অরুন্ধতী রায়ের আশঙ্কা: ইন্ডিয়া কী হিন্দু-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে!
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৯ জুন ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০
সম্প্রতি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে এক নেত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের কারনে আলোচনার শীর্ষে ইন্ডিয়ার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি। ওই বিতর্কের প্রতিবাদ করায় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ঘর-বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে এবার নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে দলটি। ইন্ডিয়ার আলোচিত লেখিকা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি আলজাজিরায় প্রকাশিত একটি কলামে লিখেছেন। মুসলমানদের বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুলডোজ করার অভ্যাস প্রমাণ করে যে ইন্ডিয়া ‘একটি অপরাধী হিন্দু ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে’। তার প্রকাশিত ওই কলাম নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
গত কয়েক মাস ধরে, ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বারা শাসিত ইন্ডিয়ার রাজ্যগুলিতে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে মুসলমানদের বাড়ি, দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বুলডোজ করা শুরু করেছে৷ আর এই ঘটনাগুলোই ফলাও করে জনসম্মুখে নিয়ে আসছেন ওইসকল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। তারা তাদের এই কর্মকাণ্ডকে নিজস্ব রাজনৈতিক নীতি হিসেবেই প্রকাশ করছেন। অরুন্ধতী রায়ের মতে এই ধরণের কর্মকাণ্ড একটি ত্রুটিপূর্ণ, ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে চিহ্নিত করে যা প্রকাশ্যে এবং নির্লজ্জভাবে প্রবল জনসমর্থনসহ একটি বড় অপরাধ ও হিন্দু-ফ্যাসীবাদী রাস্ট্রে পরিণত হচ্ছে। তিনি লিখেছেন ইন্ডিয়ার মুসলমানরা এখন হিন্দু ধর্মাবলম্বী গুন্ডাদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। হিন্দুদের বইয়ে মুসলমানরা এখন এক নম্বর শত্রু। অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, অতীতে হত্যা, লিঞ্চিং, টার্গেটেড খুন, হেফাজতে হত্যা, ভুয়া পুলিশ ‘এনকাউন্টার’ এবং মিথ্যা অজুহাতে মুসলমানদের কারাগারে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আর বর্তমানে তাদের বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুলডোজ করা এই তালিকায় যুক্ত হওয়া নতুন একটি অস্ত্র যা খুবই কার্যকর। অরুন্ধতী রায়ের মতে, এ ধরণের ঘটনাগুলোকে যেভাবে নিয়ে আসা হচ্ছে তাতে মনে হয় বুলডোজার এক ধরণের ঐশ্বরিক শক্তিসম্পন্ন বস্তু। এই ভয়ঙ্কর যন্ত্রটি তার বিশাল ধাতব নখসহ যা শত্রুকে বধ করতে ব্যবহৃত হয়, এটি একটি পৌরাণিক ঈশ্বরের দানব হত্যার যন্ত্র, যা কমিক-স্ট্রিপ সংস্করণ হিসাবে চিত্রিত হচ্ছে। এটি নতুন, প্রতিশোধমূলক, হিন্দু জাতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তার সাম্প্রতিক ইন্ডিয়া সফরের সময় বুলডোজারের সঙ্গে ছবি তুলেছেন এবং বুলডোজারে উঠে বসেছিলেন। অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে তিনি ঠিক কী করছেন এবং তিনি কাকে সমর্থন করছেন, হয়তো তা তিনি নিজেই জানেন না। কেন একজন রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রীয় সফরের সময় বুলডোজার নিয়ে এ ধরণের উদ্ভট কিছু করবেন? এদিকে, এসকল ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা বিতর্কের মধ্যে ইন্ডিয়ান সরকার বলছেন ভিন্ন কথা। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে যে তারা মুসলমানদের টার্গেট করছেন না, তারা শুধুমাত্র অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলছেন। যা এক ধরণের মিউনিসিপ্যাল ক্লিন-আপ মিশন।
অথচ, এসকল যুক্তি কারোই পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কথা নয়। এসব যুক্তি উপহাস বৈকি আর কিছুই নয়। কেননা স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ এবং বেশিরভাগ ইন্ডিয়ান এটা জানেন যে ইন্ডিয়ার প্রতিটি শহর তথা শহরের বেশিরভাগ নির্মাণ হয় অবৈধ কিংবা তাতে কিছুটা আইনি বাধা থাকেই। আর তাই বিনা নোটিশে, আপীল কিংবা শুনানির সুযোগ ছাড়াই শাস্তির কারণে মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসায় বুলডোজ করা একসঙ্গে বহু প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে যায়।

বুলডোজার যুগের আগে, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশ দ্বারা মুসলমানদের শাস্তি দেওয়া হতো। এমন একটা বিষয় হচ্ছে যে মুসলমানদের স্থাপনাগুলো বুলডোজ করার সময় শুধু পুলিশ নয়, মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ, মিডিয়াকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে এবং এসব কর্মকাণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করতে হবে। এক্ষেত্রে মুসলমানদের পরোক্ষভাবে বোঝানো হয়েছে, তারা একাই আছে। তাদের সাহায্যে কেউই আসবে না। তাদের কোন আপিল আদালত নেই।

এদিকে, ইন্ডিয়ার উত্তরপ্রদেশে বিক্ষোভকারীদের ঘরবাড়ি বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে যোগী আদিত্যনাথের সরকারকে নোটিশ ইস্যু করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি আইন অনুযায়ী হতে হবে। তা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হতে পারে না। তবে, সর্বোচ্চ আদালত অবশ্য উত্তরপ্রদেশ সরকারকে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া বন্ধের নির্দেশ দেননি। আদালত বলেছেন, তাঁরা ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া স্থগিত করতে পারেন না। বরং তাঁরা রাজ্য সরকারকে আইন অনুযায়ী চলতে বলতে পারেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশে বিক্ষোভ হয়। এই বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে মুসলমান জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার। উত্তরপ্রদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যোগী সরকারের বুলডোজার নীতির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। উত্তরপ্রদেশে অবৈধভাবে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায় তারা। তবে উত্তরপ্রদেশ সরকারের দাবি, তারা আইন অনুসরণ করেই কাজ করছে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর তরফে করা মামলার শুনানিতে এদিন সুপ্রিম কোর্ট বলেন, সবকিছু সঠিকভাবে হওয়া উচিত। আমরা আশা করি কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী কাজ করবে। অপ্রীতিকর কিছু যেন না ঘটে এজন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। আগামী মঙ্গলবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি। এর আগেই ইউপি সরকার ও স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জমিয়তের তরফে আইনজীবী সিইউ সিং বলেন, ‘কোনও বাড়ি ভাঙার আগে ১৫ থেকে ৪০ দিনের নোটিশ দিতে হয়। ইউপিতে সেটা করা হয়নি।’

