বিদায় ফুটবলের ‘ও রেই’
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৩০
চলে গেলেন ফুটবল কিংবদন্তি পেলে। জীবন-মৃত্যুর জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে ৮২ বছর বয়সে (২৩ অক্টোবর ১৯৪০-২৯ ডিসেম্বর ২০২২) ক্যানসারের কাছে হেরে গেলেন তিনি। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের একজন পেলে। নৈপুণ্যে ভরা শিল্পিত ফুটবল খেলা আর তিনবার বিশ্বকাপ জয় করার জন্য পেলে হয়েছেন ফুটবলের রাজা, ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় (পর্তুগিজ) ভাষায় তাকে বলা হয় ‘ও রেই’ (Ao Rei)। কিংবদন্তি পেলে-কে নিয়ে সাদিত কবিরের প্রতিবেদন
সাফল্যের সুতোয় বোনা এক অমরত্ব : বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ী পেলের পুরো নাম এদসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। তবে বিশ্বের বুকে লাখো কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে তিনি পেলে নামেই পরিচিত। মাত্র ২৯ বছরে তিনটা বিশ্বকাপের মালিক হয়েছিয়েন পেলে। বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এ রেকর্ড ভাঙতে পারেনি বিশ্বের কোনো ফুটবলার। নিকট অতীতেও তা সম্ভব কিনা সেটা নিয়েও আছে সন্দেহ! তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ফুটবল বিশ্বের রেকর্ড এক হাজার ২৮১টি গোল, যা আজও ভাঙতে পারেনি কেউ। ব্রাজিলের জার্সিতে মোট ১৪ বছর খেলেছেন পেলে। তাতে অসংখ্য অ্যাসিস্টের পাশাপাশি ৭৭টি গোল করে নিজের ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছিলেন।
অতিমানবীয় কারিশমায় থেমে যায় যুদ্ধও!: পেলের সান্তোস এফসি ফুটবল ক্লাব ছিল ষাটের দশকে বিশ্বের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর একটি। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত নাইজেরিয়ায়, ১৯৬৯ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি। বেনিন সিটিতে অনুষ্ঠিত ওই খেলায় সান্তোস ২-১ গোলে স্থানীয় একাদশকে পরাজিত করে। নাইজেরিয়াতে তখন রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছিল। দেশ থেকে বায়াফ্রা রাজ্যটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। ফুটবল ক্লাব সান্তোস এফসির ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন এমন একজন গবেষক গুইলহের্ম গুয়াশের মতে, এরকম একটি পরিস্থিতিতে নাইজেরিয়াতে খেলোয়াড়দের পাঠানোর ব্যাপারে ব্রাজিলের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেক দুশ্চিন্তা ছিল। সেকারণে বিবাদমান পক্ষগুলো তখন যুদ্ধবিরতিতে যেতে সম্মত হয়।

সান্তোস দিয়ে শুরু সেখানেই শেষ: দীর্ঘ সময় যে মাঠ তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, যে মাঠে গোলের পর গোল করেছেন, সেখান থেকে তার খ্যাতির শুরু সেই সান্তোসের মাঠে যেতে চান। চাওয়া মতো, সান্তোস ফুটবল ক্লাব প্রাঙ্গনে নেওয়া হবে পেলেকে। হাসপাতালেই তার দেহ শেষকৃত্যের জন্য প্রস্তুত করা হবে। এরপর আনা হবে সাও পাওলোর ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামে। যা সান্তোসের হোম গ্রাউন্ড নামে পরিচিত। সেখানে আগামী ২ জানুয়ারি থেকে ৩ জানুয়ারি সকাল ১০টা পর্যন্ত রাখা হবে পেলের মরদেহ। সান্তোস কর্তৃপক্ষ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পেলেকে ২৪ ঘণ্টা সান্তোস প্রাঙ্গনে রাখা হবে। সমাহিত করার আগে ৩ জানুয়ারি সান্তোসের রাস্তায় পেলেকে নিয়ে প্যারেড হবে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হবে বাড়িতে। তার মা ডোনা সেলেস্তের কাছে। শতবর্ষী পেলের মা এখনও বেঁচে আছেন। তবে শয্যাশয়ী। ছেলেকে শেষবার দেখবেন তিনি।
জাতীয় সম্পদ পেলে ‘রপ্তানি যোগ্য নয়’: পেলের ক্যারিয়ারের সোনালী সময়ে তাকে বাইরে খেলতে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। পেলেকে নেয়ার জন্য সান্তোস এফসিকে প্রস্তাব দিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ থেকে শুরু করে এসি মিলানের মতো ক্লাবও। পেলেকে ব্রাজিলে রেখে দেওয়ার জন্য চাপ ছিল সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও। ১৯৬১ সালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জানিও কোয়াদ্রস পেলেকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাকে রপ্তানি করা যাবে না বলে একটি ডিক্রি জারি করেছিলেন। ব্রাজিলের এই ফুটবলার পরে অবশ্য একটি বিদেশি ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন শুধুমাত্র ১৯৭৫ সালে। সেসময় তিনি যোগ দিয়েছিলেন আমেরিকার একটি ফুটবল ক্লাব নিউ ইয়র্ক কসমসে।

মাঠ থেকে বহিষ্কারের দীর্ঘশ্বাসও আছে: ১৯৬৮ সালের ১৮ই জুন। কলাম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় খেলা হচ্ছিল সান্তোস এফসির সাথে কলাম্বিয়ান অলিম্পিক স্কোয়াডের। ওটা প্রীতি ম্যাচ ছিল। হঠাৎ করেই গ্যালারি থেকে দর্শকদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে যখন রেফারি গুইলেরমো ভেলাসকোয়েজ পেলেকে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখনও লাল কার্ডের প্রচলন ঘটেনি, সেটা শুরু হয় ১৯৭০ সালে। এই সিদ্ধান্তে মাঠের ভেতরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সান্তোসের ফুটবলাররা উত্তেজিত হয়ে রেফারিকে ঘিরে ধরেন। ওই খেলার যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় রেফারি ভেলাসকোয়েজের চোখ কালো হয়ে আছে।
ইউডি/এজেএস

