অসহায় নারীদের প্রেরণায় শম্পার ‘প্রেরণা’

অসহায় নারীদের প্রেরণায় শম্পার ‘প্রেরণা’

উত্তরদক্ষিণ| মঙ্গলবার, ৫ অক্টোবর ২০২১| আপডেট ১৭:৪৫

স্বপ্ন দেখেন অসহায় মানুষের পাশে থেকে সাহায্য করা ও কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করার। সমাজের অসহায় নারীদের ভাগ্য বদলের জন্য নিজে নিরলস প্ররিশ্রম করে যাচ্ছেন। বলছিলাম সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার মোজাহার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও নারী সংগঠন ‘প্রেরণা’র উদ্যোগতা শম্পা গোস্বামীর কথা। ছোটবেলা থেকে বন্দি
জীবনযাপন করতে হতো, কারণ তার জš§ ঠাকুর পরিবারে। যার কারণে তাকে অনেক নিয়ম মেনে
চলতে হতো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পরও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন; সংগ্রাম
করে যাচ্ছেন নারীদের অধিকার নিয়ে, ভাঙতে শুরু করেন সমাজের তৈরি ‘অবৈধ’
শিকলের খাঁচা। এনিয়ে অনেক বাধা আসলেও থেমে না থাকা নিয়ে কথা
বলেছেন দৈনিক উত্তরদক্ষিণের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার
নিয়েছেন গাজী কাইয়ুম

মানুষ তৈরির কারিগর স্কুলের শিক্ষিকা হয়ে যেমন শিক্ষার্থীদের মানুষের মত করে তৈরি করছেন; তেমনি সমাজের অসহায় নারীদের ভাগ্য বদলের জন্য নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি নারী সংগঠন ‘প্রেরণা’। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা সদরে অবস্থিত ‘প্রেরণা’র প্রধান কার্যালয়। ২০১৫ সালে কালিগঞ্জ উপজেলা মহিলা অধিদপ্তর থেকে অনুমতি পত্র নিয়ে মাত্র সাত জন নারীকে নিয়ে কাগজের ব্যাগ তৈরির কাজ শুরু করেন। ছয় বছরের ব্যবধানে ‘প্রেরণা’র সদস্য সংখ্যা এখন ৩৫০ জন। তাছাড়া যাদের বাহিরে কাজ করার সুযোগ নেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে উত্তরদক্ষিণ’কে জানান শম্পা গোস্বামী।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: আপনি একজন শিক্ষিকা পাশাপাশি একজন নারী উদ্যক্তা; শিক্ষিকা জীবন কেমন উপভোগ করেন?

শম্পা গোস্বামী: শিক্ষকতা মহান পেশা। আমার মনে হয় মাধ্যমিক স্কুল হচ্ছে সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এই পেশা ছেলে মেয়েদের মানুষ করার একটা সুযোগ থাকে যেটা অন্য পেশায় থাকে না। এই পেশার মাধ্যমে আমি একগুচ্ছ ভবিষ্যৎকে আলোয় রুপান্তারিত করা যায়। মাধ্যমিকে যখন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় তাদের বয়স তাহকে ১১/১২ বছর। আর এই বয়স তাদের জন্য গঠনকারী সময়, এই বয়ষে যে শিক্ষা দেওয়া হয় সেই শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা সারাজীবন চিলতে পারে। এই জায়গায় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ঢেলে সাজানোর সুজোগ থাকে এবং আগামীর প্রজন্মকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার সুযোগ থাকে। এই থাকে আমি আমার মন প্রাণ ও অন্তর থেকে শিক্ষার্থীদের পাড়াই। আর এতে আমি অনেক সন্তুষ্ট।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার পরে যখন সবাই ক্লাসরুমে ফিরেছে তখন তাদের মধ্য কি কি পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

শম্পা গোস্বামী: অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যশীলতা আচরণটা আগের মত নেই। লেখাপড়ার মনোযোগ কম। স্মার্ট ফোনের নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব ধীরে ধীরে হয়ত আবার শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক আগের মত ভালো হয়ে যাবে কিন্তু তার জন্য সময়ের প্রয়োজন।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: নারী উদ্যক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা এলো কিভাবে?

শম্পা গোস্বামী: আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ১৬ বছর এর কাছাকাছি। তখন আমার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টও আসেনি। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া নারীর জীবন কেমন হতে পারে তা আমি জীবন দিয়ে বুঝেছি। যখন স্বল্প শিক্ষিত একটি মেয়ে যার আÍসম্মান বোধ থাকবে তার প্রয়োজনে যদি কারো কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে হয় বা সবকিছু অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয় সেটা যে কত দুঃখজনক তা আমি নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি। এই জায়গা থেকে আমার মনে হত আমার মত যারা সুযোগ পায়নি, লেখাপড়ার সুযোগটা পাচ্ছে না তারা আসলে কি করবে? আমি বিশ্বাস করি যারা পড়াশুনায় একেবারে খারাপ তাদের অন্য কোন না কোন প্রতিভা থাকে, সেই প্রতিভাগুলোকে যদি কাজে লাগিয়ে থাকি তাহলে নিশ্চয় একটা ভালো ফল বয়ে আনবে। আমাদের সমাজে নারীদের বস্তু মনে করে, প্রয়োজনীয় জিনিস বা ব্যবহারের জিনিস মনে করে। আমাদের মফস্বল এলাকায় বহুবিবাহের সংখ্যা অনেক বেশি এবং মেয়েদের যে আলাদা কোন অনুভুতি বা জীবন আছে এটা মনে করা হয় না। আর সেই জায়গা থেকে আমার মনে হয় ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। সেই স্বপ্নের জায়গা থেকে মনে হত আমি নিজে যদি কখনো দাঁড়াতে পারি বা কিছু করতে পারি তাহলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য কিছু করব। যখন আমি এই গুলো ভাবমাত তখন আমার আইডিয়া কম ছিল, আমার সামর্থ ছিল না। কিন্তু আমি যখন পড়াশুনা শেষ করে চাকরি যোগদান করি সেখান থেকে বিভিন্ন সামজিক কাজ শুরু করি। পরে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে একটি নারী সংগঠন গড়ে তুলি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?

শম্পা গোস্বামী: সমাজে বেশিরভাগ গরীব নারীরা বৈসম্যের স্বীকার হয়। আমি মূলত এইসব বৈসম্যের স্বীকার হওয়া নারীদের স্বনির্ভরশীল করতে চাই। কিন্তু একার পক্ষে তো সব সম্ভব না। যতটুকু পারি চেষ্টা করি। তাছাড়া এক্ষেত্রে প্রসাশন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যাক্তি, বিভিন্ন ব্যাংক নারী উদ্যতাদের সহযোগিতা করে তাহলে আমার মনে হয় নারীরা স্বনির্ভরশীল হতে পারবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: আপনার প্রতিষ্ঠান নারীদের কি কি সহযোগিতা করে?

শম্পা গোস্বামী: গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে পরামর্শ, নির্যাতিত নারীদের আইনি সহায়তা, তাছাড়া সমাজের ঘটে যাওয়া নারীদের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে থাকি। তাছাড়া গরিব, অসহায় ও বিধবা নারী অন্যের উপর নির্ভর না করতে হয় সে জন্য আমরা কাপড় কেটে লেভেল লাগিয়ে মেসিনে সেলাই করে কাপড়ের ব্যাগ তৈরি করে বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করি। মাক্স তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: আপনার কাজ করার ক্ষেত্রে কোন বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা?

শম্পা গোস্বামী: সমাজে ভালো কাজ করতে গেলে বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। আমি যে সময় প্রথমে ৭ জন নারীকে নিয়ে কাজ শুরু করি তখন এলাকার অনেকে অনেক বাজে মন্তব্য করেছে। মেয়েদের উত্যক্ত করেছে। কাজ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলে কয়েকবার এলাকার মানুষ আমাদের দরজার বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। এখন অবশ্য সব ঠিক হয়ে গেছে এখন মানুষ পজেটিভ ভাবে দেখে। তবে এখনো সমাজ মনে করে আমরা নারীবাদী সংগঠন। আমরা শুধু পুরুষদের নির্যাতন করি। আমরা মানুষের ঘর ভাঙ্গি, আমরা নারীদের ঘর থেকে বের করে আনি। তবে আমার মনে সমাজের ভ্রান্ত ধারণা একদিন থাকবে না।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: আপনি বাল্য বিবাহ বন্ধ নিয়ে কাজ করেন; সাতক্ষীরা জেলার বর্তমান বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি কেমন?

শম্পা গোস্বামী: সাতক্ষীরা জেলা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রবণ এলাকা। এখানে বহুদিন ধরে বাল্য বিবাটা একটা বিশ ফোড়ার মত হয়ে আছে। আমি দেখেছি ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীতে উঠার আগে অনেক ছাত্রী ঝরে যায়। সাতক্ষীরার ১৭৭টি স্কুলে আছে। আমাদের জরিপে দেখা গেছে কোন কোন স্কুলে ৩০ জন থেকে ৪০ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে। গড়ে ৫/৬ হাজার বেশি বাল্যবিবাহ হয়ে করোনা কালীন সময়ে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রসাশন থেকে শুরু করে সমাজের সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি জানতে পারি কোথাও বাল্য বিবাহ হচ্ছে তাহলে প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে সেটা বন্ধ করি ও সেই সব অবিভাবকদের বাল্যবিবাহের সমস্যগুলো বোঝানোর চেষ্টা করি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ: যারা নতুন করে উদ্যগতা বা সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত হতে চায়; তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

শম্পা গোস্বামী: কাজ করতে গেলে ইচ্ছে শক্তি প্রয়োজন। ইচ্ছাশক্তিই বড় শক্তি। পৃথীবির সব কিছু সম্ভব হবে যদি মানুষের ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় থাকে।

উত্তরদক্ষিণ’কে ‘প্রেরণা’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানান শম্পা গোস্বামী। তিনি বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি; ‘প্রেরণা’ একদিন বড় দশটি প্রতিষ্ঠানের মত একটি প্রতিষ্ঠান হবে, সেখানে সমাজের যত গরিব, অসহায় ও বিধবা নারী আছেন তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। যাতে কোন গরিব, অসহায় ও বিধবা নারী অন্যের উপর নির্ভর না করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, আমার একার পক্ষে বাংলাদেশের সব অসহায় ও বিধবা নারীদের ভাগ্য বদল করা সম্ভব না। এজন্য বাংলাদেশের সকল বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ সব অসহায় ও বিধবা নারীদের অন্যের উপর নির্ভর করে চলতে হবে না।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading