নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস: ফের থ্যাচারের ছায়ায় ব্রিটেন!
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:২০
নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে ঋষি সুনাককে হারিয়েছেন লিজ ট্রাস। যার মধ্যে বিশ্লেষকগণ খুঁজে পান মার্গারেট থ্যাচারের ছায়া। সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয়েছে ট্রাসকে। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করবেন ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক
ব্রিটেনের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস আর সাবেক অর্থমন্ত্রী ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাকের গত কয়েক সপ্তাহের ব্যাপক তিক্ততা ও বিভক্ত নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটল। গতকাল সোমবার কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনে ভোটাভুটি হয়েছে। সেই নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যদের ভোটে শীর্ষে উঠে আসেন লিজ ট্রাস। ৮১ হাজার ৩২৬ ভোট পেয়ে কনজারভেটিভ দলীয় প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী ঋষি সুনাক পেয়েছেন ৬০ হাজার ৩৯৯ ভোট। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচিত হওয়ায় আজ মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) ব্রিটেনের সরকার গঠনের আমন্ত্রণের জন্য বালমোরালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন লিজ ট্রাস। এর ফলে তিনি আজ দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী তথা তৃতীয় নারী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবেন। এদিকে, ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার এক অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার নিয়োগ আপনার দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার নেতৃত্বের প্রতি ব্রিটিশ জনগণের আস্থা ও আস্থার সাক্ষ্য।

‘থ্যাচারের যেন কার্বন কপি’
ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ট্রাস আসলে থ্যাচারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করছেন। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের প্রশংসা করতে কখনই ক্লান্ত হতে দেখা যায়নি তাকে। কয়েক মাস ধরে ট্রাস ব্রিটিশদের পেশাদারভাবে স্টাইল করা ফটো দিয়ে বিনোদন দিচ্ছেন, যা প্রায় থ্যাচারের মুহূর্তগুলোর কার্বন কপি। যেমন যখন তিনি মস্কো গিয়েছিলেন, তখন একটি লম্বা কোট এবং পশমের টুপি পরেছিলেন, ঠিক ৩৫ বছর আগে থ্যাচার যেমনটা করেছিলেন। ট্রাস ৩০ বিলিয়ন পাউন্ড (৩৭ বিলিয়ন ডলার) ট্যাক্স কমানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন অনেকটা থ্যাচারের মতো। থ্যাচার ১৯৮০-এর দশকে ব্যক্তিগত আয়কর কমিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় অবিলম্বে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ট্রাসের মতে, এই পদক্ষেপ মুদ্রাস্ফীতিকে লাগাম টেনে ধরতে পারবে। ‘ট্রুসোনোমিকস’ হলো ট্রাসের প্রস্তাবের জন্য ব্যবহƒত শব্দ। সরবরাহ-সদৃশ অর্থনীতির তার নিজস্ব সংস্করণ। এটা থ্যাচারের অর্থনৈতিক নীতির একটি মূল বৈশিষ্ট্য। ট্রাসের পরিকল্পনার মধ্যে আছে করপোরেট আয়করের পরিকল্পিত বৃদ্ধি প্রত্যাহার এবং সামাজিক নিরাপত্তা হারের সাম্প্রতিক বৃদ্ধিকে ফিরিয়ে আনা। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে ‘পরিচয়ের রাজনীতির’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ট্রাস। জেফরি বলেন, ‘কোনো প্রশ্নই নেই যে ট্রাস মাঝেমধ্যে নিজেকে থ্যাচার মনে করেন। থ্যাচারের একটি পরিষ্কার ধারণা ছিল যে তিনি দেশটিকে কেমন দেখতে চান। তবে এটি স্পষ্ট নয় যে ট্রাসের দৃষ্টিভঙ্গি একই।

দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী এক নারী: বেক্সিটের সমর্থক কনজারভেটিভ পার্টির ডানপন্থীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে লিজ ট্রাসের। সাবেক লিবারেল ডেমোক্র্যাট কর্মী লিজ ট্রাস আশির দশকে মার্গারেট থ্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এখন নিজেকে থ্যাচারপন্থী শিখার রক্ষক বলে দাবি করেন। মেরি এলিজাবেথ ট্রাস যে একটি রাজনৈতিক যাত্রায় রয়েছেন তা বলাই যায়। ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে তার পূর্বসূরির মতো ঘরোয়া নাম নাও পেতে পারেন ট্রাস। এমনকি বরিস জনসনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে টরি এমপিদের প্রথম পছন্দও ছিলেন না তিনি। কিন্তু তার কর হ্রাস ও রাষ্ট্রকে সঙ্কুচিত করার মতো মৌলিক রক্ষণশীল মূল্যবোধে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি সঠিক প্রমাণিত হয়েছে এবং দলের সদস্য যারা জনসনের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন তারাও ট্রাসের অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন।
নেতৃত্ব নিয়ে তিক্ততা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত জনসনের অনুগত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস। তৃণমূলের টরি সমর্থকরা মার্গারেট থ্যাচারের মতো লিজ ট্রাসের মাঝে অটল, অনমনীয় এবং দৃঢ় সংকল্পের গুণাবলী দেখেন। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক অবস্থান এবং আনুগত্য বদলানো সত্ত্বেও এসব শব্দ প্রায়ই শোনা যায় যখন বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যরা তাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ চরিত্রের অধিকারী বলে বর্ণনা করেন।
যেভাবে উঠে আসা: বামপন্থি পরিবারে জন্য নেয়া ট্রাস প্রথমে লিবারেল ডেমোক্র্যাট ছিলেন৷ তবে ২০১০ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টি থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন৷ ট্রাস ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিলেন৷ তবে ব্রিটিশরা ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিলে তিনি দ্রুতই ব্রেক্সিটের কট্টর সমর্থক হয়ে উঠেছিলেন৷ এরপর ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন লিজ ট্রাসকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গড়া প্রতিনিধি দলের প্রধান করেছিলেন৷ গতবছর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ট্রাস৷ লিজ ট্রাস যেসব পোশাক পরেন এবং ছবি তোলার জন্য যেসব জায়গা বেছে নেন, যেমন এস্তোনিয়ায় গিয়ে ট্যাঙ্কে এবং মস্কোয় গিয়ে পশমের টুপি পরে ছবি তোলা, ইত্যাদি কারণে অনেকে তাকে প্রথম নারী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তুলনা করেন৷ ইউক্রেন ইস্যুতে তিনি রাশিয়ার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত৷
অর্থনৈতিক সংকট কাটনোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ: লিজ ট্রাস এমন এক সময়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন, যখন দেশটিতে মূদ্রাস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিরাট সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আসন্ন শীত মৌসুমে ইউরোপে জ্বালানি গ্যাসের ঘাটতির কারণে যে সংকট তৈরি হবে, সেটিই নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। দায়িত্ব নেয়ার পরই লিজ ট্রাস জ্বালানির ব্যয় মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখতে একটি বড় সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে সম্প্রতি এক বিবৃতিতে লিজ ট্রাস বলেন, আমার একটি দৃঢ় পরিকল্পনা আছে, যা আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে। এতে উচ্চ মজুরি পাওয়া যাবে, পরিবারগুলোর জন্য আরও বেশি করে নিরাপত্তা এবং বিশ্বমানের জনসেবা নিশ্চিত করবে। তিনি আরও বলেন, আমি যদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হই, তাহলে কখনোই কাউকে আমাদের ছোট করে কথা বলতে দেব না। আমাদের এ দেশের সাফল্য নিশ্চিত করতে আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করব।
কেন শুধু দেড় লক্ষ মানুষের ভোট?
বরিস জনসনের পরিবর্তে তার নিজের রাজনৈতিক দলের প্রায় ১,৬০,০০০ সদস্য তার উত্তরসূরী নির্বাচন করলো। প্রশ্ন আসে গত সাধারণ নির্বাচনে যেখানে ৪০ লক্ষ ৭০ হাজার ভোটার নিবন্ধিত ছিলেন, সেখানে এত কম সংখ্যক লোক কীভাবে দেশের একজন নেতা নির্বাচন করতে পারেন? এর জবাব লুকিয়ে রয়েছে ব্রিটেনের অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে। যার অর্থ, এবার নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে শুধুমাত্র তারাই ভোট দেবেন যারা কনজারভেটিভ পার্টির চাঁদা দানকারী সদস্য। কিন্তু ব্যাপারটি এবারই প্রথমবার নয়। কখনও কখনও এর চেয়েও কম লোক নতুন নেতা বেছে নিয়েছেন।
নেপথ্যে বয়স্ক এবং শ্বেতাঙ্গ প্রসঙ্গ: গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মতোই কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যরা দেশের জনসংখ্যার বাকি অংশের তুলনায় একটু বেশি বয়স্ক, একটু বেশি মধ্যবিত্ত এবং একটু বেশি শ্বেতাঙ্গ।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি এবং সাসেক্স ইউনিভার্সিটির পার্টি মেম্বার্স প্রজেক্টের প্রধান প্রফেসর টিম বেল বলছেন, যারা আমাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বেছে নিচ্ছেন তারা সামগ্রিকভাবে মোটেও সাধারণ ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। অধ্যাপক টিম বেলের দলের তৈরি ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ৯৭% কনজারভেটিভ সদস্য ছিলেন ‘শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ,’ অন্যদিকে লেবার পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ছিল ৯৬%।

ইতিহাস গড়া হলো না সুনাকের: ইতিহাস গড়তে পারলেন না ঋষি সুনাক। প্রথম ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত কেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বেশ ভালো ভাবেই ছিলেন। ইন্ডিয়ান অভিবাসীর ঘরে গ্রহণ করা সুনাকের মা-বাবার একজন চিকিৎসক, অন্যজন ফার্মাসিস্ট৷ তিনি সরকারি স্কুলে না গিয়ে বেসরকারি অভিজাত স্কুলে পড়াশোনা করেছেন৷ এরপর অক্সফোর্ডে পড়েছেন৷ আমেরিকার স্ট্যানফোর্ডে পড়তে গিয়ে সুনাক তার ভবিষ্যৎ স্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত হন৷ সুনাকের শ্বশুর ইন্ডিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা৷ ২০১৫ সালে প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন সুনাক৷ অর্থমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বিভিন্ন কেলেংকারির অভিযোগ এনে জনসনের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি৷ জনসনের পদত্যাগের পেছনে সুনাকের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ আছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন৷
এর আগে ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। তিনি ১৯৭৯ সাল হতে টানা ১১ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। থেরেসা মে ২০১৬ সালে ব্রিটেনের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, কিন্তু ব্রেক্সিট নিয়ে তীব্র বিভেদ এবং টানাপোড়েনের মধ্যে তাকে বিদায় নিতে হয়।
ইউডি/কেএস

