শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক: রাজনীতিবিদ থেকে বাংলার বাঘ হওয়ার ইতিবৃত্ত

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক: রাজনীতিবিদ থেকে বাংলার বাঘ হওয়ার ইতিবৃত্ত

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৯ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:১৫

অবিভক্ত বাংলার জাতীয় নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক যিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নামেই পরিচিত। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার জন্য তিনি ছিলেন সুপরিচিতি। তিনি আপোষহীন ন্যায়নীতি, অসামান্য বাকপটুতা আর সাহসিকতার কারণে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন শেরে বাংলা (বাংলার বাঘ) নামে। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

১৯৫৬ খ্রিঃ পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। তার পূর্বেই হক সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হয়ে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। দুই বছর তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। যুক্ত বাংলার অন্যতম জননেতা ফজলুল হক সুবক্তা হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত ভাষণে তার চিন্তা ও ধারণার সামগ্রিক পরিচয় লাভ করা যায়, মানুষ ফজলুল হকের পরিচয়ও উদ্ভাসিত হয়।

আবুল কাশেম ফজলুল হক কে ছিলেন?
আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন বাঙালি আইনজীবী, লেখক এবং সংসদ সদস্য ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের নিকট শেরে বাংলা এবং ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক অনেক পদে অধিষ্ঠান করেছেন, তার মধ্যে কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩), পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫), পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬-১৯৫৮) অন্যতম। যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। সর্বভারতীয় রাজনীতির পাশাপাশি গ্রাম বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের জন্য তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন
অবিভক্ত বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় জননেতা ফজলুল হকের জন্ম ১৮৭৩ খ্রিঃ ২৮শে আগষ্ট বরিশাল জেলার চাখার গ্রামে। তার পিতা কাজী ওয়াজেদ আলী ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। ১৮৮৯ খ্রিঃ ফজলুল স্থানীয় জেলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পাশ করেন। পরে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ ও রসায়ন, পদার্থ ও গণিতে অনার্স সহ বি.এ এবং ১৮৯৫ খ্রিঃ গণিতে এম.এ পাশ করেন। ১৮৯৭ খ্রিঃ ল পাশ করার পর ১৯০০ খ্রিঃ থেকে বরিশালে স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। এই সূত্রেই মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তের সান্নিধ্যে আসেন।

রাজনৈতিক জীবন
এই সময় থেকেই ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত বলা চলে। অশ্বিনীকুমারের উপদেশ ও নিদের্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বরিশাল শহর মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন এবং বাখরগঞ্জ জেলা বোর্ডের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন এবং জয়লাভ করেন। ১৯০৫ খ্রিঃ ঢাকায় যে মুসলমান রাজনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ফজলুল হক তাতে যোগদান করেন। ঢাকার নবাবের পরামর্শে তিনি মুম্বইতে মহম্মদ আলী জিন্নার সঙ্গে পরিচিত হন। সেই বছরেই ঢাকায় নিখিল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ গঠিত হয়। ১৯০৬ খ্রিঃ ফজলুল হক পূর্ববঙ্গের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ গ্রহণ করেন। পরে সমবায় বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রারের পদেও কাজ করেন। অবশ্য পদোন্নতি না হওয়ায় ১৯১১ খ্রিঃ সরকারী চাকরি ত্যাগ করেন। এরপর কলকাতায় এসে হাইকোর্টে ওকালতি ব্যবসায় শুরু করেন। একবছর সময়ের মধ্যেই কর্মক্ষেত্রে সুখ্যাতি অর্জন করেন। রাজনীতি ক্ষেত্রে যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল। দুবছর পরেই ১৯১৩ খ্রিঃ বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ও নিখিল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের জয়েন্ট সেক্রেটারির পদ লাভ করেন। এই সময়েই সুবক্তা হিসেবে তিনি খ্যাতিমান হন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মুজফ্‌ফ্ফর আহমদের সম্পাদনায় নবযুগ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ফজলুল হক এই পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীর অন্যতম ছিলেন। ১৯২৪ খ্রিঃ তিনি কয়েকমাসের জন্য বাংলার শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে ফজলুল হকের যোগাযোগ ছিল নিবিড়। বিভিন্ন সময়েই তিনি দেশের নিপীড়িত বঞ্চিত কৃষক প্রজাসাধারণের সমস্যার কথা তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। ১৯২৬ খ্রিঃ তিনি কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।


১৯৩৫ খ্রিঃ কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। কিন্তু বিরোধী পক্ষের বিরোধিতায় পরে পদচ্যুত হন। ১৯৩৭ খ্রিঃ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেন্দ্রীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনরায় কর্পোরেশনের মেয়র হন। এই বছরের নির্বাচনে মুসলিম লিগ ও ফজলুল হকের কৃষক প্রজা দল প্রায় সমান সমান আসন লাভ করে। কিন্তু ফজলুল হকই বাংলার প্রধান মন্ত্রী হন এবং কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১৯৪০ খ্রিঃ নিখিল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের সম্মেলনে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন ও পাশ করান।

কিন্তু পরের বছরেই মহম্মদ আলী জিন্নার সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দিলে লিগ থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন। এর ফলে বাংলায় কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। এবারে হক সাহেব ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সঙ্গে প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১৯৪৭ খ্রিঃ দেশভাগের পর ফজলুল হক কিছুকাল ঢাকায় ওকালতি করেন। পরে ১৯৫৩ খ্রিঃ পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী হন। পরে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন এবং একটি শাসনতন্ত্র তৈরি করেন।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে ১৯৪১ খ্রিঃ ১২ই আগস্ট বাংলার বিধান সভায় মুখ্যমন্ত্রী এ . কে ফজলুল হক একটি শোক প্রস্তাব উত্থাপন করে এক অনবদ্য ভাষণ দেন। তিনি বলেন, শব্দের মালা গেঁথে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা সহজ কথা নয়। গত কয়েকদিন ধরে সমগ্র পৃথিবীর অগণিত মানুষ রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাদের গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।

বাংলার বাঘের জীবনাবসান
২৭ এপ্রিল ১৯৬২ সালে আবুল কাশেম ফজলুল হকের জীবনাবসান হয়। আজও বাংলার মানুষ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading