আনুশকা’র মৃত্যু: তরুণ প্রজন্ম কোন পথে?…

আনুশকা’র মৃত্যু: তরুণ প্রজন্ম কোন পথে?…

মত-অমত | উত্তরদক্ষিণ
শনিবার, ০৯ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ১০:০১

আতিক ইউএ খান :: আনুশকা নূর আমিনের ঘটনাটা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটা মডেল কেইস। ভারতীয় আর পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আসক্ত কিশোর-কিশোরীদের অনেকের জন্যই এখন বিএফ, জিএফ, রিলেশন, ব্রেক আপ এমনকি রুমডেটও অনেকটা দুধভাত এর মতই। খুব সহজেই এরা মিশছে একে অপরের সাথে। মোবাইল আর ইন্টারনেট এদের পারস্পরিক যোগাযোগকে করে তুলেছে একদম সহজ৷
আবার এদের অনেকেই প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে শারীরিক সম্পর্কেও জড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে এদের শিক্ষার মাধ্যম হল পর্ণগ্রাফি। যার ফলশ্রুতিতে এরা আসক্ত হচ্ছে বিকৃত যৌনাচারের। আনুশকার মৃত্যুর কারণ হিসাবেও ফরেনসিক রিপোর্টে বলা হয়েছে বিকৃত যৌনাচারের কথা। যৌন এবং পায়ুপথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে আনুশকা।
আসামী ইফতেখার ফারদিন জিহানও ধর্ষণের স্বীকারোক্তি দিয়েছে আদালতের নিজের জবানবন্দীতে। অপ্রাপ্তবয়স্ক যে কারো সাথে সম্মতি ছাড়া, প্রতারণা করে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্কই আইনের ভাষায় ধর্ষণ হিসেবে গণ্য। যদিও এতে সে দাবী করেছে আনুশকার সম্মতি ছিল। তবে পরিস্থিতি এবং বাস্তবতা বিচার করলে দিহানের দাবী ধোপে টিকার সম্ভাবনা কম। আনুশকাকে কোন চেতনানাশক খাওয়ানো হয়েছিল এরকম সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
এদিকে লাশের সুরতহাল রিপোর্টে শরীরের অন্যান্য অংশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাই যদি এই মৃত্যু দুজনের সম্মতিতে বিকৃত যৌনাচারের ফলশ্রুতিতে হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে এর চাইতে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না৷ বলতে হবে, এই প্রজন্মকে আমরা সত্যিই চিনি না। এবং এই প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের সত্যিকার ভাল বাবা মা হতে হলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
আনুশকা আর দিহানের মধ্যে সম্ভবত এফেয়ার ছিল। মিডিয়াতে ওদের পোশাক পরিহিত ঘনিষ্ঠ ছবিও প্রকাশিত হয়েছে। আনুশকা(১৭) ও লেভেলের আর দিহান(১৯) এ লেভেলের স্টুডেন্ট, সম্ভবত বছর দুই বড় হবে। তবে আইনের দৃষ্টিতে দুজনেই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
আনুশকার বাবা-মা দুজনেই পেশাজীবি৷ বাবা-মা দুজনেই পেশাজীবি হলেই যে সন্তান বখে যাবে ব্যাপারটা এমনটাও নয়। কারণ গৃহিনী মায়ের সন্তানরাও বখে যেতে পারে এবং কর্মজীবী মায়েদের সন্তানরাও সুসন্তান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, এরকম উদাহরণও আমাদের সমাজে প্রচুর। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল, পারিবারিক শিক্ষা আর সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব।
দিহানের সাথে ২-৩ মাসের সম্পর্কের ব্যাপারটা আনুশকার পরিবার জানত না। আবার আনুশকা মাকে ফোন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নোট সংগ্রহের কথা বলে বাসা হতে বের হয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বাসায় বসেই অনেকভাবে নোট সংগ্রহ করা যায়। যদিও আনুশকার পরিবার হতে কেউ কেউ দাবী করেছে, আনুশকা কোচিং এ গিয়েছে এবং কোন মেয়ে ওকে বিভ্রান্ত করে দিহানের বাসায় নিয়ে গেছে। যদি স্বেচ্ছায় দিহানকে বিশ্বাস করে খালি বাসায় গিয়ে থাকে তবে এর ঝুঁকি সম্পর্কে সম্ভবত আনুশকাকে ঠিকভাবে বুঝানো হয়নি। খালি ফ্ল্যাট, খালি বাসা, বন্ধুর ফ্ল্যাট এসব কিছুই কিশোরী আর তরুণীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কোন মূল্যেই, কাউকেই এসব পরিস্থিতিতে বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। এসব ভুলের মূল্য অনেককেই নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েই দিতে হয়।
দিহানের বাসা খালি ছিল। পরিবার অনুপস্থিত ছিল এবং নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই দিহান আনুশকাকে সেখানে সত্য কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ডেকে নিয়ে গেছে। এরপর সম্মতি নিয়ে, ফাঁদে ফেলে কিংবা জোরজবরদস্তি করে উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। এখন পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার সম্ভাবনা মিডিয়াতে আসেনি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে সম্ভবত ভয় পেয়ে বন্ধুদের ডেকেছে এবং হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ওরা হয়ত ভাবেনি, আনুশকা মারা যেতে পারে।
খুব কঠিন একটা সময় আসছে। তরুণ প্রজন্ম এমন সব অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে যেসবে ধর্ম আর নৈতিকতার বালাই নেই। বরং তাদের আচার-আচরণে ভারতীয় আর পশ্চিমা, আধুনিক এবং খোলামেলা সংস্কৃতিই প্রাধান্য পাচ্ছে। সবার হাতে হাতে মোবাইল আর অধিকাংশ বাবা-মা জানেও না, তাদের সন্তানরা কই যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে, সোশ্যাল মিডিয়াতে কি করছে কিংবা কি কি অপরাধে জড়াচ্ছে।
আনুশকা আমার মেয়ের বয়সী। আমি খুবই শংকিত। আমি অনেক কিশোর-কিশোরীদেরই দেখি এবং জানি যাদের বাবা মায়ের সাথে তাদের বন্ধুত্ব নেই বরং দূরত্ব আছে। তারা তাদের জীবনযাপনের কিছুই বাবা-মায়ের সাথে শেয়ার করে না। অথচ সন্তানের জন্য একমাত্র বাবা-মাই হচ্ছে প্রকৃত আর অকৃত্রিম শুভাকাঙ্ক্ষী।
ধর্ম, নৈতিকতা, পারিবারিক শিক্ষা আর সন্তানের সাথে বন্ধুত্বই পারে এধরণের দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। কিন্তু বাস্তবতা হল অতি আধুনিকতার সাথে প্রতিনিয়ত পাল্লা দেয়া আমাদের সমাজ আর পরিবেশ তার বিপরীত দিকেই দ্রুত ধাবিত হচ্ছে।
লেখক: সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট, নৌবাহিনী কর্মকর্তা

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading