ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে কিশোর গ্যাং কালচার

ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে কিশোর গ্যাং কালচার

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৫:০০

কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। সমাজের অনেক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাং সমস্যা। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি চুরি-ছিনতাই, খুনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তারা। এ নিয়ে আরাফাত রহমান’র প্রতিবেদন

এক বছরে গ্রেপ্তার ৬০০ সদস্য: সারা দেশে কিশোর গ্যাং কালচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অপরাধের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই থেকে শুরু করে খুনাখুনিসহ নানা অপরাধে কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসা ও দখলবাজিতেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। নানা অপরাধে জড়িয়ে কিশোররা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

অধিকাংশ কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মদদ দিচ্ছে। ‘হিরোইজম’ প্রকাশ করতেও পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, কিশোর গ্যাং সদস্যদের তৎপরতা রোধে বড় ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এ দুই এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং সক্রিয়। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা খুনাখুনি, মাদক, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মিরপুর এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং কালচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ১৭ বছরে ঢাকায় কিশোর অপরাধীদের হাতে ১২০ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২ বছরে ৩৪ জন খুন হয়েছেন।

শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মোহাম্মাদপুর, আদাবর, হাজারীবাগ এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’ এর বিভিন্ন গ্রæপের ছিনতাই, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব-২। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা কিশোর গ্যাং ‘পাটালি গ্রুপের অন্যতম মূলহোতা সুজন মিয়া ওরফে ফর্মা সজিব এবং ‘লেভেল হাই’ এর অন্যতম মূলহোতা মো. শরিফ ওরফে মোহন ও ‘চাঁন গ্রুপ’, ‘মাউরা ইমরান গ্রুপ’সহ বিভিন্ন গ্রুপ’র সদস্য। র‌্যাব-২ জানায়, গত এক বছরে ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় শতাধিক জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগই কোনো না কোনো গ্যাং গ্রæপের সদস্য। এই সকল গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছেড়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে আসছে। এর মাধ্যমেই তারা চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই করে আসছে।

এদিকে, রাজধানীর মিরপুর, দারুস সালাম এবং ঢাকার সাভার এলাকা থেকে কিশোর গ্যাং ‘ল্যাংরা নুরু’, ‘পটোটো রুবেল’ ও ‘কিং শাওন’ গ্রুপের লিডারসহ ২১ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৪। বিশ্লেষকরা বলছেন, সঠিক ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে কিশোরদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা তৈরি হচ্ছে। এগুলো প্রশমিত না হওয়ায় তারা নানা ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব কারণ বিশ্লেষণ করে সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কিশোর অপরাধ কমানো সম্ভব নয়।

মো. আনোয়ার হোসেন খান

ভিন্ন পেশার আড়ালে ভয়ঙ্কর রূপ: কেউ বাসের হেলপার, কেউ ড্রাইভার, কেউ দোকানের কর্মচারী, নির্মাণ শ্রমিক। কেউবা পুরাতন মালামাল ক্রেতা, রাজমিস্ত্রী। আছে সবজি বিক্রেতাও। তবে ভিন্ন পেশা হলেও সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় তাদের পেশা ও পরিচয়। বেড়িয়ে আসে ভয়ঙ্কর রূপ। ভিন্ন পেশার আড়ালে মোহাম্মদপুর ও তার আশপাশের এলাকায় তারা ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়িত। প্রত্যেকের নামে রয়েছে একাধিক মামলা। প্রত্যেকেই জেল খেটেছেন। বেরিয়ে আবারও জড়িয়েছেন গ্যাং কালচারে। রাজধানীর মোহাম্মাদপুর, আদাবর, হাজারীবাগ এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’ এর বিভিন্ন গ্রæপের ছিনতাই, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব। । যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা কিশোর গ্যাং ‘পাটালি গ্রুপের অন্যতম মূলহোতা সুজন মিয়া ওরফে ফর্মা সজিব এবং ‘লেভেল হাই’ এর অন্যতম মূলহোতা মো. শরিফ ওরফে মোহন ও ‘চাঁন গ্রুপ’, ‘মাউরা ইমরান গ্রুপ’সহ বিভিন্ন গ্রুপের সদস্য। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র।

