বিবিসির বিশ্লেষণ: ইমরান খানের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটা

বিবিসির বিশ্লেষণ: ইমরান খানের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটা

উত্তরদক্ষিণবিবিসি, সোমবার, ১৪ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ২১:৪৫

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গত ৩ নভেম্বর লংমার্চ কর্মসূচি চলাকালে পাঞ্জাব প্রদেশের ওয়াজিরাবাদে গুলিতে আহত হয়েছিলেন। সেখান থেকে তার রাজনৈতিক দল পিটিআই আবারও তাদের বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেছে।

ওই হামলার জন্য ইমরান খান পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ খান এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফয়সাল নাসিরকে দায়ী করেছেন। তবে ওই তিনজনই ইমরান খানের আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর ইমরান খান পাকিস্তানে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারকে আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। কিন্তু লাহোর থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচির মধ্যেই তিনি হামলার শিকার হলেন।

এখন পাকিস্তানের রাজনীতি এই জটিল ‘গোলক ধাঁধায়’। প্রশ্ন উঠেছে- ইমরান খানের ভবিষ্যৎ কী। তিনি আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন নাকি সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজবেন, সেটাও এক বড় জিজ্ঞাসা।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আগেও বেশ কয়েকবার দেখা গেছে। সেই বিবেচনায় ইমরানকে সৌভাগ্যবান বলা যায়। কারণ, তিনি আততায়ী হামলার শিকার হলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন। ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। তারপর রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ (পিটিআই) গঠন করে দীর্ঘদিন রাজনীতি করার পরই তিনি ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসেন।

সেনাবাহিনীর সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল বলে বিরোধীরা দাবি করে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি শীর্ষ সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। হয়তো সে কারণেই প্রধানমন্ত্রীর পদ ধরে রাখতে পারেননি।

ক্ষমতায় আসার পর আমি সামরিক বাহিনীর নানা রকম বাধার মুখে ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলাম না। বিশেষত, দুর্নীতিবিরোধী সরকারি সংস্থাটি সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে কাজ করত।

ইমরান খান

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি মোটেও গোপন কিছু নয়। ইমরান খান সম্প্রতি হামলার শিকার হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা ডন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর আমি সামরিক বাহিনীর নানা রকম বাধার মুখে ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলাম না। বিশেষত, দুর্নীতিবিরোধী সরকারি সংস্থাটি সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে কাজ করত।’

দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমরান ক্ষমতায় এলেও সে কাজে ব্যর্থ হন। পাশাপাশি দেশের চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং করোনা মহামারি মোকাবিলায়ও তার সরকার যে খুব সফল ছিল, তা বলার সুযোগ নেই।

আইএসআইয়ের নতুন প্রধান কে হবেন, সেটা নির্ধারণের ব্যাপারে ইমরানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সেটা গুরুতর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এরপর থেকে সেনাবাহিনী ইমরান খানের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে এবং তার ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল করে দিতে শুরু করে। অন্যদিকে ইমরানও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

পাকিস্তানের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দল পিপলস পার্টি (পিপিপি) কিংবা পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল) মতো পুরোনো দলগুলোর বিকল্প হিসেবে তৃতীয় শক্তি হয়ে ক্ষমতায় এসেও নির্বাচনী অনেক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করতে পারেননি ইমরান। সেনাবাহিনী হয়তো ভেবেছিল, ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলে তার রাজনৈতিক সম্ভাবনা ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত ঘটনাটিই দেখা যাচ্ছে।

ইমরান খানের জনপ্রিয়তা যে মোটেও কমেনি, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক সময়ের উপনির্বাচনে তিনি আটটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাতটিতে জিতেছেন। দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখনো ইমরান খানের ওপর ভরসা রাখতে চায়।

তবে আরেকটি বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীর প্রভাব উপেক্ষা করা কঠিন। সেই হিসেবে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যেতে চাইলে সামরিক বাহিনীকে হাতে না রেখে ইমরানের উপায় নেই।

এসব প্রচারের ফসল তিনি ঘরে তুলবেন। দ্বিতীয় পথটি হলো, তিনি আন্দোলন বাদ দিয়ে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবেন। আর তৃতীয় পথটি হলো, অবিলম্বে আগাম নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন

আসকারী রিজভী

পাকিস্তানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারী রিজভীর মনে করেন, ‘ইমরান খানের সামনে এখন তিনটি পথ আছে। প্রথমত, তিনি আবার মিছিল নিয়ে ইসলামাবাদ অভিমুখে যেতে থাকবেন। সপ্তাহ দুয়েক ধরে তার অনুগামী জনস্রোত পাকিস্তানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

‘এসব প্রচারের ফসল তিনি ঘরে তুলবেন। দ্বিতীয় পথটি হলো, তিনি আন্দোলন বাদ দিয়ে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবেন। আর তৃতীয় পথটি হলো, অবিলম্বে আগাম নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন’, বলেন আসকারী রিজভী।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও ইমরান খানকে একটা বোঝাপড়ায় আসতে হবে। সেনাবাহিনী ইমরান খানকে কিছু দেওয়ার বিনিময়ে কিছু তার কাছ থেকে আদায় করে নিতে চাইবে। ইমরান খানের কারণে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। সেনাবাহিনী চাইবে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয়।

পাকিস্তানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট, পাঞ্জাবে ভয়াবহ বন্যার প্রভাব, বেলুচিস্তানে অস্থিরতার পাশাপাশি সর্বশেষ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাময় ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের উদ্বেগকে যে আরও বাড়িয়ে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ইউডি/এআই

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading