মস্কোর দাবি ‘দখল’: কিয়েভের প্রতিক্রিয়ায় ‘ধোঁয়াশা’ বাখমুত আসলে কার?

মস্কোর দাবি ‘দখল’: কিয়েভের প্রতিক্রিয়ায় ‘ধোঁয়াশা’ বাখমুত আসলে কার?

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২২ মে ২০২৩ । আপডেট ১৪:৪৫

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনে পূর্বাঞ্চলীয় শহর বাখমুতের দখল নিয়েছে রুশ সেনারা। তার এই দাবি সঠিক হলে গত গ্রীষ্মের পর রুশবাহিনীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হবে তা। নয় মাসের বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধে রুশ ও ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে বাখমুতের লড়াই। ইউক্রেন দাবি করেছে, এখনও তারা শহরটির প্রান্তে কয়েকটি ভবনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে তারা যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে তাতে শহরটি মোটামুটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার বাখমুত দখল করা হবে তাদের বিধ্বস্ত সেনাবাহিনীর জন্য কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। প্রশ্ন হচ্ছে, বাখমুতের লড়াইয়ে প্রকৃত অর্থে কে জয়ী হয়েছে? সমরবিদরা বলছেন, এই বিষয়টি শুধু বিধ্বস্ত শহরটির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে তা দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। বরং যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় দ্বারা নির্ধারিত হবে। বাখমুতের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষার জন্য লড়াই করেছে ইউক্রেনীয় সেনারা। তারা রুশ সেনাদের ক্লান্ত করে তুলেছে। একই সময়ে তারা রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে। কিয়েভ প্রতিরক্ষার জন্য অতিরিক্ত ইউনিট মোতায়েন করলে শহরটির ইউক্রেনীয় সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ওয়াগনার গ্রুপের দাবি, বাখমুত নিয়ন্ত্রণে: শনিবার রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন বলেছেন, তারা শহরটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। রুশ আক্রমণের নেতৃত্বে রয়েছে ওয়াগনারের যোদ্ধারা। শহরটিতে গত কয়েক দিন ধরে লড়াই মূলত পশ্চিমাংশের বহুতল ভবন থাকা এলাকায় সীমিত ছিল। এলাকাটি ‘প্লেন’ নামে পরিচিত। কারণ শহরের প্রবেশ পথে একটি সোভিয়েত যুদ্ধবিমান দাঁড়িয়ে রয়েছে। রবিবার (২১ মে) ওয়াগনার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, তার যোদ্ধারা রাশিয়া ত্রিরঙা ও ওয়াগনার গ্রুপের কালো রঙের পতাকা বাখমুতের পশ্চিমাংশের একটি বিধ্বস্ত ভবনে ছাদে উড়াচ্ছে। পেছনে দেখা যাচ্ছিল ফসলের মাঠে কামানোর গোলার ধ্বংসযজ্ঞ। দুই পতাকা নাড়িয়ে ওয়াগনারের এক যোদ্ধা ‘জয়’ বলে চিৎকার করছিলেন। ইউক্রেনের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হান্না মালিয়া শনিবার দাবি করেছিলেন, ইউক্রেনীয় সেনারা এখনও কয়েকটি শিল্প ও অবকাঠামো স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছে। রবিবার ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় শাখার মুখপাত্র কর্নেল সেরহি চেরেভাতি বলেছেন, তাদের সেনারা এখনও কিছু স্থানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের কিনারায় সুরক্ষিত অবস্থান নিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন রাশিয়ার নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ওয়াগনার গ্রুপকে বাখমুত ‘মুক্ত’ করার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। শহরটিকে রাশিয়া ও দেশটির সংবাদমাধ্যম সোভিয়েত আমলের নাম আর্টিমোভস্ক হিসেবে তুলে ধরছে। বাখমুতের পতনের দাবি সঠিক হলে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত লড়াইয়ের অবসান হবে।

ধ্বংস হয়ে গেছে বাখমুত, বলছেন জেলেনস্কি: শহরটি দখলে রাশিয়ার দাবি অস্বীকার করেছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির বলেছেন, আপনাদের বুঝতে হবে, শহরটিতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। তারা সবকিছু ধ্বংস করে ফেলেছে, কোনও ভবন নেই। রবিবার (২১ মে) তার এই মন্তব্যের পর ইউক্রেন দাবি করেছে, শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনও লড়াই চলমান রয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। জাপানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকের আগে ভলোদিমির জেলেনস্কিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাশিয়া বাখমুত পুরোপুরি দখলের দাবির পর শহরটি কি এখনও ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। জবাবে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি মনে করি না। আজকের জন্য বাখমুত শুধু আমাদের হৃদয়ে আছে। পরে জেলেনস্কির এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তার প্রেস সচিব বলেছে, তিনি একটি প্রশ্নের ভিন্ন অংশের জবাব দিচ্ছিলেন। সেরগি নিকিফোরভ নামের ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা ফেসবুকে লিখেছেন, সাংবাদিকের প্রশ্ন: রুশরা বলছে তারা বাখমুত দখল করেছে। প্রেসিডেন্ট জবাবে বলেছেন, আমি মনে করি না। প্রেস সচিব আরও বলেছেন, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বাখমুত দখল হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। শনিবার রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনীয় শহরটি পুরোপুরি দখল করেছে। তাদের দাবি সঠিক হলে, এর মাধ্যমে ১৫ মাস দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত লড়াইয়ের অবসান হবে। জেলেনস্কি বলেছেন, এটি একটি ট্র্যাজেডি। সেখানে কিছুই অবশিষ্ট নেই।

কৌশলগত মূল্য কম হলেও এটি হবে রাশিয়ার প্রতীকী জয়: বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার জন্য বাখমুত নগরীর কৌশলগত মূল্য কম হলেও এ নগরী দখল করতে পারলে তা হবে রাশিয়ার জন্য এ পর্যন্ত লড়ে আসা দীর্ঘ যুদ্ধে এক প্রতীকী জয়। সেই গত অগাস্ট থেকে দু’পক্ষ এ নগরী দখলের জন্য লড়ে আসছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের হিসাবমতে, ২০ থেকে ৩০ হাজার রুশ সেনা এ নগরী দখলের লড়াইয়ে হতাহত হয়েছে। ইউক্রেইনের পক্ষেও অনেক সেনা মারা গেছে। কিছু দিন আগে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, ওয়াগনার গ্রুপের প্রায় অর্ধেক যোদ্ধা নিহত হয়েছে। ইউক্রেন নিজেদের সেনা নিহতের কথা জানায়নি। তবে তারাও ব্যাপক প্রাণহানির স্বীকার হয়েছে। ইউক্রেইনের ইস্টার্ন অপারেশনাল কমান্ড এর মুখপাত্র পরে বিবিসি-কে বলেছে, ইউক্রেইন এখনও বাখমুতের দক্ষিণ-পশ্চিমে কয়েকটি ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আছে এবং পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, ইউক্রেইনের অবস্থান খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কারণ, রাশিয়া নগরীর সব অবকাঠামো ধ্বংস করে ফেলেছে। এতে প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলোর সংখ্যা সীমিত হয়ে পড়েছে। তবে ইউক্রেইন বাহিনী নগরীর দক্ষিণ এবং উত্তর পাশে পাল্টা হামলা চালানো এবং রুশ সেনাদের পিছু হটিয়ে দিতে সব পরিবেশ তৈরি করছে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading