স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ হোক
রেজাউল করিম । রবিবার, ৩১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০
দেশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অবকাঠামোগত মান যতটা বেড়েছে, সে তুলনায় সেবার মান প্রত্যাশিত নয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক স্টেন্টার ও হাসপাতালগুলোতে এই বাস্তবতা লক্ষণীয়। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম-উপজেলা পর্যন্ত গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্র। এগুলোর মান এবং সেবা নিয়ে রয়েছে এন্তার অভিযোগ। কখনও কখনও ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন অনেক রোগী। এ নিয়ে মিডিয়ায় প্রচুর সংবাদ প্রায়ই প্রকাশিত হয়ে আসছে। অবৈধ ও অননুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করার দাবি বিভিন্ন সময়ে সচেতন মহল থেকে উঠেছে। এদিকে অনেক দিন ধরে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২৫ মে সারা দেশের অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫ জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪১টি অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন। তবে লক্ষণীয় বিষয়, এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফের রমরমা ব্যবসায় মেতে উঠছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে নজরদারির ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট করে।
অভিযানের মধ্যেও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে চলছে অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বিভাগীয় শহরের বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বেশি। তথ্য অনুসন্ধানে প্রকাশ, ১ ও ২ জুন রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলার বাঘা উপজেলার সর্বাধিক ১১টি অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ ঘোষণা করে সিভিল সার্জন অফিস। তবে এসব ক্লিনিকের বেশ কয়েকটি আগের মতোই চলছে বলে জানা যায়। খুলনা বিভাগেও অভিযান অনিয়মিত হওয়ায় গোপনে চিকিৎসা দিচ্ছে বন্ধ করে দেওয়া কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র। সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নিয়ে ব্যবসা করছে। এমনও অভিযোগ, বন্ধ ঘোষণার তালিকায় আছে এমন একাধিক প্রতিষ্ঠান মাইকিং করে রোগী ডাকছে এবং তাদের চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ হয়নি মর্মে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। প্রকাশ, অন্য বিভাগের মতো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, বরিশাল ও সিলেট বিভাগে বন্ধ করে দেওয়া হাসপাতাল-ক্লিনিকের অনেকই ফের রোগীদের সেবা দিচ্ছে। অথচ কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের অভিযান এখনও চলমান রয়েছে। তাহলে বন্ধ করে দেওয়া চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো কীভাবে চলছে- তা বড় প্রশ্ন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নড়েচড়ে বসার এবং সে কারণে দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের সাধুবাদের কথা চারিদিকে চাউর হচ্ছে। কিন্তু, অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধে অভিযান চালানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরও কতিপয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা চিকিৎসা প্রার্থীরা নতুন করে উত্থাপন করতে চাইছেন। তাদের বক্তব্য হলো: অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার বন্ধের পাশাপাশি ‘রোগ নির্ণয় ফি যৌক্তিকীকরণ, ‘চিকিৎসকদের কন্সালটেশন ফি নির্দিষ্টকরণ’ এবং ‘রোগী দেখার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার’ মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও সম্পন্ন করার সময় এসেছে এখন। এডিজি (প্রশাসন) আহমেদুল কবীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তেমনিভাবে ‘ডায়াগনস্টিক ফি যৌক্তিকীকরণে’র মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন না করায় জনগণের পকেট থেকেও যে কয়েক হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
আমরা মনে করি, অবৈধ ও নিবন্ধনহীন চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের চলমান উদ্যোগে জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। এটিকে অবশ্যই সফল করতে হবে। সংগত কারণেই অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জারি রাখতে হবে। কেননা, মানুষ জীবন নিয়ে চিকিৎসার নামে ব্যবসা কিছুতেই প্রত্যাশিত নয়। অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্র খুঁজে বের করতে জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন বাড়াতে হবে। এভাবে সহজেই বৈধ-অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্রের তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। কার্যক্রম পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে আনা যাবে। না হলে সেখানে সেবা নিয়ে অসহায় রোগীরা বিপদে পড়বে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণে চাহিদা মোতাবেক জনবল নিশ্চিত করা হোক। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অবশ্যই জনগণের সন্তুষ্টির পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে এর বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার জনকল্যাণমুখী অসংখ্য সিদ্ধান্ত প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন করে চলেছে। সেক্ষেত্রে মানতেই হবে যে এ জন্য স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা খুবই জরুরি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

