দেশে প্রথমবারের মতো প্রয়োগ : জিন থেরাপি-স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত

দেশে প্রথমবারের মতো প্রয়োগ : জিন থেরাপি-স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৬ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১২:১৫

স্নায়ুতন্ত্রের জন্মগত একটি রোগ স্পাইনাল মাসকিউলার এট্রফি। বিশ্বে গত শতকেও এর কোনো চিকিৎসা ছিলো না। অসংখ্য শিশু এই রোগে মৃত্যুবরণ করেছে। জন্মগত এই রোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনও শিশুকে ‘জিন থেরাপি’ প্রয়োগ করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো। আর এই থেরাপি প্রয়োগ করেছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির

স্পাইনাল মাসকুলার এট্রফি একটি বিরল ও জটিল স্নায়ু রোগ যা জন্মগতভাবে মানবদেহে হয়ে থাকে। জিনগত ত্রুটির কারণে এটা হয় । এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের মাংসপেশী ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে। যার ফলে এসব শিশুরা বসতে বা দাঁড়াতে পারে না। তবে তাদের বুদ্ধিমত্তা ঠিক থাকে। পরবর্তীতে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার কারণে আক্রান্ত শিশুরা মৃত্যুবরণ করে। দেশে এই রোগের চিকিৎসায় ‘জিন থেরাপি’ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জিন থেরাপি কী: প্রত্যেকটি জীবদেহ কোটি কোটি কোষ দিয়ে তৈরি এবং প্রত্যেকটি কোষই নির্দিষ্ট জিনের বাহক। এই জিনগুলো বিভিন্ন প্রোটিন উৎপাদনের মাধ্যমে জীবদেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে থাকে। যখন কোনো জিন ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায় তখন তার থেকে উৎপাদিত প্রোটিনও ত্রুটিপূর্ণ হবে যার ফলে জীবের বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বাধাপ্রাপ্ত হবে কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হবে। জিন থেরাপি হলো ত্রুটিপূর্ণ জিনের চিকিৎসায় রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির প্রয়োগ। অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ জিনকে পরীক্ষাগারে তৈরিকৃত ত্রুটিমুক্ত জিন দ্বারা প্রতিস্থাপন করার নামই হলো জিন থেরাপি। এর ফলে জীবদেহ সঠিক প্রোটিন উৎপাদনে সক্ষম হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজারেরও বেশি রোগ শনাক্ত হয়েছে যার কারণ ত্রুটিপূর্ণ জিন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি বছর আমেরিকাতে প্রায় এক হাজারের বেশি শিশু ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে মারা যায়।

প্রথম থেরাপি নিলেন মানিকগঞ্জের রাইয়ান: দেশের ইতিহাসে প্রথম এই জিন থেরাপি পেয়েছেন মানিকগঞ্জের বাসিন্দা রাইয়ান। রাইয়ানের জš§ হয় তার বাবা-মায়ের বিয়ের ১০ বছর পর। মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রাইয়ানের ইনজেকশন থেরাপিতে সরাসরি যুক্ত ডা. চৌধুরী মোহাম্মদ ফুয়াদ গালিব এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সকাল ১০টায় রাইয়ানকে এ ইনজেকশন দেওয়া হয়। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাকে ক্যানোলার মাধ্যমে দুরারোগ্য স্নায়ুরোগ স্পাইনাল মাস্কুলার এট্রফির (এসএমএ) ওষুধ শরীরে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা এই জিন থেরাপির খরচ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের মূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা। এটি সরকারিভাবে তাকে প্রয়োগ করা হয়েছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল

এক ডোজের মূল্য ২২ কোটি টাকা: নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পরিচালক কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ইনজেকশনের দাম পড়ে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২২ কোটি টাকা। অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় বিনা চিকিৎসায় আমাদের দেশে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে অনেক শিশু। সম্প্রতি নোভার্টিস লিমিটেডের সহায়তায় একটি গ্লোবাল প্রজেক্টের অধীন মূল্যবান ওষুধটি ভুক্তভোগী ওই শিশুকে (রাইয়ার) দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আমাদের সহায়তা করেছে। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (এডি) ডা. বদরুল আলম বলেন, জিন থেরাপির এ চিকিৎসা সারা বিশ্বে নতুন আবিষ্কার। এটির প্রয়োগ যে খুব আগে থেকেই ছিল, তা নয়। এরপরও কিছু দেশ আমাদের তুলনায় এগিয়ে গেছে। কারণ, এ রোগের চিকিৎসায় যে ব্যয়, সাধারণত কোনো রোগীর পক্ষে এটি বহন করা সম্ভব নয়। একটি ইনজেকশনের দাম যদি ২২ কোটি টাকা হয়, তাহলে কী করে সম্ভব? এছাড়া, একটি ইনজেকশন পুশ করলেই যে রোগী শত ভাগ সুস্থ হয়ে যাবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। প্রত্যেকটি জিনিসের সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও আছে। ডা. বদরুল আলম বলেন, ইনজেকশনটি শুধু বাংলাদেশে নয়, পাশের দেশ ইন্ডিয়াতেও নেই। পাওয়া যায় আমেরিকা ও ব্রিটেনে। এটি যখন বাংলাদেশে আমদানি করা হয়, তখন সরকার কর্তৃক ট্যাক্স ধরা হয় এক কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহায়তার কারণে এটি আমরা আনতে পেরেছি।

ব্যয় কমানোর ওপর জোর: এদিকে, এই চিকিৎসার খরচ কমানোর উপায় বের করার উপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। স্বাস্থ্য সচিব বলেন, এমন অনেক শত শত রোগ আছে, যেগুলো বাবা-মায়েরা ধরতে পারেন না। এসব অভিভাবকদের কষ্ট অনেক বেশি। সে জায়গায় এমন চিকিৎসা আশার আলো নিয়ে এসেছে। কিন্তু যে ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেটি যদি মানুষের নাগালে আনা না যায় তাহলে সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। যে শিশুকে দেওয়া হয়েছে সে ভাগ্যবান। চিকিৎসা যেহেতু শুরু হয়েছে, আশাকরি ব্যয় কমবে, মানুষ নিতে পারবে। এদিন ২২ মাস বয়সী রায়হান নামের এক শিশুকে প্রায় ২২ কোটি টাকা মূল্যের এই থেরাপি নোভার্টিসের উদ্যোগে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ বহন সম্ভব নয়। তাই খরচ কমানোর উপায় বের করতে পারলে যুগান্তকারী এই চিকিৎসার সুফল মিলবে বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য সচিব।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, জিন থেরাপির কাজ অনেক ব্যয়বহুল। তবে আন্তরিকতা থাকলে সবকিছু সম্ভব হয়। কোভিডে আমরা এটা করে দেখিয়েছি। মূলত লিডারশিপের কারণে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় এখন সেরা। রোগীদের চাপে অনেক সময় অনেক কিছুই করা সম্ভব না হলেও এখানে বিশ্ব মানের সেবা মিলছে। আবার অনেক রোগী বঞ্চিতও হচ্ছে। তিনি বলেন, ৮টি বিভাগে নতুন হতে যাওয়া মেডিকেল কলেজগুলোতে নিউরোসায়েন্সেস বিভাগ চালু হলে এ রোগীদের ঢাকায় আসতে হবে না। একই সঙ্গে সব ‘টার্শিয়ারি’ পর্যায়ের হাসপাতালে স্নায়ু রোগের চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ওষুধের দাম অনেক বেশি। মানুষ যাতে এই সেবা নিতে পারে সেই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়: নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, এই চিকিৎসা নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ১০ বছরের ইতিহাসে যুগান্তকারী অধ্যায়। একটা বাচ্চাকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে আমরা বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছি। সে এখন নিশ্চিতভাবে আকাশ দেখতে পারবে, নিশ্বাস নিতে পারবে। অধ্যাপক ডা. নারায়ণ তার টিম নিয়ে সেটি করেছেন। এজন্য আমরা আনন্দিত এবং গর্বিত। তিনি আরও বলেন, নিউরো রোগীদের অধিকাংশকেই ভালো করতে পারি না। এক্ষেত্রে কিছু বিরল রোগ আছে, যেগুলোর মৃত্যু অবধারিত। সেগুলো নিয়ে আমাদের কিছুই করার থাকে না। বর্তমানে আমাদের রোগীদের ৪০ থেকে ৪২ ভাগ রোগীই শিশু। এই শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আলাদা একটা এটেনশন (মনযোগ) দরকার। এজন্য আমি মাননীয় স্বাস্থ্য সচিব মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ, আমাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় অসংখ্য রোগীকেই বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসার দারস্থ হতে হয়। দীন মোহাম্মদ বলেন, আমাদের দেশে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আমাদের হাসপাতালে আইসিইউ সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ বেডে রাত পার হলেই ৫০ হাজার টাকা। এর বাইরে তো বিভিন্ন পরীক্ষা-ফি তো আছেই। কয়টা পরিবারের এতো খরচ বহনের সুযোগ আছে? এক্ষেত্রে সরকারি সেক্টরকে আরও উন্নত করতে হবে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সুন্দরভাবে সাজান, যেকোন ধরণের পরামর্শ, সহযোগিতা আমরা করব।

রাষ্ট্রের নজর আমূল পরিবর্তন ঘটাবে: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই রোগের চিকিৎসা করানো খুব কঠিন। যারা সক্ষম তারা দেশের বাইরেই মূলত প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তবে সামগ্রিকভাবে এ রোগের চিকিৎসায় রাষ্ট্র যদি দায়িত্ব নেয়, তবে এই চিকিৎসায় সেবার ক্ষেত্রে দেশে আমূল পরিবর্তন ঘটবে। দেশে দ্বিতীয়বার এ জিন থেরাপি প্রয়োগ কখন সম্ভব জানতে চাইলে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (এডি) ডা. বদরুল আলম বলেন, এ বছর আমরা ওষুধটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েছি। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লটারির মাধ্যমে বাংলাদেশকে এটি দিয়েছে। যে কারণে দ্বিতীয়টি আমরা কবে পাব বা ব্যবস্থা করতে পারব, সেটি বলা যাচ্ছে না। তবে, আমাদের চেষ্টা থাকবে আগামী বছর যেন আরও দুই থেকে তিনটি পেতে পারি। দাম যদি এমনই থাকে তাহলে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না। কারণ, এত দামি ওষুধ আমরা পয়সা দিয়ে কিনে রোগীর দেহে পুশ করব, আপাতত এমন চিন্তা আমাদের নেই।

উত্তরদক্ষিণ, ২৬ অক্টোবর ২০২২, প্রথম পৃষ্ঠা

নোভার্টিস কোম্পানির বাংলাদেশের প্রধান ডা. রিয়াদ মামুন জানান, ২০১৯ সাল থেকে এই জিন থেরাপি দিয়ে আসছে নোভার্টিস। এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩০০ জনকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২০ সাল থেকে লটারির মাধ্যমে প্রতিমাসে দুজন করে এখন পর্যন্ত ২৫০ জনকে বিনামূল্যে এই থেরাপি দেওয়া হয়েছে। যত কম বয়সে ডায়াগনসিস করতে পারা যাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা পাওয়া তত সহজ হবে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading