাতুল। এরপর শুরু হতো ব্লাকমেইল। কখনও নিজের পরিচয়ে, আবার কখনও অন্য পরিচয়ে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতো সে। শুধু রাতুল বা তৃষা নয় সিআইডি সদর দফতরের সূত্র বলছে, চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সাইবার পুলিশ সেন্টারের ফেসবুক পেজে ১৭ হাজার ৭০৩টি সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ এসেছে। ফোনে অভিযোগ করেছেন ৩৮ হাজার ৬১০ ভুক্তভোগী। এর মধ্যে হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ ৩৬৫টি। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৮২টি। মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১১৮টি। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে।
সাইবার বুলিংয়ে চুপ থাকার নীতিই বড় ক্ষতির অন্যতম কারণ। পরিবারের কথা ভেবে কিংবা সম্মান হারানোর ভয়ে অনেকেই সব ‘চুপচাপ’ সয়ে যাচ্চে কিংবা চেপে যাচ্ছে। যা অপরাধীদেরা আরো বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তারা আর্থিক সুবিধা আদায় করতে করতে একসময় ভিকটিমকে যৌন নির্যাতনের ফাঁদেও ফেলছে।
বাবা-মা যদি সহজেই সন্তানের বন্ধু হতে পারে তাহলে এ সংকট নস্যি। সাইবার বুলিং কী, ভার্চুয়াল জগতের পরিচিতরা কেন নিরাপদ নয় এবং একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য কেন সবার সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না- এগুলো সন্তাানদের বুঝিয়ে বলা বাবা-মা । ভার্চুয়াল জগতে সন্তান কোন মাঠে খেলছে, কার সঙ্গী হচ্ছে সেদিকেও নজর দিতে হবে বাবা-মাকে। এর জন্য গণসচেতনতা তৈরিরও কোন বিকল্প নেই।
অন্যদিকে যদি বিষয়টি পারিবারিক গণ্ডির বাইরে চলে যায়। তবে আইনের আশ্রয় নিতেই হবে। এক্ষেত্রে ‘পুলিশি ঝামেলা’ এড়িয়ে চললেই বরং বিপদ। আর তা আপনাকে বিপথেই পরিচালিত করবে। কিছু ধাপ অনুসরণ করলে এই কঠিন কাজই খুব সহজ হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রথম কাজ হচ্ছে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা। তবে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় না নিয়ে একা একা থানায় যাওয়াটাও বোকামি। সঙ্গে রাখতে হবে হয়রানির প্রমাণও। স্ক্রিন শট কিংবা মেসেজ।
হয়রানির শিকার যে কেউ এখন ৯৯৯ অথবা পুলিশের ফেসবুকে পেজে নক করলেও সহায়তা পাওয়া যায়। এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হটলাইন ১০৯২১ নম্বরে গোপনীয়তা রক্ষা করে এ ধরনের সমস্যার সমাধান করা হয়। সরাসরি বিটিআরসি’র ফোনে বা ই-মেইলে অভিযোগ করলে এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তরুণদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থ আগে ভাবা উচিৎ। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রথমেই নিজেকে বোঝাতে হবে, এটি নিজের দোষ নয়৷ কেউ যদি খুব খারাপভাবে আক্রমণ করে এবং এই নিষ্ঠুর আচরণের জন্য নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করেন তবে কষ্ট বাড়বে আপনার। আপনি ভয় পেয়ে যাবের। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্তা নিতে পারবেন না। এতে অপরাধী ব্যক্তি অন্যায় আক্রমন করার আরও বেশি সাহস পাবে।
সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আক্রান্তের পাশে থেকে তাকে সাহস দিতে হবে, যেন অপরাধী দ্বিতীয় আক্রমনের চিন্তান না করতে পাড়ে। বাবা-বা, পাড়া-প্রতিবেশি, স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভিন্ন ধরনের কর্মশালার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে এই সমস্যার সমাধান দ্রুত করা যাবে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading