বিদায় ‘খলিফা’..
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১৩:২৬
নূরে আলম সিদ্দিকী। একটি চলমান ইতিহাসের নাম। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে আন্দোলনের এক স্ফুলিঙ্গ। অনলবর্ষি বক্তা। মুক্তিযুদ্ধের চার খলিফার এক খলিফা হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতা সংগ্রামসহ দেশের ইতিহাসখ্যাত সব আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করেছেন তিনি। তরুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা। সাফল্যের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তার নাম। না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন সেই ক্ষনজন্মা পুরুষ। বলা যায় একটি নক্ষত্রের পতন ঘটলো। বিস্তারিত সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
নিভে গেল বাঙালির এক বাতিঘর: স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরে আলম সিদ্দিকী আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বুধবার (২৯ মার্চ) ভোরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। নূরে আলম সিদ্দিকীর প্রেস সচিব অনিকেত রাজেশ জানান, বুধবার ভোর ৪টা ৩৭ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নূরে আলম সিদ্দিকী মারা যান। সত্তরের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী ১৯৭০-১৯৭২ মেয়াদে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চার খলিফার একজন হিসেবে তাকে উল্লেখ করা হয়। মুজিববাহিনীর অন্যতম কর্ণধার ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পরে তিনি ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। তবে ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঝিনাইদহ-২ আসনে পরাজিত হয়েছিলেন। তারপর দলীয় সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান একসময়ের এই কিংবদন্তি ছাত্রনেতা। বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সৈনিক হওয়া সত্তে¡ও কেন আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছেন তিনি। তার ব্যাখ্যা তিনি বিবৃত করেছেন ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী নই, তবুও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করি’ বইতে।
বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী থেকে কিংবদন্তি ছাত্রনেতা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তি ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকী ১৯৪০ সালের ২৬ মে যশোরের ঝিনাইদহ মহকুমায় জন্মগ্রহণ করেন।১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন। তারপর তার পিতা ঝিনাইদহের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসতে শুরু করেন। ছাত্রলীগের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছেড়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হোন। কিন্তু সে সময়ের ঢাকা কলেজে অধ্যক্ষ সরাসরি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতি এবং শিক্ষা আন্দোলনে জড়িত থাকায় তাকে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে পুনরায় সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। এরপর আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন নূরে আলম সিদ্দিকী। এরপর নূরে আলম সিদ্দিকী ৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনসহ তৎকালীন সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভ‚মিকা রেখে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রারম্ভে ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হোন। ওই সময় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কও নির্বাচিত হোন নূরে আলম সিদ্দিকী। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর ভিপি পদেও নির্বাচিত হোন তিনি। এসময় বঙ্গবন্ধুর চার খলিফার জেষ্ঠ্যজন হিসেবে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। তারপর সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণা চালান। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। শেখ মুজিবের বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠা ও তার রাজনৈতিক গুরু হিসেবে মূল্যায়নে নূরে আলম সিদ্দিকী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীনতাই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু করেছে। বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে অবিচল থাকায় তিনি হয়েছেন জাতির জনক। তার রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা, নিজস্ব মতামতের ওপর শ্রদ্ধা এবং তা বাস্তবায়নে সংগ্রামই সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের ছাড়িয়ে তিনি হয়েছেন বাঙালির অবিসংবাদিত মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক।
যেভাবে হয়ে উঠলেন ‘চার খলিফা’র একজন: বঙ্গবন্ধুর চার খলিফা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত পরিভাষা এটি। মূলত সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর এটির ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু কে এই পরিভাষার ব্যবহার শুরু করল, কেন করল- এ নিয়ে অনেক গল্প আছে, তবে সত্যিকার অর্থে আজও এর প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। তবে যতটুকু জানা যায়, ১৯৭০-৭১ সালে ছাত্রলীগের চার প্রখ্যাত চার নেতাকে সবাই রসিকতা করেই শেখ মুজিবের চার খলিফা বলে চিহ্নিত করত। কারণ, তাঁরা বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহভাজন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পাওয়া ওই নেতারা হলেন- আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও নুরে আলম সিদ্দিকী।কিন্তু ছাত্রনেতাদের উপাধি কেন চার খলিফা? এ নিয়ে নুরে আলম সিদ্দিকীর জানিয়েছেন, চার খলিফা নামকরণেই প্রকৃত কারণ আমার কাছে অজানা। তবে যে-ই এটি উদ্ভাবন করুক না কেন- এটা সারা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে মরুভ‚মির নিষ্কলুষ সূর্যোদয়ের মতো শুধু ছড়িয়ে পড়েইনি সকলের হৃদয়কে বিস্ময়করভাবে আপ্লুত করে এবং নিমিষেই এই খলিফা নামটি সবার মুখে এমনকি সংবাদমাধ্যমে উচ্চারিত ও প্রচারিত হতে থাকে। তার বক্তব্য- আমার জানা মতে, এটার একটা উৎস হতে পারেন বঙ্গবন্ধু। তিনি যেটা নিজ মুখে রাজনীতিতে সংবিধানিক দায়-দায়িত্বের খাতিরে বলতে পারতেন না বা পাকিস্তানিরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী উস্কানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে; জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এই কারণে অনেক কথা তার হৃদয়তন্ত্রিতে ঝংকৃত হলেও তিনি প্রকাশ্যে বিবৃত করা থেকে বিরত থাকতেন। সেই কথাগুলো আমাদের কণ্ঠে প্রকাশ্যে ও নিঃসঙ্কোচে প্রতিষ্ঠিত হতো।নুরে আলম সিদ্দিকীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চার খলিফার তিনি খলিফা চলে গেলেন। আগেই চলে গিয়েছিলেন আব্দুল কুদ্দুস মাখন, এরপর শাহজাহান সিরাজ আর এবার সবশেষ নুরে আলম সিদ্দিকী। বেঁচে রইলেন আ স ম আব্দুর রব। চার খলিফা ছিল একেকটি নক্ষত্র। বিভিন্ন কারণে এক একটি নক্ষত্র একেক দিকে চলে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চারজন একসঙ্গে কাজ করেছেন।
পুঁজিবাজারের উন্নয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান ও ডোরিন ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূরে আলম সিদ্দিকী ১৯৭৭ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যপদ লাভ করেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যপদ লাভের তিন বছর পর ১৯৭৯ সালে তিনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব নেন। নূরে আলম সিদ্দিকী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই বছর চারটি কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সিকিউরিটিজের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ তে। পরবর্তী সময়ে তিনি ১৯৮১ সালে আবারও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন। নূরে আলম সিদ্দিকী দুই মেয়াদে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পুঁজিবাজার উন্নয়নকল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছেন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ মুহাম্মদ হাসান বাবু ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এম. সাইফুর রহমান মজুমদার। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা।

সর্বস্তরে শোকের ছায়া: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মরহুম নূরে আলম সিদ্দিকীর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। পৃথক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতির এই সাহসী সন্তানের অবদান পরবর্তী প্রজন্ম চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী নূরে আলম সিদ্দিকীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।নূরে আলম সিদ্দিকীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু ভিপি ও জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলোতে নূরে আলম সিদ্দিকী ছিলেন অন্যতম ঐতিহাসিক চরিত্র। সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় উপস্থাপন করায় তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন বাগ্মী। তিনি ৬০ দশকের বিপুল গণজাগরণের অন্যতম ভাষ্যকার। তিনি ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা ও সর্বজনপ্রিয় ‘চার খলিফার’ অন্যতম সারথি। তৎকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতির সুমহান গৌরব ও তাৎপর্যের অন্যতম ঐতিহাসিক নায়ক ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী।তার মৃত্যুতে দেশ একজন সংগ্রামী ও গণতন্ত্রের আপসহীন পূজারিকে হারাল। এই ক্ষতি পূরণযোগ্য নয়। যতদিন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকবে ততদিন নূরে আলম সিদ্দিকীও জাতির অস্তিতে গ্রথিত হয়ে থাকবেন। এছাড়াও নূরে আলম সিদ্দিকীর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও স¤প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের এমপি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ।
ইউডি/আতা

