বায়ুবিদ্যুৎ: বাড়বে জীবনযাত্রার মান, শক্তিশালী হবে অর্থনীতি

বায়ুবিদ্যুৎ: বাড়বে জীবনযাত্রার মান, শক্তিশালী হবে অর্থনীতি

ফাহাদ হোসেন । মঙ্গলবার, ৩০ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৪:২০

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় এর চলমান উন্নয়নের অগ্রগতি ধাবিত করতে এবং জনগণের বিদ্যুতের চাহিদা ঠিকমতো পূরণ করতে দরকার প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে উৎপাদন ও জোগানের তারতম্য রক্ষা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না।

ইউক্রেন-রাশিয়ার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি না করলে দিনে দিনে জ্বালানি নিরাপত্তার সমস্যা প্রকট রূপ ধারণ করবে। আমাদের দেশ মূলত গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। এটি বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেননা, গ্যাস ও তেল হচ্ছে অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ফলে যদি আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বায়ুশক্তির বিকল্প উৎসের কথা চিন্তা না করি, তবে একটা সময় আমাদের বিরাট সমস্যার মুখে পড়তে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা বিদ্যুৎ পাওয়ার তিনটি উপায় হচ্ছে সূর্য, বায়ু ও পানি। বাংলাদেশে অবারিত ও পর্যাপ্ত সূর্যালোক রয়েছে। এরই মধ্যে দেশে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া পানিবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, পৌর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গোবর ও পোলট্রি বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস এবং ধানের তুষ ও ইক্ষুর ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন শুরু হয়েছে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশের। এজন্য বর্তমানে সরকার বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে নিত্যনতুন প্রকল্প গ্রহণ করছে, তার মধ্যে উইন্ডমিল বা বায়ুকল একটি। জলবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি ইত্যাদি নবায়যোগ্য উৎসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্য অর্জনের পর সরকার অন্য একটি নবায়নযোগ্য উৎস বায়ুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। তারই অংশ হচ্ছে উইন্ডমিল বা বায়ুকল।

বাংলাদেশে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে গবেষণা ও বিনিয়োগের স্বল্পতা রয়েছে। ১৯৮২ সালে একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেশের ৩০টি আবহাওয়া তথ্য স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে দেখা যায়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা থেকে প্রাপ্ত বায়ুগতি ছিল বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত স্থান। এরপর আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বায়ুশক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০০৫ সালে ফেনীর মহুরী নদীর তীর ও সোনাগাজী চরাঞ্চল ঘেঁষে খোয়াজের লামছি মৌজায় ছয় একর জমির ওপর স্থাপিত হয় বাংলাদেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হলেও পল্লী বিদ্যুতের একটি ফিডারে যোগ হয়ে তা বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা হলেও মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।

যদিও ২০০৭ সালে কারিগরি ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত বাতাস না থাকায় এর কার্যক্রম বেশ কয়েক বছর বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে সংস্কার করে ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে তা পুনরায় চালু হয়। বর্তমানে পিডিবির প্রজেক্টের আওয়তায় প্যান এশিয়া পাওয়ার সার্ভিস লিমিটেডের মাধ্যমে চারটি টারবাইন দিয়ে বাতাস কাজে লাগিয়ে ২২৫ কিলোওয়াট করে ৯০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটির সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা শূন্য দশমিক ৯০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশের অন্য আরেকটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায়। ২০০৮ সালের পহেলা বৈশাখে এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ৬০০ গ্রাহকের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিতরণও করা হয়েছিল।

এছাড়া সরকার বায়ু থেকে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কাজ শুরু করেছে। তাছাড়া বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো বেশ কিছু প্রকল্প পরিকল্পনাধীন আছে, যেমন :চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি বিচ এলাকায় ৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, ২২টি সম্ভাব্য এলাকা বাছাই করে সেই সব এলাকায় বায়ুর গতি সম্পর্কে জরিপ চালানো ইত্যাদি।

সর্বোপরি এসব প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বৃদ্ধি পাবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাশ্রয়ী হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি এবং উৎপাদন বাড়বে। এতে করে বাড়বে মানুষের জীবনযাত্রার মান, শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতি, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading