ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি: অর্থনীতিতে রূপালী আলোর ঝিলিক
রেজাউল করিম খোকন । মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৯:৫০
দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তবে হঠাৎ নয়, স্বাভাবিকভাবেই ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে। মূলত জাটকা নিধন ও মা ইলিশ ধরা বন্ধ এবং মাছের অভয়ারণ্য বাস্তবায়নের কারণেই ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। মা ইলিশ ও ডিম বাড়ছে, মাছও বাড়ছে। দেশের একশটি নদীতে কমবেশি ইলিশ পাওয়া গেলেও ইলিশের প্রজনন ও পরিপক্কতা দক্ষিণাঞ্চলে নদীতেই হয়। এ অঞ্চলের মেঘনা নদীর ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের আলেকজান্ডার, ভোলার শাহবাজপুর চ্যানেল, তেঁতুলিয়া নদী, পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক ও রামনাবাদ-এই পাঁচটি চ্যানেলকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ইলিশের বাস সাগরে। কিন্ত ডিম ছাড়ার আগে নদীর মিঠাপানিতে আসে। ডিম ছাড়ার সময় হলে দিনে ৭০ থেকে ৭৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ায় ইলিশ সাগর থেকে যতই নদীর মিষ্টি পানির দিকে আসে, ততই এর শরীর থেকে লবণ কমে যায়, স্বাদ বাড়ে। একটি মা-ইলিশ সর্বনিম্ন দেড় লাখ ও সর্বোচ্চ ২৩ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। ইলিশ সাগর থেকেও ধরা হয়, কিন্ত সাগরের ইলিশে লবণের পরিমাণ বেশি থাকায় নদীর ইলিশের মতো সুস্বাদু হয় না।
বাঙালির প্রিয় ইলিশ মাছের বংশবৃদ্ধি উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমার পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছে। ইলিশ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে দেশের ইলিশ মাছ বিশেষজ্ঞরা সরকারকে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এখনো দেশে ইলিশের মাইগ্রেশন পথ, অর্থাৎ আসা-যাওয়ার পথ চিহ্নিত করা যায়নি। এ নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই। ফলে কখন ইলিশ আসে, কখন যায়, কোন পথ দিয়ে যায়, তা জানা না গেলে জাটকা নিধন ও মা ইলিশ ধরা বন্ধ করা যাবে না। সুতরাং সঠিক গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে এল ননোর কারণে এবার মাছের উৎপাদন বেশি, সেই এল নিনো সম্পর্কে সরকারের লোকজনের ধারণা থাকতে হবে। নতুবা মাছ এসে ফিরে যাবে, সংরক্ষণ করা যাবে না। নদীগুলো ইলিশ উপযোগী কিনা বা মাছ সংরক্ষণ মৌসুম কতদিন রাখতে হবে, সেটি জানতে গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোয় ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। পানির মান ভালো হলে শুধু যে উৎপাদন বাড়ে, তাই না, বাড়ে এর প্রজনন সফলতা। ইলিশের ডিম ছাড়ার হারকে বলে প্রজনন সফলতা। গত বছর প্রজনন সফলতা ৫১ শতাংশ ছিল। আগের বছর এটি ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। এবার এ হার আরো বাড়বে বলেই ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। নানা পদক্ষেপের কারণে মাছের রাজা ইলিশের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বছরে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হচ্ছে। আগামীতে ইলিশ উৎপাদন নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে। আশা করা যায় উৎপাদন ছয় লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। ইলিশ জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রয়োজনে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জটিকা নিধন রোধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে। যে কোনো মূল্যে সরকার নদী থেকে জাটকা ধরা বন্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সবার সহযোগিতা চায়। বিদেশে মাছ রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধুমাত্র ইলিশ মাছ রপ্তানি করতে না পারায় তাদের অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়। ওদিকে সরকার চাইছে, দেশের সব মানুষের জন্য ইলিশ মাছ সহজলভ্য করার পর রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে। বাংলাদেশে মা ইলিশ ও জাটকা ধরায় কড়াকড়ির কারণে গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদন অনেক বেড়েছে।
বিশ্বে বিভিন্ন দেশের ইলিশের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ইলিশ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড তো বটেই, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণকারী অন্যতম দেশও। কেননা ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই যেখানে ইলিশের উৎপাদন কমছে, সেখানে একমাত্র বাংলাদেশেরই ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছর ৮-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিশ্বের যেসব দেশে বাঙালির বসবাস রয়েছে সেসব দেশেই মূলত ইলিশের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ এখন ইলিশ উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বিশ্বের মধ্যে এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে। ইলিশ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি সম্ভব হবে।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

