পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসি’র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: বুশ ব্লেয়ার নেতানিয়াহু হ্লাইংদের বিচার কি হবে?
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৯ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১১:০৫
যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এরই আওতায় ইউক্রেনে হামলা চালানোয় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন এই আদালত। কিন্তু পুতিন ছাড়াও একই ধরণের অপরাধে অভিযুক্ত ছিলেন বেশ ক’জন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। তাদের ক্ষেত্রে আইসিসি’র কোনো ধরনের জোড়ালো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের বিশ্লেষণ
আইসিসি’র আদেশ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে: গত বছরের ফেব্রæয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসন পরিচালনার পর থেকে ইউক্রেনীয় শিশুদের অপহরণ ও বেআইনিভাবে তাদের দেশান্তর করার জন্য পুতিনের ওপর যুদ্ধাপরাধের দায় বর্তায় বলে মনে করেন আইসিসি। একই অভিযোগে রাশিয়ার শিশুবিষয়ক কমিশনার মারিয়া আলেক্সিয়েভনা এলভোভা-বেলোভার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। রাশিয়া বলেছে, তারা যেহেতু নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আইসিসির এখতিয়ার স্বীকার করে না, তাই এ আদেশের কোনো গুরুত্বই নেই। এ পরোয়ানার কারণে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে আশু কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। পদস্থ রুশ জেনারেলরা ভবিষ্যতে আইসিসির সম্ভাব্য বিচারের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসবেন বা যুদ্ধের নৃশংসতা কমবেন এমন সম্ভাবনা আদৌ আছে কি না, তা নির্ভর করবে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। পুতিনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সে রকম কোনো অবস্থান এখনো দেখা যাচ্ছে না। আইসিসি বলছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলগুলো থেকে শিশুদের বেআইনিভাবে রাশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া ও বাস্তুচ্যুত করার সঙ্গে পুতিন জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ জন্য তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আদৌ তার বিচার হবে কী না তা নিয়ে সংশয় রয়ে যায়। পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কোনো ‘তাৎপর্য নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। ওই পরোয়ানা জারির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ মন্তব্য করেন তিনি। মারিয়া বলেন, আইসিসির রোম সংবিধির অংশ নয় রাশিয়া। আর এর অধীনে চলার কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে আরও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দমিত্রি মেদভদেভ। টুইটারে তিনি এই পরোয়ানাকে ‘টয়লেট পেপার’ বলেছেন। তবে রাশিয়ার বিরোধীরা পরোয়ানা জারির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রচারকারীরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ জানিয়েছেন। এদিকে, পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসি’র পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়াকে ‘যৌক্তিক’ বলেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেছেন, এর অত্যন্ত শক্তিশালী তাৎপর্য রয়েছে। এ সময় বাইডেন মনে করিয়ে দেন, তাঁর দেশ আইসিসির সদস্য নয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মতে, এই পরোয়ানা জারির ঘটনা ‘ঐতিহাসিক’। এর মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্বের সূচনা ঘটবে।
ইরাকে হামলা করে বুশ কি যুদ্ধাপরাধী নন?: ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় আমেরিকা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আমেরিকায় সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাকে ঘিরেই মূলত মার্কিন বাহিনী ইরাকে হামলা চালায়। ওই হামলার নেপথ্যে ছিলো ইরাক গণবিধ্বংসী অস্ত্র বানাচ্ছে, জঙ্গিসংগঠন আল-কায়েদাকে সাহায্য করছে। আমেরিকার ব্রাউন ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুসারে, ২ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬ হাজার মানুষ ওই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ব্রিটেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা রবার্ট ইনলাকেশের মতে, মার্কিন হামলায় ১০ লাখেরও বেশি ইরাকি নিহত হয়েছেন। সংখ্যাটা যতই হোক, তা দিয়ে আসলে হামলার বৈধতা পাওয়া যায় না। কারণ, যে অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়েছিল, সেই ইরাক সরকারের সঙ্গে আল-কায়েদার সংশ্লিষ্টতা সেই সময় পাওয়া যায়নি। ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন তদন্ত প্রতিবেদনেই বলা হয়েছিল, ওই হামলা চালানোর ক্ষেত্রে আল-কায়েদার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের কোনো ‘সহযোগিতামূলক কার্যকর কোনো সম্পর্ক’ ছিল না। যুদ্ধে ইরাকে সাধারণ মানুষ হত্যা থেকে শুরু করে কারাগারে বন্দী নির্যাতনের অহরহ ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বন্দী নির্যাতনের ঘটনা ছিল বহুল চর্চিত বিষয়। সময়ের ব্যবধানে সেসব ঘটনা চোখের সামনে থেকে সরে গেছে। কিন্তু ইরাকে হামলার জন্য আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডবিøউ বুশের বিরুদ্ধে কি আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? ইরাকে হামলার পর থেকেই জর্জ ডবিøউ বুশকে যুদ্ধাপরাধী বলে সম্বোধন করা হয়। এটা যে পশ্চিমা বিরোধীরা বলেন এমনটা নয়। খোদ আমেরিকানরাও তাকে এটা সম্বোধন করে থাকেন। গত বছর ইরাকযুদ্ধ নিয়ে এক ভুল মন্তব্য করার জেরে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনেটর নিনা টার্নার বলেছিলেন, জর্জ ডবিøউ বুশ একজন যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তাকে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক আদালত কোনো ধরণের পদক্ষেপ নেয়নি।
ব্লেয়ার’র দলের স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও নিশ্চুপ ছিলো আইসিসি: ‘মিথ্যা’ তথ্য দিয়ে ইরাকে হামলায় যোগ দিয়েছিল ব্রিটেনও। ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা নিয়ে করা ‘চিলকট রিপোর্ট’ নামের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরাকে হামলা কোনো যৌক্তিক বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল না। দেশটিকে নিরস্ত্র করার শান্তিপূর্ণ উপায়গুলো পাশ কাটিয়ে ওই হামলা চালানো হয়। ওই সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন টনি ব্লেয়ার। তার উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন জন প্রেসকট। তিনি এই যুদ্ধের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। এমনকি ব্লেয়ার’র দল লেবার পার্টিও ক্ষমা চেয়েছিল। কিন্তু ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত কোনো ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। হয়নি কোনো তদন্ত কিংবা বিচারের আওতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া।
ইয়েমেনবাসীর কষ্ট দেখার কেউ নেই: সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বাধীন বাহিনী নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলা মানবিক বিপর্যয়কে চ‚ড়ান্ত মাত্রায় নিয়ে গেছে। তিন কোটি জনবসতির ইয়েমেনে নিহত হয়েছে তিন লাখেরও বেশি মানুষ। জাতিসংঘের হিসাবে, এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মারা গেছে যুদ্ধের কারণে ঘটা খাদ্যাভাব ও রোগের কারণে। আরেক প্রতিবেদন অনুসারে, ইয়েমেন যুদ্ধ ও যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কারণে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের ৩ কোটি মানুষের মধ্যে ৪৫ শতাংশই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সেখানকার দুর্ভিক্ষপীড়িত শিশুদের দিকে তাকানো বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তেমেন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে নি।
মিয়ানমার সামরিক জান্তাকে রুখবে কে?: মিয়ানমার সামরিক বাহিনী নিয়মতান্ত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘন, যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত। দেশটিতে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০২২ সালে প্রকাশিত সর্বাত্মক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছিলো জাতিসংঘ। মানবাধিকার প্রতিবেদন সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইনের ভয়াবহ লঙ্ঘনে মিয়ানমারের জনগণ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তা দৃঢ়, ঐক্যবদ্ধ ও শক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার দাবিদার। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে, মিয়ানমার জান্তার হাতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। হামলা-সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আরও কয়েক হাজার হতে পারে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধ মামলা করে গাম্বিয়া। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগে গাম্বিয়ার করা মামলায় মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। ফলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলতে আপাতত বাধা থাকলো না। মিয়ানমারের জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং-কে আন্তর্জাতিক আদালত কোনো প্রশ্নের সম্মুখীণ করে নি।

প্যালেস্টাইন প্রশ্নে আইসিসি’র দৌড় কতটুকু?: গত বৃহস্পতিবারও দখলীকৃত জেনিনের পশ্চিমতীরে এক টিনেজারসহ কমপক্ষে চার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। এ নিয়ে এ বছর তাদের হাতে প্রাণ দিলেন কমপক্ষে ৮৩ ফিলিস্তিনি। ২০২২ সালের ফেব্রæয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) জানিয়েছে, সংস্থাটির বিচারিক ক্ষমতার আওতায় গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে। সংস্থাটির প্রসিকিউটর জানান, ফিলিস্তিন সরকার ‘রোম সংবিধি’ মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ যেহেতু ফিলিস্তিন আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র, সেহেতু গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম আইসিসির বিচারিক ক্ষমতার আওতায় রয়েছে।অন্যদিকে, ইসরায়েল ও তার রক্ষাকর্তা আমেরিকা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। তাই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কোনো কর্মকর্তা বা যে কোনো স্তরের রাজনৈতিক নেতা অথবা প্রশাসনিক কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও তার তদন্তে নামলে ইসরায়েল ও তার রক্ষাকর্তা আমেরিকা তা মানবে না অথবা এ তদন্ত কাজে কোনো ধরনের সাড়াও দেবে না। তাই ইসরায়েলি অপরাধের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করাটাও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পক্ষে মোটেও সহজ নয়। ফিলিস্তিন ২০১৪ সালে আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়। আবেদনের সাত বছর পর সাড়া দেয় আইসিসি। অন্যদিকে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়া যে সামরিক আগ্রাসন, সেই অপরাধ তদন্তের আবেদন জানানোর ছয় দিনের মধ্যে আইসিসি ইতিবাচক সাড়া দেয়। এখান থেকেই বুঝা যায় আইসিসি ফিলিস্তিনের আবেদনের ব্যাপারে কতটা নাজুক আইসিসি।
ইউডি/এজেএস

