ভাষার মাসে চাওয়া-পাওয়া
উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ | রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
আব্দুল আজিজ মাহিন :: চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের এই মাসেরই একুশ তারিখ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সালাম, বরকত, শফিক, রফিক, জব্বার এবং নাম না জানা আরও অনেকে… বাঙালির কাছে এই মাস ভাষার মাস, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস। তাই তো বাঙালি জাতি নানা আয়োজনের মাধ্যমে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ভালোবাসা জানায় ভাষা শহীদদের প্রতি। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে শুধু ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের ভাষা চেতনা জেগে ওঠে। বাকি সময় এসব নিয়ে চিন্তার কোনো বালাই থাকে না।
তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এমন ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়। জাগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী মানুষ। তাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। শহীদ হন সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে। বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা। সেই পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরে নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালিই পৃথিবীর একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল। এই আত্মত্যাগকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালন করা হয়।
এখন ভাবনার বিষয় হলো – যে চেতনাকে ধারণ করে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল তার কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে আজকের যুগে? আমাদের দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা সচেতনতার অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। সমস্যা হচ্ছে নতুন প্রজন্ম বাংলা এবং ইংরেজি- কোনো ভাষাই ভালোভাবে শিখছে না, বলছেও না। তারা বাংলার সঙ্গে ইংরেজি-হিন্দি মিশিয়ে এক জগাখিচুড়ি ভাষার জন্ম দিচ্ছে। এতে ভাষা বিকৃতি ঘটছে চরমভাবে। সামাজিক মাধ্যমেও জন্ম নিচ্ছে এক মিশ্র এবং অদ্ভুত ভাষা। ফলে এসব ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহারে নীতিমালা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই সাথে জরুরি হয়ে পড়েছে ব্যক্তি পর্যায়ে এ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কারণ একুশ তখনই সার্থক হবে, যখন মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। লেখক: সাংবাদিক

