অনিরাপদ সড়ক আর আমাদের অসচেতনতা
সাদি মোস্তফা । মঙ্গলবার, ১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৭:১০
সড়ক দুর্ঘটনা একটি গুরুতর জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর প্রকাশিত হয়। বিষয়টি গভীর শঙ্কার ও উদ্বেগজনক। গুরুতর এই জাতীয় সমস্যা সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না; যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে যে, সড়ক-মহাসড়কে মানুষের মৃত্যু প্রতিনিয়তই ঘটবে, কারোর কিছু করার নেই। সড়ক নিরাপদ করতে আইন হয়েছে। ভেবেছিলাম সড়ক এবার হয়তো নিরাপদ হবে। সড়ক নিরাপদ হয়নি। আরও অনিরাপদ হয়েছে। প্রতিদিন সড়কে মূল্যবান প্রাণ যাচ্ছে। আমরা কেন মৃত্যুর মিছিল রোধ করছি না? কেবল আলোচিত ঘটনায় মন্ত্রী, এমপিরা ছুটে যায়, স্বজন কিংবা লাশের পাশে। আমরা মায়াকান্না করি লাভ কি তাতে?
সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে সড়কে প্রতি বছর আহত এবং নিহতের হার বাড়ছেই। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাবে এমনটা হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমাদের সড়ক মহাসড়কে ২৪ লাখ অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক রয়েছে। যা বিশ্বে আর কোথাও নেই। এসব অদক্ষ চালকদের দাপটে দুর্ঘটনা বাড়ছেই। লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এতে নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪জন এবং আহত ৪৬৮জন। বিগত দুই বছরের তুলনায় অনেক বেশি। শেষ বছরের দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। যা জিডিপির দশমিক ৩ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে মোটরসাইকেল। ২ হাজার ৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে এসময়ে।
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা বেশি। শাস্তির ভয় না দেখানো পর্যন্ত কেউই আসলে আইনের পরোয়া করেন না। পথচারীদের আইন না মানার প্রধান কারণ সময় বাঁচানোর চেষ্টা এবং অলসতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডার পাসগুলোতে নিরাপত্তার অভাব। ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীরা থাকতে পারে, এই ভয়ে অনেক সময়ই এসব জায়গা এড়িয়ে মূল সড়ক দিয়ে পার হতে চায় মানুষ। এ ক্ষেত্রে এ সব জায়গায় পুলিশ চৌকি বাড়িয়ে ও জোরালো আলোর ব্যবস্থা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
আইন না মানার আরেকটি প্রধান কারণ, আইন না জানা। আমি ছোটবেলায় মা-বাবার কাছ থেকে হাতেকলমে রাস্তায় চলার টুকটাক কিছু নিয়ম শিখেছি। আর বাকিটা শিখেছি প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা থেকে। পাঠ্যবইতে কোনও দিনই এ বিষয়ে কিছু পড়েছি বলে মনে পড়ে না। নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য কিছু ছিলো না, থাকলে হয়তো মনে থাকতো। অথচ থাকা উচিৎ ছিলো। রাস্তা পারাপারের নিয়ম জানা, ফুটপাত ব্যবহারের নিয়ম জানা, রোড সাইন চেনা, ট্রাফ্রিক আইন জানা- এ সব বিষয়ে আলাদা আলাদা শ্রেণীতে আলাদা আলাদা পাঠ্যসূচি থাকা উচিৎ ছিলো। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় তৃতীয় শ্রেণীতে একটি বিশেষ অধ্যায় এবং চতুর্থ শ্রেণীর ইংরেজি বইয়ে একটি ছড়া ছাড়া এ সংক্রান্ত আর কোনও পাঠ নেই।
সড়কের শৃংখলা বজায় রাখতে ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে সবারই কিছু না কিছু দায়িত্ব রয়েছে। পথচারীদের দায়িত্ব হাঁটার জন্য ফুটপাত ব্যবহার করা, ফুটপাথ না থাকলে রাস্তার বামদিকে ঘেঁষে হাঁটা, রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রীজ বা আন্ডার পাস ব্যবহার করা, ডানে-বামে তাকিয়ে সাবধানে রাস্তা পার হওয়া এবং মোবাইল ফোনে কথা বলা অবস্থায় ও হেডফোন কানে লাগিয়ে রাস্তা পার না হওয়া। চালকের দায়িত্ব সিট বেল্ট ব্যবহার করা, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি না চালানো, মোটরসাইকেল চালাতে হেলমেট ব্যবহার করা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানো, যেখানে সেখানে পার্কিং না করা, বাস স্টপেজে যাত্রী ওঠা-নামা করানো ও বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স সঙ্গে রাখা। মালিকের দায়িত্ব গাড়ির সব ডকুমেন্ট আপডেট রাখা, গাড়ির ফিটনেস ঠিক রাখা, বৈধ ও দক্ষ ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া, চুক্তিতে গাড়ি না চালিয়ে ড্রাইভারকে বেতনভুক্ত করা এবং চালককে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া।
একটি দেশ কখনও শুধু সরকারের উপর নির্ভর করে পারফেক্ট হতে পারে না, কোনও সিস্টেম কোনও সরকার একা পরিবর্তন করে দিতে পারে না, সে জন্য প্রয়োজন দেশের প্রতিটি নাগরিকের সহৃদয় সহায়তা। আমরা সবাই যদি সচেতন হই, নিজে আইন মেনে চলি এবং অন্যকে আইন মেনে চলতে উৎসাহিত করি, তাহলে সড়ক দুঘর্টনা কমিয়ে আনা কোনও কঠিন কাজ নয়। আসুন না, সবাই মিলে চেষ্টা করে দেখি, নিরাপদ থাকা যায় কি-না। মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধুমাত্র পরিবহন চালকরাই দায়ী নন, পথচারীদের অসচেতনতাও অনেকাংশে দায়ী। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষের নিজেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কোনও বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক
ইউডি/সুস্মিত

