ধর্ষণ বন্ধে প্রয়োজন সামাজিক পদক্ষেপ
উপ-সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
সালমা আলী:: ধর্ষণ যেন আমাদের রোজকার জীবনের অন্য সাধারণ ব্যাপারগুলোরই একটি! প্রতিদিন খবরে আসছে ধর্ষণের খবর। লোমহর্ষক, ভয়ংকর সেসবের একএকটির বিররণ। আড়ালে থেকে যাচ্ছে আরও অসংখ্য ভিকটিম। আমাদের এই সময়ে ধর্ষণ নিয়ে জনপ্রতিক্রিয়া বুঝতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় সহায়ক। সেগুলোতেও নজর রাখা প্রয়োজন। অজস্র মতামতদানকারী রাস্তায়, প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে ফাঁসি কার্যকর করার দাবি করেন। অর্থাত্ মূল বক্তব্য, ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
ক্রসফায়ার বা জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া আসলে সত্যি সত্যিই চাওয়া নয়। সেগুলো চরম ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশের একধরনের রূপক প্রকাশভঙ্গি মাত্র। সুবিচারের অনুপস্থিতি, দুর্নীতি, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক শক্তির বশ্যতা ইত্যাদিকেই ধর্ষণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অনেকেই।
অস্বীকার করার উপায় নেই, ধর্ষণ বাংলাদেশে একটি সর্বব্যাপ্ত অপরাধ হতে চলেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সামপ্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর গড়ে প্রতি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১১ জন নারী। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮৮৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে ৪১ জনের। ২০১৭ সালে ৮১৮ জন, ২০১৮ সালে ৭৩২ জন এবং ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল ৭৬ জনকে। আত্মহত্যায় বাধ্য হয়েছিলেন ১০ জন নারী।
এসব সত্যকে আমলে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশির ভাগ মন্তব্যকারীরই মতামত এ রকম, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো অপরাধে ছাত্রদেরও জড়িয়ে পড়া মানে আশার শেষ আলোটিও নিভে যাওয়া। তারপর হতাশা আর ভীতি ছাড়া অন্য কোনো আশাবাদের সুযোগ থাকে না। কোথায় ছাত্রসমাজ ধর্ষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, উল্টো তারাই কিনা ধর্ষণে জড়িত!
ধর্ষণ বন্ধে দরকার আইন ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা ‘নগ্ন’ করে তুলছে দেশের ভাবমূর্তিকে৷ একদিকে ‘দুর্বল’ আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা অন্যদিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ধর্ষিতা নারীর মানসিক অবস্থাকে আরও ভেঙ্গে দিচ্ছে।
ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনার অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ প্রথমে চেষ্টা করে, অভিযোগ না নিয়ে লোকলজ্জার ভয় দেখিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে টাকা-পয়সা দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েও ‘ফয়সালা’ করা হয়৷
অন্যদিকে, আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষিতে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধই বলা যায় না৷
আর কোনো মেয়ে আদালতে বিচারের জন্য গেলে মেয়েটিকে নানাভাবে প্রমাণ করতে হয় সে কীভাবে ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে৷ এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিবার ধর্ষণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় মেয়েটি৷ অন্যদিকে, সমাজ মেয়েটিকেই দোষী বলে মনে করে৷ বাবা- মা কে শুনতে হয় মেয়েটির পোশাক, আচার-আচরণ বা কোন একটি কারণে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে৷ উদাহরণ দেয়া হয় অন্য মেয়েদের, বলা হয় ‘তারাতো ধর্ষণের শিকার হয়নি’৷
পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে মেয়েদের খুন করা হলেও তার চরিত্র নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া চলে৷ সমপ্রতি রাজধানীতে ও’লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকার মৃত্যু নিয়েও ঘটেছে একই ঘটনা।
রুনি, মিতু, তনু বা আনুশকার হত্যা বা ধর্ষণের তদন্তের চেয়ে মূখ্য হয়ে ওঠে কাদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল, তাদের চরিত্রের ময়নাতদন্ত করে আমাদের সমাজ। তাই শক্তিশালী আইনের যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি বিকল্প নেই এই সমাজ পরিবর্তনেরও৷
আর এমনটা না হলে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়াসহ দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা যৌন নিগ্রহের শিকার হতেই থাকবে৷ অপরাধীরা বিনা বিচারে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াবে৷
ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলেই যে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে এই অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল হবে, তা চোখ বন্ধ করে বলা কঠিন। কারণ যে সমাজবাস্তবতা একজন লোককে ধর্ষক হতে উত্সাহ দেয়, সেটির পরিবর্তন করা না গেলে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধ এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার শিক্ষা জোরালো করা না গেলে আাাইন কঠোর থেকে কঠোরতর করেও ধর্ষণের মতো অপরাধ থেকে দেশকে বাঁচানো কঠিন।
প্রতিটি নারীর উচিত নিজেকে ছোটবেলা থেকে আত্মনিভর্রশীল করে গড়ে তোলা৷ কোনো পুরুষের বাজে স্পর্শে সংকুচিত না হয়ে প্রতিবাদ করা৷ সেইসাথে সামাজিক গণমাধ্যমে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রতিরোধও গড়তে শেখা৷ সমাজে পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন পরিবারের ছেলেটি বা পুরুষটি নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে৷ তাই ছোট থেকেই সন্তানকে সেইভাবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে একজন নারীকে অসম্মান করার আগেই তার বিবেক জেগে ওঠে৷
লেখক- সাংবাদিক