অন্যদিকে, অন্যান্য সম্প্রদায়ের সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, গত ১৬ জুন, বিজেপি সরকারের নতুন সেনা নিয়োগ নীতিতে ক্ষুব্ধ কয়েক হাজার যুবক ইন্ডিয়ার উত্তরাংশ জুড়ে হিংসাত্মক তাøব চালায়। তারা ট্রেন ও যানবাহন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো, রাস্তা অবরোধ করেছে এবং একটি শহরে তারা বিজেপি অফিসও পুড়িয়ে দিয়েছে। তাদের অধিকাংশই মুসলিম নয়। আর সেক্ষেত্রে তাই তাদের বাড়িঘর ও পরিবার নিরাপদ আছে এবং থাকবে। ২০১৪ এবং ২০১৯ এর দুটি সাধারণ নির্বাচনে, বিজেপি দৃঢ়ভাবে দেখিয়েছে যে দেশটির জাতীয় নির্বাচনে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ইন্ডিয়ার ২০০ মিলিয়ন-শক্তিশালী মুসলিম জনসংখ্যার ভোটের প্রয়োজন নেই। সুতরাং, কার্যত, আমরা এক ধরণের ভোটাধিকার ত্যাগের দিকে তাকিয়ে আছি। আর এক্ষেত্রে এর ফলাফল হবে খুবই ভয়ঙ্কর। কেননা একবার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলে আর কিছু যায় আসে না। গুরুত্ব একবার চলে গেলে সেটা ফেরানোই কঠিন।
বিজেপির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র বিষয়কে অপমান করার পরেও বিজেপি তার মূল সমর্থকদের সমর্থন হারায়নি, এমনকি অর্থপূর্ণ সমালোচনার সম্মুখিন হয়নি। নিজ ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র বিষয়কে অপমানের পর মুসলমানরা চুপ করে থাকেনি, তারা প্রতিবাদ করেছে এবং সেটাই স্বাভাবিক।
প্রতিবাদকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ব্লাসফেমি আইনের আহ্বান জানিয়েছিল, যা পাস হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে সম্ভবত বিজেপি’ই। কারণ হিন্দু জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে প্রায় সকল মন্তব্যও সেই আইনের অধীনে পরে। এটি কার্যকরভাবে সমস্ত সমালোচনাকে নীরব করবে এবং রাজনৈতিক ও আদর্শিক গভীরতা সম্পর্কে সকল ইতিবাচক মন্তব্যকে মজবুত করবে। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) দলের একজন সেই বিতর্কিত মন্তব্যকারী নেত্রীকে ফাঁসি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল এবং অন্যরা শিরচ্ছেদ করারও আহ্বান জানিয়েছিল। অপরদিকে, বিক্ষোভের পর যে মেরুকরণ দাঁড়িয়েছে তা বিজেপির প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করেছে। অপমান করা বিজেপির মুখপাত্রকে দল থেকে বরখাস্ত করা হলেও তার ক্যাডাররা তাকে প্রকাশ্যে আলিঙ্গন করেছে। এথেকে সুস্পষ্ট হয় যে, তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

ইন্ডিয়ায় আমরা এমন এক সনাতন রাজনৈতিক ধারার মধ্য দিয়ে চলছি যা প্রতিটি উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকেই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এর ফলে ইন্ডিয়ার নতুন প্রজন্মের তরুণরা তাদের দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্যুৎ হয়েই নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাবে।
প্রায় ৪০০টি টিভি চ্যানেল, অগণিত ওয়েবসাইট এবং সংবাদপত্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি মিডিয়ার সাহায্যে শাসনব্যবস্থা – হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের উভয় দিকে ঘৃণা ছড়ানো স্টক চরিত্রগুলির দ্বারা উস্কানি দিয়ে ধর্মান্ধতা এবং ঘৃণার একটি ক্রমাগত ঢোল বাজিয়ে চলেছে।উগ্র হিন্দুদের মধ্যে একটি আক্রমণাত্মক অস্থিরতা সৃস্টি হয়েছে যা মোদী সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে ক্রমবর্ধমান চাপ দিচ্ছে, কেননা তারা বিজেপির মূল সমর্থন ভিত্তি। সোশ্যাল মিডিয়াতে ইন্ডিয়ান মুসলমানদের গণহত্যার জন্য খোলামেলা আহ্বান এটা নিশ্চিত করে যে আমরা নো রিটার্ন পয়েন্টে পৌঁছে গেছি। আমরা যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, বিশেষ করে ইন্ডিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়কে এখন ভাবতে হবে যা তা হল, কীভাবে এর থেকে বাঁচতে পারি? কিভাবে এটা প্রতিহত করতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ আজ ইন্ডিয়ায় প্রতিবাদ যতই শান্তিপূর্ণ হোক না কেন, সন্ত্রাসবাদের মতোই জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

