আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকাই জীবন
আবিদ আনজুম । রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৯:১৫
আত্মহত্যা নিজের প্রতি অবমাননাকর একটি শব্দ। অনেকের মতে, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য কাজ। প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। এজন্য প্রতিটি দেশের সরকার এবং নানা বেসরকারি সংস্থা জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ইতোপূর্বে যেমন ঘটেছে, এখনও ঘটছে।
প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা মেললেই মিলছে আত্মহত্যার খবর। তরুণ, যুবা, বৃদ্ধ- আত্মহত্যার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে না কেউ। আত্মহত্যার নেই শ্রেণিপেশার বাছবিচারও। নিজের জীবন নিজে শেষ করে দেওয়ার এই প্রবণতা বর্তমানে দেশের একটি বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল দেশেই অবশ্য নয়, আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপীই একটি বড় সমস্যা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সারাবিশ্বে বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করছেন। আর যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে কোনো-না-কোনো কারণে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের সংখ্যা আত্মহত্যাকারীদের ২০ গুণ। আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলোতে এবং সবচেয়ে কম ল্যাটিন আমেরিকায়। জন্ম থেকেই মানুষ নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বড় হয়। মানবজীবনে স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে সুখ ও দুঃখ। এই দুইটা নিয়েই মানবজীবন রচিত। মানুষের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা সবসময় পূরণ হয় না। কী কী কারণে মানুষ বহু সাধ ও সাধনার এই জীবনকে এক নিমেষে হত্যা করে আত্মহত্যাকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয়?
গবেষণা বলছে, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, লেখাপড়ায় বাধা, পারিবারিক কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, প্রেমে ব্যর্থতা, অনুভূতির টানাপোড়েন, পছন্দের বাইরে বিয়ে দেওয়া বা করা, সামাজিক সম্মানহানিসহ নানাবিধ সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ দায়ী একজনের আত্মহত্যার পেছনে। বাংলাদেশে যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, দাম্পত্য কলহ, উত্ত্যক্তকরণ, প্রেম ও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, মানসিক অসুস্থতা, মাদকে আসক্তি ইত্যাদি কারণে বেশির ভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
হতাশাজনিত বিষয় বড় কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে আত্মহননের জন্য। গেম খেলতে না দেওয়া, নতুন মোবাইল ফোন বা পোশাক কিনে না দেওয়ার মতো ঘটনায়ও অভিমানে আত্মহত্যার ঘটনা হচ্ছে। নৈতিক স্খলন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, ব্ল্যাকমেলিংয়ের কারণেও আশঙ্কাজনক হারে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েই চলছে।
এখন আসা যাক, সেই প্রসঙ্গে যা আত্মহত্যার হার কমাতে সহায়ক হবে। প্রথমত, রাষ্ট্রের প্রাণ হিসেবে এর নাগরিকদের ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং একজন শিক্ষার্থী যতদিন বেকার থাকবে তাকে বেকারত্ব ভাতা’র আওতায় আনতে হবে। এছাড়া বেকার জনগোষ্ঠী যেন হেয় প্রতিপন্ন না হয় তার নিমিত্তে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেন একজন শিক্ষার্থীও অর্থাভাবে ঝরে না পড়ে। বাল্য বিবাহসহ ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
এক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে যা ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে। তৃতীয়ত, আমাদের অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, আমাদের ইচ্ছে বা জেদের থেকে আমাদের সন্তানের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই বিবাহের ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যেন প্রেমে ব্যর্থতার মতো কারণে আর একজন মানুষও আত্মহত্যা না করে। চতুর্থত, রাষ্ট্রকে নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন উপাদান যেমন, পার্ক, খেলার মাঠ, থিয়েটার, পাবলিক লাইব্রেরি ইত্যাদির সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আত্মহত্যা নামক সমাজের আবর্জনাকে আমরাই পারি উৎখাত করতে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও পরিবারে আত্মহত্যার কুফল ও ভয়াবহতা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক নানা সভা-সেমিনার চালুর মাধ্যমে আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে তাদের মানসিকভাবে সহযোগিতা বা অবলম্বন দেওয়ার জন্য প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।
মনে রাখতে হবে, জীবনে অভাব বা অপ্রাপ্তি থাকবে- এগুলো জীবনেরই অংশ। তাই বলে ভেঙে পড়লে চলবে না। দুঃখ, কষ্ট, বিপদ দেখে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্ধকারই কেবল মানুষের জীবনে অনিবার্য সত্য নয়, আঁধারের মাঝেই আবার উদিত হবে স্নিগ্ধ চাঁদ। দূরীভূত হবে জীবনের সব অন্ধকার।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক
ইউডি/অনিক

