বাংলাদেশে আঘাত হানা প্রলয়ংকরী যত ঘূর্ণিঝড়
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার , ২৪ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১১:৪০
বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের দেশ। বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতাকে দায়ী করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের গঠন ও তীব্রতাকে সহায়ক করে তুলছে। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা ব-দ্বীপটিতে প্রায় প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় আঘাত করে। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল থাবায় লন্ডভন্ড হয় উপকূল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড ১৬৯৯ সাল থেকে মৃতু্যর সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের ৩৫টি সবচেয়ে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের তালিকা করেছে। এই তালিকার ২৬টি ঘূর্ণিঝড়েরই উৎপত্তিস্থল বঙ্গোপসাগর। যার ১৯টিই বড় ধরনের ক্ষতি ঘটিয়েছে বাংলাদেশের।
বাংলাদেশ ভূখন্ডে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ে ১৯৭০ সালে প্রায় ৫ লাখ, ১৯৮৮ সালে ১ লাখ ৮ হাজার এবং ১৯৯১ সালে ৫৭ হাজারেরও বেশি মানুষ মৃতু্যবরণ করে। এছাড়া আইলা, ফণী, মহসিন, নার্গিস ইত্যাদি ঘূর্ণিঝড় জনজীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এগুলোর ভয়াবহতা ছিল অত্যধিক। বারবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ ও দেশের মানুষ। অবশ্য সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের ফলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।
২০০৭ সালের নভেম্বরে আঘাত হানা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারান। ২০০৮ সালের মে মাসে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় নার্গিস আঘাত হানে। ২০০৯ সালে হ পৃষ্ঠ
২৫ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও খুলনা উপকূলে এই ঘূর্ণিঝড় ভারতের ১৪৯ জন ও বাংলাদেশের ১৯৩ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। ২০১৩ সালের ১৬ মে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূল আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন। এই ঝড় বাংলাদেশে ১৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় কোমেন। ২০১৬ সালে ২ মে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে এবং ভারতে আংশিক অঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। এই ঝড়ে ২৬ জনের মৃতু্য হয়। ২০১৭ সালের ৩০ মে কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মোরা। দু’জন নারীসহ তিনজন মারা যান। ২০১৯ ?সালের ৩ মে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে বাংলাদেশে ৯ জনের মৃতু্য হয়। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগরদ্বীপ উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগ দিয়ে বাংলাদেশে আঘাত করে। ঝড়ে মারা যান ২৪ জন। বৈশ্বিক মহামারি করোনার মধ্যেই ২০২০ সালের ২০ মে পশ্চিমবঙ্গে তান্ডব চালিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আম্পানে ২৩ জনের প্রাণহানি হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়কে। প্রাণহানি ও ভয়ংকরের দিক থেকে পৃথিবীর ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাসে ষষ্ঠ স্থান দখল করে আছে বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়। ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর বাকেরগঞ্জের উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড় ‘দ্য গ্রেট বাকেরগঞ্জ ১৮৭৬’ নামেও পরিচিত। মেঘনা মোহনা এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল ও নোয়াখালী উপকূল পস্নাবিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে বাকেরগঞ্জের নিম্নাঞ্চল সম্পূর্ণভাবে পস্নাবিত হয়ে যায়, ঝড়ে আক্রান্ত ব্যতীত সমপরিমাণ মানুষ ঝড়-পরবর্তী বিভিন্ন অসুখ ও অনাহারে মৃতু্যবরণ করে। আনুমানিক হিসাবে দুই লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এই ঘূর্ণিঝড়ে। আরও অধিক মানুষ মারা যায় দুর্যোগ-পরবর্তী মহামারি এবং দুর্ভিক্ষে।
১৯৬০ সালে অক্টোবরে ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার গতির প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, পটুয়াখালী ও পূর্ব মেঘনা মোহনায়। ঝড়ে মারা যান প্রায় ১০ হাজার ?মানুষ। পরের বছর ১৯৬১ সালের ৯ মে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে। প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষ মারা যান ওই ঝড়ে। ১৯৬২ সালে ২৬ অক্টোবর ফেনীতে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে হাজার খানেক মানুষ মারা যান। ১৯৬৩ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার এবং সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, হাতিয়া ও মহেশখালী। এই ঝড়ে প্রাণ হারান ১১ হাজার ৫২০ জন। ১৯৬৫ সালে মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ে বারিশাল ও বাকেরগঞ্জে প্রাণ হারান ১৯ হাজার ২৭৯ জন মানুষ। সে বছর ডিসেম্বরে আরেক ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারে মৃতু্য হয় ৮৭৩ জনের। পরের বছর অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে সন্দ্বীপ, বাকেরগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিলস্নায়। এতে মারা যান ৮৫০ জন। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামে এক অক্টোবর ২০ থেকে ২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের ঘূর্ণিঝড় হয়।
দেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী গ্রেট ভোলা সাইক্লোন। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর এই ঝড়ে প্রাণ হারায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। চার লাখের মতো বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২২৪ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রামে আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ১০ থেকে ৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। ১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড় উড়িরচরের ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত। এ সাইক্লোনটির বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৫৪ কিলোমিটার। ১৯৮৮ সালের নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর এবং বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার। এই ঘূর্ণিঝড়ে পাঁচ হাজার ৭০৮ জন মানুষ মারা যান। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলে আঘাত হানে লাখো প্রাণঘাতী এক ঘূর্ণিঝড়। এই ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস কেড়ে নেয় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষের জীবন। এছাড়া এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক কোটি মানুষ নিঃস্ব হয়। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে বাংলাদেশের সীতাকুন্ড ও এর আশপাশের এলাকায় আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে। ঘণ্টায় ২৩২ কিলোমিটার বেগের বাতাসের সঙ্গে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা পস্নাবিত হয়।
দেশের ইতিহাসে ভয়ালতম প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলা ঘটে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। এদিন সিডর নামের ঘূর্ণিঝড়টি দেশের উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলের ৩০টি জেলায় আঘাত হানে। বেসরকারি হিসাবে, প্রায় ২০ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। সরকারিভাবে তিন হাজার ১৯৯ জনের মৃতু্য ও এক হাজার ৭২৬ জনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানানো হয়। ২০০৯ সালের ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। এতে প্রাণ হারান ১৮ জন। বাঁধ ভেঙে পস্নাবিত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ। ২০১৩ সালের মে মাসের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাংশে সৃষ্টি হয় মহাসেনের। এতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০১৭ সালের ৩০ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে ৫৪ হাজার ৪৮৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মারা যান আটজন।
আবহাওয়াবিদরা জানান, ঘূর্ণিঝড় হলো ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাস সংবলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া, যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এই ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে। ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ইউডি/সিফাত

