জুয়েলারি শিল্প দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি
মৃন্ময়ী সালওয়া মুমু । রবিবার, ৮ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫
আদিকাল থেকে আমাদের এখানে জুয়েলারি ব্যবসা চলে আসছে। জুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসা লাভজনক হলেও এতোদিন এটিকে ছোট ব্যবসা হিসেবে মনে করা হয়েছে। আমাদের এখানে অলংকারের প্রতি নারীর সহজাত আকর্ষণ প্রাচীনকাল থেকেই। বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সাথে স্বর্ণালঙ্কারের নানা বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই সোনার গহনা মানুষের কাছে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এটা অনেকের আভিজাত্যের, মর্যাদার অংশ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে ধনী-গরীব সব শ্রেণির মানুষ কম-বেশি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সোনার অলংকার ব্যবহার করে। অনেকে ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ হিসেবে যতটা সম্ভব সোনার গহনা নিজের কাছে রাখতে চান।
বাংলাদেশসহ এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সোনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, স্বর্ণ অলংকার মানে জুয়েলারি শিল্পে ভ্যালু অ্যার্ড অর্থাৎ মূল্য সংযোজন অন্যান্য শিল্পের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। হাতে তৈরি সোনার গহনার প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে প্রস্তুত হয়। অথচ সোনার অলংকার বিদেশে রপ্তানিতে বাংলাদেশে বেশ পিছিয়ে। প্রতিবেশি দেশ ভারত বিদেশে সোনার অলংকার রপ্তানির মাধ্যমে বেশ ভালো পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে প্রতিবছর। বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত সোনার অলংকার বিদেশে রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে মোটেও কাজে লাগানো হয়নি এতোদিন। আন্তর্জাতিক বাজারে হাতে তৈরি সোনার গহনার কদর বাড়ছে দিনে দিনে। এশিয়ার বহু দেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনার গহনা প্রতিবছর রপ্তানি করে।
বাংলাদেশের কারিগরদের হাতে তৈরি গহনার আলাদা কদর রয়েছে বিশ্ববাজারে। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি গহনার বিপুল চাহিদা রয়েছে। পৃথিবীর সেরা স্বর্ণালঙ্কার শিল্পী ও কারিগররা বাংলাদেশের, যাদের হাতের কাজ বিশ্বসেরা। তেমন একটি বিরাট সুযোগ এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর তেমন জোরালো উদ্যোগ দেখা যায় না। আমাদের স্বর্ণশিল্পী বা কারিগরদের তৈরি স্বর্ণালঙ্কার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব। তারা শত শত বছর ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছেন। একসময় এখাতে আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল। স্বর্ণনীতি না থাকায় ক্রমেই বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছিল তা। জুয়েলারি শিল্পে বিপ্লব ঘটানোর মাধ্যমে হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশের অনেক কারিগর দেশে তেমন ভালো কাজের সুযোগ না পেয়ে ভারতে বিভিন্ন সোনার অলংকার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করছেন। দেশে উপযুক্ত পারিশ্রমিক এবং কাজের মাধ্যমে তাদের সুযোগ দেওয়া হলে তারা বিদেশে না গিয়ে এখানেই তাদের দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটাতে পারেন। বাংলাদেশি কারিগরদের হাতে তৈরি গহনা রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি সোনার গহনা বিদেশের রপ্তানিতে সরকারের নীতি সহায়তা থাকা দরকার।
স্বাধীনতার ৫১ বছরে জুয়েলারি ব্যবসার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন। বিগত দিনগুলোতে স্বর্ণব্যবসাকে সম্প্রসারণ করে প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বেশ কিছু উদ্যোক্তা নানাভাবে অবদান রেখেছেন। আমাদের দেশে স্বর্ণালংকার তৈরির ব্যয় প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এখানে সোনার গহনার দাম অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। স্বর্ণালংকার তৈরিতে অপচয় বা ওয়াস্টেজ কমিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে বিদেশ থেকে বার আকারে স্বর্ণ আমদানি করে অলংকার তৈরি করা হয়। আগামীতে বিদেশ থেকে স্বর্ণের বার আমদানি না করে এখানে গোল্ড রিফাইনারি স্থাপনের মাধ্যমে স্বর্ণের বার তৈরি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এদেশের রিফাইনারিতে উৎপাদিত স্বর্ণের বার এ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ খোদাই করা থাকবে যা আন্তর্জাতিক বাজারে এদেশের সুনাম বৃদ্ধি করবে। আমাদের স্বর্ণালংকার রপ্তানি হবে সারা বিশ্বে। এ খাতে উন্নয়নের জন্য স্বর্ণ চোরাচালান ও পাচার বন্ধে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির কাজের সমন্বয় ঘটিয়ে কার্যকর কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জুয়েলারি শিল্প খাতের উন্নয়ন ও বিকাশে গবেষণার দরকার রয়েছে। এ জন্য একটি ইনষ্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে।
ইউডি/সুস্মিত

