ভ্যাকসিনে নিয়ে অনাস্থার কিছু তো দেখছি না

ভ্যাকসিনে নিয়ে অনাস্থার কিছু তো দেখছি না

প্রতিক্রিয়া| উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২১ | আপডেট : ০০:০১

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় করোনার ভ্যাকসিন; কম সময়ে সেই ভ্যাকসিনের দেখা পেয়ে গেলো বাংলাদেশও। প্রতিবেশী ইন্ডিয়া আর সরকারের কূটনৈতিক সফলতায় অল্প সময়ের মধ্যে দেশে ঢুকল ভ্যাকসিন। গত ২১ জানুয়ারি উপহারের ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন বিশেষ বিমানে করে দেশে পৌছায়। কিন্তু বহুল কাঙ্ক্ষিত এই ভ্যাকসিন দেশে আসলেও এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এবার শুরু হয়েছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিতর্ক। অনেকের মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে অনীহাও দেখা দিয়েছে। মূলত গুজব আর সঠিক জ্ঞানের অভাবই এর প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি।

একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়, কয়েকদিন আগে এক বিকালে আড্ডার সময় ভ্যাকসিনের বিষয়টি চলে এল। তখনই এক বন্ধু বলে উঠল- ‘ভ্যাকসিন নিয়ে জেনেশুনে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভালো’। বন্ধুটি একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। তাঁর মতো শিক্ষিত মানুষের মুখে এ কথা শুনে আমার কিছুটা খারাপই লাগল। আজকে সমাজের এই গুজব অশিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি শিক্ষিত সমাজকেও গ্রাস করেছে।

গত ২৭ জানুয়ারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে দেশে টিকাদান কর্মসূচী উদ্বোধন করা হয়। অনলাইনে যুক্ত হয়ে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন পুলিশ, সেনা কর্মকর্তা, ডাক্তারসহ মোট ২৬ জন এ ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন। এরপর একাধারে রাজধানীর আরও কিছু হাসপাতালে ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম চালানো শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপিসহ দেশের অনেক সুধী ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যেই ভ্যাকসিন নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোন পার্শপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি। মানুষ ইদের মতো ভ্যাকসিন গ্রহণ করছে বলেও মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, ‘কোভিশিল্ড নামের যে টিকাটি বাংলাদেশে দেয়া হচ্ছে, এ পর্যন্ত অন্য সব ভ্যাকসিনের তুলনায় এটিই সবচেয়ে নিরাপদ ভ্যাকসিন।’

চলতি মাসে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে সারাদেশে একযোগে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে বলেও জানা গেছে। ভ্যাকসিন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিতর্কের শুরুতেই আমাদের জেনে নিতে হবে ভ্যাকসিনটা আসলে কী? এর কাজ কী? মানুষ এর প্রয়োগ কেন করে?

ইন্টারনেটে তথ্য সরবরাহকারীমাধ্যম উইকিপিডিয়া বলছে, কোন রোগের ভ্যাকসিন হল কেবলমাত্র সেই নির্দিষ্ট রোগটিরই বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বর্ধনকারী ক্রিয়া সম্পন্ন জৈব উপাচার যা টিকাকরণ (ইনঅক্যুলেশন) অর্থাৎ ত্বকে সূচ ফুটিয়ে দেওয়া হতে পারে বা অন্য উপায়ে যেমন খাবার ড্রপ। অপর ভাষায় বলতে গেলে, যে জৈব রাসায়নিক যৌগ যা অ্যান্টিবডি তৈরী হওয়ার প্রক্রিয়াকে উত্তেজিত করে দেহে কোন একটি রোগের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা জন্মাতে সাহায্য করে তাই ভ্যাকসিন। বিশেষ করে কোনো প্রাণীর দেহে রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া ইত্যাদির জীবিত (যার রোগসূচনাকারী ক্ষমতা শূন্য) বা মৃতদেহ বা কোনো অংশবিশেষ হতে প্রস্তুত ঔষধ যা ঐ প্রাণীর দেহে ঐ ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে আন্টিবডি সৃষ্টি করে। যেমন- করোনার ভ্যাকসিন হিসেবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা দেওয়া হতে পারে। এই ভ্যাকসিনে সাধারণত মৃতপ্রায় বা মৃত জীবাণু অথবা তার বিষ থেকে তৈরী হওয়া রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু-সদৃশ উপাদান থাকে। এটি উক্ত উপাদানটিকে বহিরাগত হিসেবে শনাক্ত করতে, সেটিকে ধবংস করতে এবং স্মৃতিতে রাখতে অনাক্রম্যতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে, যাতে পরবর্তীতে অনাক্রম্যতন্ত্র ঐ সমস্ত জীবাণুকে খুব সহজে পরবর্তী অনুপ্রবেশে শনাক্ত ও ধবংস করতে পারে।

ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, কথাটি নতুন কিছু নয়। তবে এর ফলে মানুষের মৃত্যু হবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তা ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা যখন একটি ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়। তখন সেটি নানা পরীক্ষা চালানোর পরই দেওয়া হয়ে থাকে। আর করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। পুরো এক বছর থমকে ছিল পৃথিবী। বিজ্ঞানী আর গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমরা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে করোনার ভ্যাকসিন হাতে পেয়েছি। যা পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল।
মনের অজান্তেই একটি প্রশ্ন চলে আসছে, সৌদি বাদশাহ মোহাম্মদ বিন সালমান থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পর্যন্ত করোনার ভ্যাকসিন নিয়েছেন প্রকাশ্যেই। এমনকি বহু সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে বহু আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়েই করোনার টিকা নিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কারো কাছ থেকে দুঃসংবাদ পাওয়া যায়নি। তবে স্রোতের বিপরীতে হাঁটা দুএকজন নেতাও রয়েছেন। ট্রাম্প-বলসেনারোর মতো এক দুইজন নেতার বক্তব্যের কারণে সমাজে বিভক্তির সৃষ্টি হয়।

মূলত ২০২১ সালের শুরু নাগাদ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির কল্যাণে মাঠে এসেছে পশ্চিমাদের ডাবল ডোজের তিন তিনটি ভ্যাকসিন, ফাইজার, মডার্না আর এসট্রাজেনেকা। চীন আর রাশিয়াও ভ্যাকসিন নিয়ে মাঠে রয়েছে। সিঙ্গেল ডোজের জনসন এন্ড জনসনের ভ্যাকসিনটি মাঠে আসার কথা মার্চে। গত কয়েক মাস আগে থেকে আমেরিকা কানাডাসহ ইউরোপে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে ভ্যাকসিনের নিয়ে সমস্যা হচ্ছে ভ্যাকসিনেশনের ধীর গতি। টিকা দেওয়ার গতি কয়েকগুণ বাড়াতে না পারলে ভ্যাকসিন দিতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ২০২১ সালের শুরুতে ভ্যাকসিন উৎপাদক দেশগুলোর স্বার্থপরতা ইতিমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহে সমস্যা তৈরি করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গাভি বা গ্লোবাল অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে গরীব দেশগুলোকে ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে ধীর গতি আর অনিশ্চয়তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বিগ্ন ।

তবুও ইন্ডিয়ার সেরাম ইন্সটিটিউটের কল্যাণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের ভ্যাকসিনের সপ্ন সত্যি হয়েছে। গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার প্যাটেন্টে তৈরি ভ্যাকসিনের তিন কোটি ডোজ ইন্ডিয়ার সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে কিনবে সরকার। প্রথম মাসে ৫০ লক্ষ টিকা দেয়া হবে। পরের মাসে দেয়া হবে ৫০ লাখ। তৃতীয় মাসে আবার ৬০ লাখ টিকা দেয়া হবে। ধাপে ধাপে দেশে টিকা এসে পৌঁছাবে। প্রথম মাসে যারা টিকা নেবেন, তারা তৃতীয় মাসে আবার দ্বিতীয় ডোজ নেবেন। এছাড়াও কোভ্যাক্সের মাধ্যমে আরও প্রায় ৬ কোটি ডোজ ভবিষ্যতে পাবার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এছাড়াও প্রয়োজনে অন্যান্য কোম্পানির কাছ থেকে ভ্যাকসিন কেনার কথা বলা হয়েছে।

এখানে একটি কথা না বললেই নয় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যে কোম্পানির ভ্যাকসিন নিয়েছেন আমাদের দেশেও ঠিক একই কোম্পানির ভ্যাকসিন প্রবেশ করেছে। ট্রায়ালে ৯০ শতাংশের ওপর সফলতা দেখিয়েছে। তবুও কেন দেশের মানুষের ভ্যাকসিনে অনীহা? কেনই বা সরকারিভাবে মানুষকে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হবে? কিন্তু সব ছাপিয়ে আরেকটি প্রশ্ন, দেশের ভিআইপিরা কি এ টিকা নিচ্ছেন?

বিশ্বে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার ভ্যাকসিন সবচেয়ে সহনশীল ও কার্যকর হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এই ভ্যাকসিন ইন্ডিয়া ও ইংল্যান্ডে পরীক্ষা শেষেই দেশে এসেছে। অন্যান্য ভ্যাকসিনের তুলনায় আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এই ভ্যাকসিন সবচেয়ে বেশি মানানসই। তবে এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বিশিষ্টজনদের। সাথে আহ্বান ভ্যাকসিন নিয়ে গুজব না ছড়ানোর। বিশেষ করে শিক্ষিতদের মধ্যে করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণে আগ্রহ দেখা গেলেও কম শিক্ষিতদের বেলায় কিছুটা ভিন্ চিত্র। গুজব ও আস্থাহীনতা দূর করতে প্রচারণা জরুরি। প্রয়োজনে বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষকে সংযুক্ত করতে হবে।

এদিকে নরওয়েতে করোনা ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়েই মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৩ জনের। এছাড়াও গণমাধ্যম মারফতে বিভিন্ন দেশে ‘ভ্যাকসিন নেওয়ার পর মৃত্যু’ এমন হেডলাইনে নিউজ দেখা যায়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে ভ্যাকসিনের কারণেই কি তাঁদের মৃত্যু হয়েছে?

মূল কথায় আসি- ভ্যাকসিন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো কোন কিছু না যে এটি নেবার পর অন্যান্য অসুখ-বিসুখে অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাবনা কমারও কারণ নেই। এছাড়াও করোনার এই ভ্যাকসিন কোনও অমরত্ব পাওয়ার টিকা নয়। এছাড়াও টিকা নেবার পর বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকজন সিনিয়র সিটিজেনের মৃত্যুর কথা জানা যায়। মূলত প্রবীণ ও বার্ধক্যজনিত ওষুখে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ ঘটনা দেখা গিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তবে এর সাথে কোভিড টিকার কোনও সম্পর্ক এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইন্ডিয়ায় ৫ লাখেরও বেশি মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে যাতে প্রায় হাজারের মত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। আর দুই জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তবে তদন্তে অন্য কারণ শনাক্ত হয়েছে। তাই ভ্যাকসিনেশন নিয়ে সঠিক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দেশ ও জাতীর স্বার্থে সকলকে ভ্যাকসিন গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

mashiurjarif

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading