তরুণদের জন্য বই পড়ার চর্চা জরুরি
হাসান মাহামুদ । মঙ্গলবার, ০৮ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৯:৫০
তরুণ সমাজ বই পড়ার চর্চা থেকে অনেকটা দূরে। সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান বিষয়ক বই পড়ার অভ্যাস তরুণ সমাজের মধ্যে এখন খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় না। আধুনিক প্রযুক্তির আবির্ভাব জীবনকে করেছে সহজ থেকে সহজতর, উন্নত থেকে উন্নতর কিন্তু এসব কিছু উদ্ভাবনের অন্তরালে তরুণরা বাস্তবিক জগৎ থেকে সরে ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাকড়সার জালের মতো স্মার্টফোন জাল ছড়িয়ে লাখ লাখ তরুণ সমাজকে আবদ্ধ করে ফেলেছে। মন চাইলেই এর থেকে মুক্তি মেলে না।
বাচ্চারা সন্ধ্যায় দৌড়াদৌড়ি করে ঘরে ফিরত এবং হাত-মুখ ধুয়ে দ্রম্নত পড়ার টেবিলে বসত। পড়া শেষে খাওয়া-দাওয়া করে বিছানায় শুয়ে পড়ত ঘুমের উদ্দেশ্যে। বাবা-মা অথবা বয়স্করা তাদের বিভিন্ন কিৎসা-কাহিনী অথবা রূপকথার গল্প শোনাতো এবং গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত। বর্তমান সময়ে ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। সন্ধ্যায় বা রাতে তাদের হাতে বই থাকার বদৌলতে থাকে স্মার্টফোন। এমনকি খাবারের সময়ও তাদের হাতে স্মার্টফোন ধরিয়ে খাবার খাওয়াতে হয়। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা কোনো অংশে কম দায়ী নয়। তারাও স্মার্টফোনে সমান তালে ব্যস্ত। বই পড়ার চর্চা তাদের মধ্যেও আশানুরূপভাবে দেখা যায় না। তরুণ সমাজের উন্নতির অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে মাদকাসক্তি। অবাধে তারা মাদক সেবন করছে।
তাদের গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় রিসার্চ গেট জার্নালে। ওই প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, তারা ৯৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, অবসরে তারা ফেসবুকে চ্যাট করেন। আর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের ভাষ্য, অবসরে তারা উপন্যাস পড়েন। ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ বই পড়ার চেয়ে ফেসবুকে সময় কাটাতে কিংবা ইউটিউবে মুভি দেখতে বেশি পছন্দ করেন। তবে মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন, তারা ফেসবুকে থাকার চেয়ে বই পড়তে পছন্দ করেন। ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ দিনে একটিও বই পড়েন না। আর ৩২ দশমিক ৩ শতাংশের কথা, দিনে ১ ঘণ্টা বই পড়েন। এই সব গবেষণা ও জরিপ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, সারা পৃথিবীতেই বই পড়ার হার কমছে।
মোবাইল রিপাবলিক নামের একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ২০১৩ সালের জুনে ভারতের বিভিন্ন এলাকার ৮০০ মানুষের ওপর জরিপ চালিয়েছিল তারা। জরিপের ফল বলছে, ভারতে মানুষের মধ্যে বই পড়ার হার ক্রমাগত কমছে। এমনকি সংবাদপত্র পড়ার হারও কমছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে দৈনিক পড়া বলতে তারা ওই টুকটাক সংবাদপত্রই পড়েন। সেটাও পড়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ওই জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই খবর পড়েন, যেহেতু বেশির ভাগ সময় এই মাধ্যমে থাকেন তারা। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন খুলনার নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির ইংরেজির প্রভাষক মো. ওবায়দুলস্নাহ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির সহযোগী অধ্যাপক মোলস্না আজিজুর রহমান।
এখন প্রশ্ন হলো কেন বই পড়ব? জ্ঞান বৃদ্ধি, নতুন জ্ঞান সংগ্রহ, শারীরিক উন্নতি, মানসিক উন্নতি, কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি, স্মৃতি শক্তি বাড়ায়, স্ট্রেস কমায়, হতাশা কমায়, আয়ু বাড়ায়, কমিউনিকেশনে স্কিল বাড়ায়, স্মার্টনেস বাড়ায়। ২০১৩ সালে বেশ কিছু জনের ওপর গবেষণা করা হয়েছিল। যারা এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিল তারা টানা ৬ দিন ধরে বেশ রহস্যে ভরপুর গল্প বই পড়ে যাচ্ছিল। তাদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে- যতই গল্প রহস্যের দিকে এগোচ্ছে ততই তাদের ব্রেনের কোষগুলো উদ্দীপনাতে ভরপুর হয়ে উঠছে। বই পড়লে মানসিক, শারীরিক উন্নতি হয়, হতাশা দূরে সরে যায়, স্ট্রেস কমে যায়। হতাশা আর স্ট্রেস যদি জীবন থেকে সরে যায়, আয়ু তো বাড়বেই। মন যখন স্মার্ট, সাহসী, বড় বড় স্বপ্ন দেখে, বই পড়ে পড়ে শুধু পজিটিভ কথাবার্তা মস্তিষ্কে পৌঁছায়, তখন তো সেই মনের মধ্যে পজিটিভ শক্তির সৃষ্টি হবেই। বই পড়ার অভ্যেস থাকলে বার্ধক্যে একমাত্র সাথী কিন্তু বই হবে। বইমেলা থেকে বই কিনে শুধু শেল্ফে সাজিয়ে রাখলেই চলবে না, প্রয়োজন যথাযথ ব্যবহার।
লেখক: শিক্ষার্থী।
ইউডি/কেএস

