শিশু নীপিড়নের বিরুদ্ধে হোক কঠোর অবস্থান
শারমিন সুলতানা তন্বি । রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৯:০৫
যেকোনো সমাজে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। একদিকে আমরা বলছি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য নারী ও শিশুর উন্নয়ন জরুরি, অন্যদিকে সমাজে তারাই সবচেয়ে বেশি অনগ্রসর শ্রেণি। এদিক থেকে শিশুদের অবস্থা আরো করুণ। একের পর এক শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দেশের সামগ্রিক শিশু অধিকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সমাজের অনগ্রসর শ্রেণি বিশেষ করে নারী তথা অন্যান্য শ্রেণি-পেশার জনগোষ্ঠীকে নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। কিন্তু শিশু অধিকার নিয়ে তেমন কোনো কার্যক্রম আমরা দেখিনা। সমাজের শিশুরা যেন অভিভাবহীন।
জাতি গঠনে শিশু অধিকার সুরক্ষা ও শিশু কল্যাণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। গত এক বছরে শিশু নির্যাতনের কয়েকটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। আমরা একজন অপরাধীর দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেখেছি। আসলে আইন থাকলেই হবেনা। আইনের প্রয়োগ ছাড়া কোনো আইনই কাজে আসে না। শিশু আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া শিশু অধিকার রক্ষা করা যাবে না।
দেশে শিশু আইন আছে। ১৯৭৪ সাল থেকেই দেশে শিশু আইন বিদ্যমান ছিল। এখনো আছে। কিন্তু শিশু নির্যাতনের বন্ধ হয়নি। কারণ আইনের প্রয়োগ না হলে তা কাগুজে বাঘই রয়ে যায়। আর শিশু নির্যাতনের বিচার করা আরো কঠিন। কারণ শিশুরা ভয়ে নির্যাতনের কথা গোপন রাখে। তাদেরকে নানাভাবে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। প্রলুব্ধ করা হয়। সেই সাথে অনেক নির্যাতনের কোনো সাক্ষী থাকেনা।
শিশু নির্যাতনের মতো পৈশাচিক ঘটনার সাথে যেসব অপরাধীরা জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা আইনগত ও সামাজিক দায়িত্ব। দোষীরা আইনের ফাক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে গেলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। অন্যদিকে শিশু অধিকার বিষয়ক যে পুরনো আইনটি আমাদের ছিল তা সময়ের চাহিদা পূরণে যথার্থ ছিল না। তাই ১৯৭৪ সালের আইনটি বাতিল করে ২০১৩ (সংশোধিত)সালে প্রণীত হয় নতুন একটি আইন।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোকেই আমাদের শিশু আইনটি প্রণয়ন করা হয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুদের বিশেষ অধিকারের কথা বলা আছে। এ বিশেষ অধিকারগুলো শিশুর বেড়ে ওঠা ও নিরাপদ শৈশবের জন্য অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক আইনের এ বিধানগুলো আমাদের আইনেও স্থান পেয়েছে। আইন বলছে, শিশুদের জন্য সব ধরনের জবরদস্তিমূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিষিদ্ধ হবে। কাজেই এ ধরনের শ্রম বন্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশের অনেক শিশুই নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে। এসব দেখার কেউ নেই।
নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধগুলো কঠোরভাবে দমনের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ নামে এই আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০০৩ সালে আইনটি সংশোধন হয়। এ আইনের আওতায় নারী বা শিশু পাচার, শিশু অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত মৃত্যু, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, যৌন পীড়ন, ভিক্ষাবৃত্তিসহ সব ধরনের অপরাধেরই বিচার করা যায়। আইনে আছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পুলিশ বা অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে অপরাধ সংগঠনের সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে তাহলে ধরা পড়ার ১৫ দিনের মধ্যে অপরাধ তদন্ত শেষ করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই আমরা ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন হতে দেখিনা।
বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রতি ছয় ছেলে শিশুর মধ্যে একজন এবং চার মেয়ে শিশুর মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুযায়ী, যৌন নিপীড়নের শিকার শতকরা পাঁচ ভাগ ছেলে শিশু। মেয়ে শিশু শতকরা ৯৫ ভাগ। বাংলাদেশ শিশু ফোরাম বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১২ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুরাই বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শিশুদের যৌন হয়রানির মধ্যে যে কেবল ধর্ষণ বিদ্যমান তা নয়।
এ ছাড়া তাদের ওপর নানা ধরনের শারীরিক আক্রমণ, বলাৎকার, স্পর্শকাতর ও যৌনাঙ্গে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ অন্যতম। আর এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পারিবারিক আবহের মধ্যেই। ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে এই চিন্তা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পিতামাতারা ভাবতেই পারে না। আর যদি হয়ে ও থাকে তাহলে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয় না বললেই চলে। ছেলেশিশু মানেই তারা নিরাপদ এবং নারী তত্ত্বাবধায়ককে তুলনামূলক নিরাপদ ভেবে নেওয়া হয়।
তবে পর্যবেক্ষণ বলছে, মেয়ে ও ছেলে- উভয় শিশুর যৌন নিপীড়নের জন্য কাছের আত্মীয়-স্বজনদের পাশাপাশি তাদের নারী তত্ত্বাবধায়করাও দায়ী। শিশুকে নিরাপদ রাখতে অনেক সময় অভিভাবকরা তাদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করেন। ঘরে বন্দী করে রাখেন।এটা করা উচিত নয়। এতে শিশুর সামাজিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বরং যৌন নিপীড়নের শিকার শিশু অনেক সময় অস্বাভাবিক আচরণ করে, কিংবা নানা সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করে- সেগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে অভিভাবকদের। একইসঙ্গে বয়স অনুযায়ী শিশুকে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌনশিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করাও জরুরী বলে মতামত দিয়েছেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ।
লেখক: কলামিস্ট
ইউডি/অনিক

