জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: জীবনযাত্রার সব সূচকে অসহনীয় ধাক্কা

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: জীবনযাত্রার সব সূচকে অসহনীয় ধাক্কা

শোয়েব শাহরিয়ার । মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:২০

মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটে নিত্যপণ্যের দামে সংসার চালাতে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ঠিক সে সময়ে এলো বড় দুঃসংবাদ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ৯ মাসের মাথায় ফের ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এবার অকটেন ও পেট্রোলের দামও বেড়েছে। এক লাফে ৪৭ শতাংশের বেশি দাম বাড়ানো হয়েছে। কোনো রকম জানান না দিয়ে হঠাৎ করে রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির কারণ বোধগম্য নয়। এর ফলে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব সর্বত্র পড়বে সেটা সরকারের আমলে নেয়া উচিত ছিল।

এতে আরও চাপে পড়বে দেশের সাধারণ মানুষ। আগে থেকেই দ্রব্যমূল্যের চাপে চিড়েচ্যাপ্টা সাধারণ মানুষের জীবন। চাল ও ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির হিড়িক পড়েছে আগে থেকেই। কাঁচা মরিচের ঝাঁজ সহ্য করতে পারছে না জনসাধারণ। কাঁচা মরিচের কেচি ২৫০ টাকা। এর মধ্যে বাড়িয়ে দেয়া হলো সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকার আইএমএফের কাছ থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে ভর্তুকি কমাতে তেলের দাম বাড়িয়েছে। এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম এর আগে কখনোই এত বেশি বাড়ানো হয়নি।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করলেও দেশে এক লাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৪ টাকা। অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল লিটারে ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ৮৬ থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শুক্রবার রাত ১২টায় নতুন দামে তেল বিক্রি শুরু হয়। এর দুই ঘণ্টা আগে দাম বৃদ্ধির গেজেট জারি করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে পেট্রোল পাম্পে তেলের জন্য ভিড় করেন হাজার হাজার ক্রেতা। এতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। এবারের দাম বৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এর ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, সঙ্গত কারণেই দ্রব্যমূল্যও বাড়বে। সেচের খরচও বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্য মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। সার্বিকভাবে অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে। সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া লাগামহীন হবে। দাম বৃদ্ধি জনগণের জন্য অভিশাপ হবে বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এক লাফে এত দাম বৃদ্ধি অন্যায্য। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।

সরকারের ভাবা উচিত, খাদ্যসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই। করোনায় সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। এর পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মানুষ দিশেহারা। এমন বৈরী পরিস্থিতিতে কমিশনকে পাশকাটিয়ে এভাবে দাম বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা গণতান্ত্রিক সরকারের কাজও নয়। এর ফলে কৃষি উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। এতে কৃষক মারাক্তকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কৃষিজাত পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাবে। অবিবেচনাপ্রসূত উচ্চহারের এ মূল্য বৃদ্ধি সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয়ে নজিরবিহীন উলস্নম্ফন সৃষ্টি হবে। এমন দুঃসহ পরিস্থিতি কেউ প্রত্যাশা করে না। এমনিতেই নত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী, দেশব্যাপী লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে যখন শিল্প-কারখানার উৎপাদনে ধস নেমেছে তখনই জ্বালানি তেল বাড়ানো জনবান্ধব সরকারের সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে এমন গুজব অনেক দিন থেকে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয় এটা সত্য। সরকারকে যে কোনো বিষয়ে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আশ্বস্ত করতে হবে দেশের জন সাধারণকে। গণবিরোধী কোনো পদক্ষেপই কল্যাণ বয়ে আনে না। সঙ্গত কারণেই জনস্বার্থ সংরক্ষণ করা জরুরি। চলমান করোনা মহামারির মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রে যুদ্ধের জেরে বাংলাদেশের বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ তাদের ব্যয় বহন করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। ঠিক এমনই এক ক্ষণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো।

লেখক- সমাজ গবেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading