পরিবহন খাতে লাগামহীন চাঁদাবাজি নৈরাজ্যের অবসান জরুরি
রফিকুল জামান । শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ০৮:০০
সড়ক পরিবহন খাতে দিনে ১১ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ। সংগঠনটি বলছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে দিনে ১১ লাখ গাড়ি থেকে এই ১১ কোটি চাঁদা আদায় করা হয়। সেই হিসাবে বছরে সড়কে প্রায় ৪ হাজার ১৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন নামে শ্রমিকদের ফেডারেশন হলেও তা মূলত মালিকদের সমিতি। ওই ফেডারেশন ১০টি দাবি করলে ৮টি দাবিই থাকে মালিকদের। ফেডারেশনের নেতারা মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির নির্দেশিকা তৈরি করে। পরিবহন সেক্টরে কর্মরত শ্রমিকরা একটি মাফিয়া চাঁদাবাজ চক্রের হাতে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও বঞ্চিত। শ্রমিকদের শোষণ করে চাঁদাবাজরা শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। রাজধানীর চারটি বড় টার্মিনালসহ দেশের প্রতিটি টার্মিনালের শ্রমিকরা এই মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি।
উদ্বেগের বিষয় হলো, পরিবহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবৈধ চাঁদাবাজির সঙ্গে কেবল বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত নয়; অথবা বিষয়টি কোনো একটি জেলা বা অঞ্চলের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়-চাঁদাবাজির শেকড় দেশজুড়ে বিস্তৃত। পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজির কারণে রাস্তায় চলাচলকারী অগণিত যাত্রী প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হচ্ছে নানারকম প্রতিবন্ধকতা। চাঁদাবাজির কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন বাস কোম্পানি, ব্যক্তি, সংগঠন ও সমিতির নামে টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্টপেজ থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা উঠানো হচ্ছে। জানা গেছে, রাজধানীতে চলাচলকারী গণপরিবহণগুলোর মধ্যে কেবল বাস থেকেই প্রতিদিন অন্তত ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। রাজধানীর বাইরে প্রতিটি বিভাগেই ব্যাপক চাঁদাবাজির খবর রয়েছে। বস্তুত রাজধানীসহ সারা দেশের জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবহণে চাঁদাবাজি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সড়কের চাঁদাবাজিকে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ উল্লেখ করে তা বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কয়েক মাস আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এ ঘটনা থেকে আঁচ করা যায় দেশে চাঁদাবাজি কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
অপ্রিয় হলেও সত্য-চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও টেন্ডারবাজির জন্য দায়ী মূলত রাজনীতির বর্তমান ধারা। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির কারণে কোনো দল ক্ষমতাসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমর্থিত বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের দৌরাত্ম্য মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। বলা বাহুল্য, এ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয় অস্ত্র ও পেশিশক্তি দ্বারা। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে শাসনব্যবস্থা ও আইনের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা মোটেই কাম্য নয়। পরিবহণ খাতসহ সব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি নির্মূলে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
দেশের সব স্বল্পপাল্লা ও দূরপাল্লার পথে চলাচল করতে ট্রাক থেকে প্রতিদিনই চাঁদা আদায় করে আসছে পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনগুলো। দেশে বাণিজ্যিক গাড়ির সংখ্যা আট লাখের বেশি। এসব গাড়ি প্রতি ৪০ টাকা মালিক সংগঠন ও ৩০ টাকা শ্রমিক সংগঠনগুলো আদায় করে। এ হিসাবে বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা এসব গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। আর এর দায়ভার পুরোটাই বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। কেননা পরিবহন খাতের এই চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপণ্যের পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম, যা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চাঁদার পরিমাণ ঠিক করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব দিয়েছিল শ্রমিক নেতারা। এরপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে তারা বিষয়টি উত্থাপন করেছিল। তবে চাঁদা নির্দিষ্ট করে প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি তখন আমলে নেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মালিক ও শ্রমিক নেতারা পরিচালন ব্যয়ের নামে চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করে এই খাতের চাঁদাবাজিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্যের অবসান জরুরি। কেননা এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জড়িত। আমাদের প্রত্যাশা সরকার, বিশেষ করে সংশ্লিষ্টরা জরুরি ভিত্তিতে এই খাতের চাঁদাবাজি বন্ধে পদক্ষেপ নেবে।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/কেএস

