স্যার এডমন্ড হিলারি: দুর্গম প্রতিকূলতা জয়ে দুঃসাহসী অভিযাত্রী

স্যার এডমন্ড হিলারি: দুর্গম প্রতিকূলতা জয়ে দুঃসাহসী অভিযাত্রী

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫

দুঃসাহসী এভারেষ্ট বিজয়ী এডমন্ড হিলারি যুগে যুগে মানুষ অজানাকে জানতে চেয়েছে, অধরাকে ধরতে চেয়েছে, দুর্গমকে জয় করেছে। বেরিয়েছে দুঃসাহসী অভিযানে। পরিচয় দিয়েছে অসম সাহসের। একদিন জয় করেছে অজেয়কে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেষ্টের চূড়ায় প্রথম আরোহণ করেছিলেন তিনি। দুঃসাহসী এভারেষ্ট বিজয়ী স্যার এডমন্ড হিলারির সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন সাইফুল অনিক

হিলারি পরিণত বয়সে হয়েছিলেন বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রী। শৈশব থেকে এক এক করে জয় করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের যতোগুলো পর্বত। দ্বিতীয় বার এভারেস্ট অভিযানে সফল হয়েছিলেন তিনি। ঐদিন সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেষ্টের চূড়ায় আরোহণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

এডমন্ড হিলারি কে ছিলেন?
এডমন্ড হিলারির ছিলেন নিউজিল্যান্ডের একজন পর্বতারোহী এবং অভিযাত্রী। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে মে এডমন্ড হিলারির ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলের অংশ হিসেবে নেপালী পর্বতারোহী শেরপা তেনজিং নোরগের সাথে এভারেস্ট পর্বত শৃঙ্গ আরোহণ করেন। তার আগে আর কোনো অভিযাত্রী এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করতে পারেনি।

জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাজীবন
স্যার এডমন্ড হিলারি ২০শে জুলাই ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে নিউজিল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামাঞ্চলের এক মৌমাছি পালন খামারে এডমন্ড হিলারি জন্মে ছিলেন। শহরের অকল্যান্ড গ্রামার স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সাপ্তাহিক ছুটিতে যখন বাড়ি থাকতেন, তখন হিলারি মৌমাছি চাষে বাবাকে সাহায্য করতেন। মৌমাছিদের নিয়ে খেলতে হিলারির ভালোই লাগতো। হিলারির বড়ভাই রেক্স পড়াশুনায় ভালো ছিলেন। না বলে বাবা তাকে মৌমাছি পালনের কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। হিলারি পড়াশুনায় ভালো ছিলেন বলে হোস্টেলে রেখে এডমন্ড হিলারিকে পড়াতেন।

এডমন্ড হিলারির অভিযান
হিলারি পরিণত বয়সে হয়েছিলেন বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রী। এডমন্ড হিলারি সর্বপ্রথম এভারেস্ট গিরিশৃঙ্গ ছাড়াও আরেকটি দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এডমন্ড হিলারির সর্বপ্রথম এন্টার্কটিকা মহাদেশের উত্তর–দক্ষিণ মাথা থেকে শুরু করে মেরুবিন্দু পার হয়ে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। মজার বিষয় হলো দুটো বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী হিলারি ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত দেশের বাইরেই কখনো পা রাখেননি। এবং তার আগে কখনো পর্বত চোখেও দেখেননি।

হিলারির প্রথম পর্বত দেখা
হিলারি ১৬ বছর বয়সে ১৯৩৫ সালে প্রথম পর্বত দেখেন। দক্ষিণ দ্বীপেই মাউন্ট রুমাপে নামে ৯০০০ ফুটের একটি পর্বত ছিলো। আসলে সেটা ছিলো একটা মৃত আগ্নেয়গিরি। কিছুদিন পর থেকে পর্বত যেন এডমন্ড হিলারিরকে নেশার মতো পেয়ে বসলো। কয়েক বছর পর হিলারি এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১২ হাজার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট কুক পর্বতে আরোহণ করেন। এই সাফল্য হিলারির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

দেশের সব পর্বত জয়
এডমন্ড হিলারির নেশা চেপে গেল পর্বত আরোহণের। তারপর থেকে প্রত্যেক সাপ্তাহিক ছুটিতে হিলারি তার কোন না কোন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। শুরু হতো পর্বতারোহণের খেলা। এমনি করে হিলারি কয়েক মাসের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের যতোগুলো পর্বত ছিলো তার সবগুলো জয় করে ফেললেন।

হিলারির কর্মজীবন
এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হিলারি ব্রিটিশ বিমানবাহিনীতে যোগদান করেন। হিলারির পোষ্টিং হয় নিউপ্লিমাউথে। সেখানকার বিমানঘাঁটির পাশে মাউন্ট ইগমন্ট নামে একটা পর্বত ছিলো। এডমন্ড হিলারি প্রতিদিন ঐ পর্বতে এসে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। শুধু প্রশিক্ষণ নয়, পর্বতারোহণের উপর যতো বই ছিলো তিনি একে একে সব পড়ে ফেললেন। এমনি করে পড়তে পড়তে বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয় পর্বতশৃঙ্গ সম্পর্কেও হিলারি জেনে ফেলেন।

এভারেস্ট বিজয়ের স্বপ্ন
এই পর্বতারোহণে হ্যারি আইরশ নামে এক শিক্ষাগুরু ছিলেন। এরপর এডমন্ড হিলারির আরেকজন খ্যাতনামা পর্বতারোহী সঙ্গী জুটে যায়; তার নাম জর্জ লোয়। এই জজ লোয় এর সাথে পর্বতারোহণ করার সময় তাদের মনে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট বিজয়ের স্বপ্ন জাগে। তারা দু’জনে একান্তে বসে প্রায়ই এভারেষ্ট বিজয়ের স্বপ্নের কথা আলোচনা করতেন। ১৯৫০ খ্রীষ্টাব্দে হিলারি ইংল্যান্ডে চলে আসেন। সেখানে তিনি পর্বতারোহণ সম্বন্ধে উচ্চতর কঠিন প্রশিক্ষণ নেন।

অভিযাত্রী দলের সদস্য
হিলারি এক সময় খবর পেলেন একটি ব্রিটিশ অভিযাত্রীদল এভারেষ্ট অভিযানে যাওয়ার আয়োজন করছে। ব্রিটিশ পর্বতারোহীদের মধ্যে এরিক শিপটন ছিলেন হিলারির পরিচিত। তাকে বলে তিনি এভারেষ্ট অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসাবে নিজের নাম লেখাতে সক্ষম হলেন। উল্লেখ্য এই ব্রিটিশ দল ১৯২২, ১৯২৪, ১৯৩৬ এবং ১৯৩৮ সালে এভারেস্ট অভিযানে আসেন। তারা ২৮ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন৷

এভারেস্ট অভিযান ও জয়
১৯৫১ সালে প্রথম অভিযান শুরু হয়। সে অভিযান ব্যর্থ হয়। ১৯৫৩ সালে আর একটি ব্রিটিশ দল এভারেষ্ট অভিযানে বের হলেন। সেই দলে হিলারি এবং তেনজিং নোরগে স্থান পেলেন; দলনেতা লে হান্ট। এই দ্বিতীয় অভিযান সফল হয়। এডমন্ড হিলারি প্রথম ২৯ হাজার ২৮ ফুট উচ্চ এভারেষ্ট শৃঙ্গে উঠতে সক্ষম হন। তারপর সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গে ওঠেন নেপালী শেরপা তেনজিং নোরগে। এভাবেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মানুষের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়।

স্যার উপাধি
রাতারাতি এই খবর বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়ে যায়। হিলারি এবং নোরগে বিশ্বখ্যাত হয়ে যান। এই বিজয়ের জন্য ইংল্যান্ডের রানী হিলারিকে স্যার উপাধি দেন। তেনজিংকে এই উপাধি থেকে বঞ্চিত করা হয়।

এডমন্ড হিলারির মৃত্যু
তিনি কিছুদিন এই উপমহাদেশের দুই দেশ ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের হাই কমিশনার ছিলেন। ১১ই জানুয়ারি ২০০৮ সালে তিনি পরলোক গমন করেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading