বিনামূল্যে বই বিতরণ শিক্ষা খাতে যুগান্তকারী অর্জন

বিনামূল্যে বই বিতরণ শিক্ষা খাতে যুগান্তকারী অর্জন

বিনয় দাস । শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৩০

বিগত দশ বছর দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যান্য দিকের সঙ্গে আরো একটি নতুন দিক যুক্ত হয়েছে। সেটি হলো শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দেয়া। অন্যান্য সব বিষয়ের সঙ্গে এ বিষয়টিরও কিছু সমালোচনা আছে। কিন্তু সেসব সমালোচনা ছাপিয়ে এই কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন এক দিক বাংলাদেশে উন্মোচিত হয়েছে। এটি সত্যি প্রশংসাযোগ্য। এ ধরনের উদাহরণ বিশ্বের অন্য কোনো গরিব দেশে আছে কিনা আমার জানা নেই। আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিন নতুন বই হাতে নিয়ে আনন্দে হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে দিবসটি উদযাপন করে এবং বাড়ি চলে যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে বিভাগ, জেলা শহর, উপজেলা ও গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায় এই আনন্দের ঢেউ। রাজধানীতে দুটি বড় উৎসবের মধ্যে দিয়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে এবার। একটি অজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে, অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে।

শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়ার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৭২ সালে। তখন বঙ্গবন্ধু সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান করা হবে এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে বই সরবরাহ করা হবে। স্বাধীন দেশের উপযোগী করে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপিয়ে তা সোনালী ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করার ব্যবস্থা করা হয়। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে বই খাতা, পেন্সিল, দুধ, ছাতু, বিস্কুট বিতরণ করার নির্দেশ দেন। তারপর আমাদের দেশে বাধ্যতামূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ১৯৮৩ সাল থেকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে কিছু বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ শুরু করে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত কয়েকটি ক্যাটাগরির কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অর্ধেক নতুন ও অর্ধেক পুরনো পাঠ্যবই বিনামূল্যে দেয়া হতো। কিন্তু বইগুলো শিক্ষার্থীরা সময়মতো হাতে পেত না।

বই হাতে পেতে শিক্ষার্থীদের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। অনেককে উচ্চ মূল্যে বই কিনতে হতো। শতভাগ বিনামূল্যের পাঠ্যবই প্রদান শুরু হয় ২০১০ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সময়। ঐ বছর ১৯ কোটি ৯০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬১কপি বই শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়। গত দশ বছরে সরকারের দেয়া বিনামূল্যের বইয়ের পরিমাণ ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২কপি। এতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশের শিক্ষা বিস্তারে নিঃসন্দেহে এটি একটি অনন্য উদ্যোগ। বছরের প্রথম দিন খালি হাতে স্কুলে যাওয়া, আর সহপাঠীদের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক উৎসবে অংশগ্রহণ করে এক সেট ঝকঝকে নতুন বই নিয়ে আমাদের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরা- এ এক অন্যরকম আনন্দ! অন্যরকম অনুভূতি! এই শিশুরা যেদিন বড় হবে সেদিন তারা হয়তো তাদের অনুভূতি সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে পারবে। তাদের বর্তমান অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে তারা কত আনন্দিত! কেউ কেউ তাদের আনন্দ প্রকাশও করেছে বিভিন্নভাবে।

এক সময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাই শুধু নয়, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরাও পুরনো বই দিয়ে বছর পার করে দিত। তখন হতদরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা নতুন পাঠ্যপুস্তক হাতে পাওয়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত ছিল। বিনামূল্যের বই বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এখন বছরের শুরুতেই প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থী নতুন বই হাতে পাচ্ছে। নতুন বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীরা যে স্বস্তির হাসি হাসে তার তুলনা হয়না। এই উচ্ছ্বাস তাদের বইমুখী হতে উদ্বুদ্ধ করবে আমরা আশা করি। এই আবেগ পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াবে। শিক্ষার্থীদের এই আগ্রহ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এরাই একদিন ব্যতিক্রমী সাফল্য অর্জন করতে পারবে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading