এন্নু সোয়াথাম শ্রীধরন: মানবিকতার অনন্য কাহিনী
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৩:৫০
ইন্ডিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় এক মুসলিম নারী তিন হিন্দু ছেলে-মেয়েকে নিজের সন্তানদের সঙ্গে লালন-পালন করেছিলেন। এ ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর এই কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে এন্নু সোয়াথাম শ্রীধরন নামের একটি চলচ্চিত্র। চলতি বছরের শুরুতে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে, আবেগে ভাসছেন দর্শকরা, অনুপ্রেরণা জাগাচ্ছে তাদের। মানবিকতার এই গল্প নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
মাতৃত্বের কাছে হেরে গেল ধর্মের ভেদাভেদ: ৫০ বছর আগের কথা। ইন্ডিয়ার কেরালার মলপ্পুরম জেলার কালিকাভুর বাসিন্দা আব্দুল আজিজ হাজি এবং থেন্নাদন সুবাইদা। ধর্মপ্রাণ এই মুসলিম দম্পতি এবং তাদের তিন সন্তানের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে দক্ষিণী সিনেমা ‘এন্নু সোয়াথাম শ্রীধরন’। ৯ জানুয়ারি কেরালায় মুক্তি পাওয়া এই ছবি দেখে আবেগে ভাসছেন দর্শক। অনেকে বলছেন ছবির চেয়েও ‘নাটকীয়’ এই দম্পতির কাহিনি। এক মুসলিম দম্পতি কোলে তুলে নিয়েছিলেন তাদের হিন্দু পরিচারিকার তিন সন্তানকে। সন্তানস্নেহে তাদের মানুষ করেছেন। তবে কাজটা সহজ ছিল না। সামাজিক গোঁড়ামি, চোখরাঙানি উপেক্ষা করেছেন ওই দম্পতি। পালিত তিন সন্তানের বাবা-মা হয়েছেন তারা। কিন্তু ধর্মান্তরিত করেননি তাদের। মুসলিম বাবা-মায়ের তিন হিন্দু সন্তানকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘এন্নু সোয়াথাম শ্রীধরন’ ছবির গল্প।
পরিচারিকা হলেও চাক্কি ছিলেন সুবাইদার পরিবারেরই এক জন। চাক্কির মৃত্যুর হয় আচমকা। তার তিন সন্তান শ্রীধরন, রামানি এবং লীলাকে তার নিজের তিন সন্তানের সঙ্গে বড় করেন সুবাইদা। সুবাইদার নিজেরই তখন দুটি ছেলে সন্তান- জাফারখান, এবং তার বড় শানাওয়াস। চার বছর পর জশিনা নামে একটি কন্যা সন্তানও হয়। একই পরিবারে চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এরা বেড়ে উঠেন। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে কিডনির অসুখে মৃত্যু হয় সুবাইদার। স্ত্রীর মৃত্যুর পর বছর দুই বেঁচে ছিলেন আজিজ হাজি। ২০২১ সালে মৃত্যু হয় তার।
আলোচিত সিনেমা নির্মাণের নেপথ্যে: ২০১৯ সালেই সর্বপ্রথম সামনে আসে মুসলিম নারী সুবাইদা ও তার তিন হিন্দু সন্তানদের কাহিনি। একটি ফেসবুক পোস্টে শ্রীধরন নিজের ‘উম্মা’-র (মালয়ালমে মুসলিম মা) কথা লেখায় সামনে আসে ওই মহিলার গল্প। কীভাবে হিন্দুর মা ‘উম্মা’ হলেন, পড়তে পড়তে চোখ ভিজে যায় নেটিজেনদের। প্রথমে অনেকেই একে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা মনগড়া গল্প বলে মনে করেছিলেন। কেউ কেউ লিখেছিলেন, ‘কেন এসব গল্প লেখেন?’ পরে জানা যায়, ওমানে আটকে থাকা ছেলে তার ‘উম্মা’-কে শেষবারের মতো দেখতে না পেয়ে এই পোস্টটি করেন। ক্রমশ তা ভাইরাল হয়। সেই কাহিনি নিয়ে তৈরি হয় সিনেমা। ৫৫তম আন্তর্জাতিক গোয়া চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে শ্রীধরনদের গল্প। পরিচালক জানান, ফেসবুকের পোস্ট দেখেই তিনি সিদ্ধান নেন এ নিয়ে ছবি করবেনই। হিন্দু এবং মুসলমান পরিবারের ভালবাসার কাহিনিকে যত্নে গেঁথেছেন চিত্রপরিচালক সিদ্দিক পরাভুর। ইতিমধ্যে দর্শকদের পছন্দের তালিকায় ঢুকে পড়েছে ছবিটি।
মানুষকে অনুপ্রাণিত করার জন্যই এই সিনেমা: এসব বাস্তব কাহিনীর ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছে ‘এন্নু সোয়াথাম শ্রীধরন’ ছবিটি, আর এটির পরিচালক সিদ্দিক পারাভুর। সুবাইদার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে শ্রীধরন যে ফেসবুক পোস্টটি দিয়েছিলেন, সেটি আরও অনেকের মতো পারাভুরকেও বেশ অনুপ্রাণিত করে। তিনি বলেন, এই গল্পে যে মানবিকতার কত রকমের দিক আছে, যা মানুষের জানা উচিৎ। পারাভুর বলেন, ছবিতে তিনি মানবিক সম্পর্কের সৌন্দর্যকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। গত ৯ জানুয়ারী কেরালায় এই ছবির একটি বিশেষ প্রদর্শনী হয়েছে। পারাভুর এখন এই ছবি সিনেমা হলগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেয়ার জন্য কিছু তহবিল জোগাড় করার চেষ্টা করছেন।
ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের মাঝে অনুকরণীয় ঘটনা: যে নারী এদের এক সঙ্গে বড় করেছেন- জাফারখানের মা, থেন্নানদান সুবাইদা, তিনি মারা যান ২০১৯ সালে। তার জীবন ধর্মীয় ভেদাভেদের উর্ধ্বে উঠে মানবিকতার জয়গান গাওয়া এক মায়ের মন ভালো করা কাহিনী। ইন্ডিয়ায় যখন ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ নিয়মিত খবরে পরিণত হয়েছে, তখন এই মুসলিম নারীর জীবনের গল্প বহু মানুষকে আলোড়িত করেছে। শ্রীধরন এবং তার দুই বড় বোন রামানি এবং লীলা- এই তিনজনকেই বড় করেছেন সুবাইদা। শ্রীধরনের মা চাক্কি ১৯৭৬ সালে চতুর্থ সন্তানের জন্ম দেয়ার সময় মারা যান, পরে সেই চতুর্থ সন্তানও বাঁচেনি। চাক্কি সুবাইদার বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতেন। তার মৃত্যুর পর তিন সন্তানের দায়িত্ব নিলেন সুবাইদা। তবে তিনি আইনগতভাবে এদের দত্তক নেননি, কারণ তখন সন্তান দত্তক নেয়ার জন্য আইন অত কড়াকড়ি করা হয়নি। মা-হারানো তিন ভাইবোনকে আশ্রয় দেয়ার মতো কোন আত্মীয়-স্বজন যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তাদের বাবা সুবাইদাকে অনুমতি দিলেন এই তিনজনের দায়িত্ব নেয়ার। শ্রীধরন বলেন, তার বাবার সাধ্য ছিল না তাদের দেখা-শোনা করার। এই পুরো কাহিনীর কথা লোকে জানতে পারেন ২০১৯ সালে সুবাইদার মৃত্যুর পর। শ্রীধরন সেসময় কাজ করতেন ওমানে। ফেসবুকে তিনি তার পালক মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। এতে সুবাইদাকে আম্মা সম্বোধন করে (মালয়ালি মুসলিমরা মাকে এভাবেই সম্বোধন করেন) তিনি লিখেছিলেন, তিনি যেন বেহেশতে যেতে পারেন, সেজন্যে সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। এই পোস্টটি অনেকের নজর কাড়ে। সবাই ভাবছিল, হিন্দু নামের একটি লোক কেন তার মাকে ‘উম্মা’ বলছে। শ্রীধরন আরও বলেন, আমাদের দরকার ভালো হওয়া, সৎ থাকা। আমরা মানুষরাই আসলে বিশ্বাসকে বদলাতে পারি। সুবাইদার জীবন দর্শন ছিল এটাই, এর ভিত্তিতেই তিনি জীবন-যাপন করেছেন এবং তার সন্তানদের বড় করেছেন।

এভাবে বেড়ে ওঠার সময় শ্রীধরন এবং জাফারখানের মধ্যে বন্ধনটা যেন আর দৃঢ় হয়ে উঠলো, তারা যেন যমজ ভাই, সবকিছু একসঙ্গে করতেন। শানাওয়াস এবং জাফারখান বলেন, তাদের মধ্যে মারামারি খুব কমই হতো, যদিও ‘শ্রীধরন’কেই যেন তার মায়ের বেশি পছন্দ ছিল। তাকে যেন বেশি স্নেহ করতেন। আমার চেয়ে শ্রীধরনই মায়ের জন্য এটা-ওটা এনে দিতে, সেকারণে হয়তো মা ওকে বেশি ভালোবাসতো। শানাওয়াস বলেন, মনে আছে যেদিন তার মা দু বছরের শ্রীধরনকে কোলে নিয়ে ঘরে ফিরলেন। লীলা এবং রামানি ছিল তার পেছনে। আমার মা বললেন, এখন থেকে ওরা আমাদের সঙ্গে থাকবে, কারণ ওদের দেখার কেউ নেই। এরপর তারা সবাই বড় হলেন একই পরিবারে। শানাওয়াস মনে করতে পারেন, শৈশবে তারা মেঝেতে পাশাপাশি বিছানা পেতে ঘুমাতেন। চার বছর পর যখন জশিনার জন্ম হলো, তখন তারা সবাই কিরকম খুশি হয়েছিলেন।
মানবতা যেখানে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও উর্ধ্বে: জাফারখান যখন প্রথম এন্নু সোয়াথাম শ্রীধরন (আপনার একান্ত, শ্রীধরন) ছবিটি দেখেন, তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু ছবি দেখার সময় পাশে বসা তার ভাই শ্রীধরনের অবস্থা ছিল আরও খারাপ। তার কান্না থামানোই যাচ্ছিল না। জাফারখান এবং শ্রীধরন- দুজনেরই বয়স এখন ৪৯। তাদের মধ্যে কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। জাফারখান একজন মুসলিম, শ্রীধরন হিন্দু। কিন্তু জাফারখানকে জিজ্ঞেস করুন শ্রীধরন তার কী হয়, এবং উত্তরে তিনি বলবেন, “ও আমার ভাই। না, তার চেয়েও বেশি কিছু। ও সবসময় আমার পাশে থাকে। আমি জানিনা ও কে কিন্তু ও আমার সাথী।
আম্মা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে থামতে চান না শ্রীধরন। তিনি বলেন, সৎমা নাকি কখনও নিজের হয় না। কিন্তু আমি শুধু শুনেছি। কখনও বুঝিনি যে আমার জন্ম দাত্রী অন্য কেউ। শ্রীধরন এখনও শিহরিত হন এটা ভেবে যে যদি তাদের জীবনে সুবাইদা নামে মহিলা না আসতেন তা হলে কী হত! একে গরিব, তার উপর ‘নিচু জাত’। সবাই দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করত। তবে ওই নারীর ছত্রছায়ায় এসে শ্রীধরন শিখেছেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে। শিখিয়েছেন, কখনও নিজের অস্তিত্বকে খাটো করে না দেখতে। শ্রীধরন জানান, তার নিজের বাবার মৃত্যুর পর সৎ বোনকেও মানুষ করার ভার নেন তারা। এমনটা অনেকে ভাবতেও পারেন না। শ্রীধরনের কাহিনি অবাক করেছে নেটিজেনদের। নিজেদের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে শ্রীধরন বলেন, ‘আমি এবং আমার দিদিরা মন্দিরে যেতাম কপালে চন্দন টিকা নিয়ে। আমরা মা-বাবা বরাবর তাতে উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। তারা আমাদের শিখিয়েছেন, ধর্ম মানে অন্যকে আঘাত করা নয়। চুরি করা পাপ, অসৎ আচরণ করা উচিত নয়, সবাইকে ভালবাসতে এবং সাহায্য করতেও শিখিয়েছেন তারা। আমরা ভাইবোনেরাও কখনও এমন কোনও কাজ করিনি যাতে তারা দুঃখ পান।’
মাতৃহারা তিন শিশুর ‘উম্মা’ হলেন মুসলিম মহিলা: বাবা-মার কাছ থেকে জীবনে কতরকমের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছেন তার কথা উল্লেখ করছিলেন ভাই-বোনরা। শানাওয়াসের মনে পড়ে, কোন মানুষ, তিনি যে ধর্ম, শ্রেণী বা বর্ণেরই হোক না কেন, তার মা কীভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেন। যে কেউ আমার মার কাছে সাহায্য চাইতে যেতে পারতো, সেটা লেখাপড়া, বিয়ে কিংবা চিকিৎসা- যেটার জন্যই হোক না কেন। আর মা যে কোনভাবে ব্যবস্থাটাও করে ফেলতে পারতেন। তিনি অনেক সময় ধার-কর্জ করে এটা করতেন, পরে নিজের জমি বিক্রি করে হলেও ধার শোধ করতেন। লীলার বয়স এখন ৫১ বছর। তিনি জানান, যখনই তার মন্দিরে যেতে ইচ্ছে হতো, মা সুবাইদা তাকে সেখানে নিয়ে যেতেন। যাতায়তের ব্যবস্থা তখন এত ভালো ছিল না। সুতরাং তারা কোন উৎসবের সময় দলবেঁধে সেখানে যেতেন। তিনি আরও বলেন, আমার ‘উম্মা’ সবসময় বলতেন, তুমি হিন্দু, মুসলিম নাকি খ্রীস্টান ধর্ম পালন করো তাতে কিছু আসে-যায় না। সব ধর্মই আমাদের একই শিক্ষা দেয়। আর সেটা হচ্ছে সবাইকে ভালোবাসা, সবাইকে শ্রদ্ধা করা।

চলচ্চিত্রের মাধ্যমে স্মৃতি বেঁচে থাকুক: সুবাইদার ছেলে-মেয়েরা এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন নানা শহরে। তারা বলছেন, তাদের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। লীলা বলেন, আম্মার ব্যাপারে আমার যে কত সুখ-স্মৃতি। কিন্তু যখন মনে হয়, এসব স্মৃতিও একদিন শেষ হয়ে যাবে, তখন কষ্ট লাগে। কিন্তু এখন যে একটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমার মায়ের স্মৃতি জাগ্রত থাকবে, তাতে আমি খুশি। শানাওয়াস বলেন, আমার মা যখন মারা গেলেন, তখনই আমরা প্রথম উপলব্ধি করলাম যে লোকে আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পায়। কিন্তু আমরা তো আসলে এখনো একইরকম আছি।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