শনিবার মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‌্যাব-২ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিনায়ক (সিও) ও অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন খান। গ্যাংগুলো ছিনতাই, চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাÐে জড়িত উল্লেখ করে মো. আনোয়ার হোসেন খান বলেন, স¤প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়। এসব ঘটনায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি ও মামলা হয়েছে। অতি স¤প্রতি মোহাম্মদপুর, আদাবর, হাজারীবাগ ও তার আশেপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকাÐ সম্পর্কে তথ্য পেয়ে র‌্যাব টহল ও গোয়েন্দা কার্যক্রম বৃদ্ধি করে। এদিকে, রাজধানীর মিরপুর, দারুস সালাম এবং ঢাকার সাভার এলাকা থেকে কিশোর গ্যাং ‘ল্যাংরা নুরু’, ‘পটোটো রুবেল’ ও ‘কিং শাওন’ গ্রæপের লিডারসহ ২১ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৪।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) লেফট্যানেন্ট কর্নেল মোহাম্মদ আবদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর, দারুসসালাম, পল্লবী, শাহ আলী এলাকায় বেশ কিছু কিশোরগ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তন্মধ্যে ‘ল্যাংরা নুরু’ ও ‘পটোটো রুবেল’ এর লিডারসহ ৭০-৮০ জনের সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এ গ্যাংয়ের সদস্যরা মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, ভাষানটেকসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মারামারি, মাদক সেবন ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাÐের সঙ্গে জড়িত। চিহ্নিত এসব বেপরোয়া ও মাদকসেবী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অত্যাচারে বাসস্ট্যান্ডে আসা দূর-দূরান্তের যাত্রী ও স্থানীয় লোকজন অতিষ্ঠ ও অসহায় হয়ে পড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য শঙ্কা বাড়াচ্ছে: পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাতেই গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং গ্রæপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০টি। এইসব কাজ করছিল তাদের সদস্যদের সবার বয়সই ১৪ থেকে ১৮ এর মধ্যে। তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই। বিভিন্ন জেলা শহরের কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা ৪ কোটি। এদের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সাথে যুক্ত। আর অভাবের কারণে এদের অধিকাংশই নানারকম অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ৪৪ শতাংশ পথশিশু মাদক চালানের সঙ্গে জড়িত, ৩৫ শতাংশ জড়িত পিকেটিংয়ের সাথে, ১২ শতাংশ জড়িত ছিনতাইয়ের সাথে, ১১ শতাংশ মানব পাচার এবং ২১ শতাংশ অন্যান্য অপরাধের সাথে জড়িত। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে অনেককে আগ্নেয়াস্ত্র বহন, হত্যা, মাদক চালান, ডাকাতি, চুরি, রাজনৈতিক সহিংসতা, যৌন হয়রানির দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক করেছে। অথচ অপরাধের সাথে শিশু কিশোরদের ক্রমশ জড়িয়ে পড়ার হার বাড়ছে বলে ২০০৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই উদ্যোগী হয়ে একটি গবেষণা করেছিল।

সেই গবেষণা অনুযায়ী শিশু অপরাধীদের গড় বয়স ছিল ১৪ দশমিক ৯ বছর। মূলত পরিবারের আর্থিক অভাব, প্রাচুর্য, শিক্ষার অভাব, শাসনহীনতা, অভিভাবকের উদাসীনতা, মূল্যবোধের সংকট, পরিবারের ভেতরে অপরাধীর বা অপরাধের উপস্থিতি শিশুকে বিপদের মুখে এনে দাঁড় করায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধবরাই শিশু কিশোরদের অপরাধ জগতের দিকে টেনে নিলেও, দরিদ্র শিশুদের খাবার ও আশ্রয়ের কথা বলে অপরাধীরা এই জগতে টেনে আনে। এছাড়া সমাজের মধ্যে বিরাজমান ফারাকও শিশুকে অপরাধী হতে পথ দেখায়। এই শিশুদের শতকরা ৮০ জনই জানে যে তারা অপরাধ করছে। তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে, অভাবের কারণেই তারা অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছে এবং এক্ষেত্রে কিশোরীরাই সংখ্যায় বেশি।

প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি : ‘কিশোর গ্যাং’ ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মুজিবুল হক। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে মুজিবুল হক এই দাবি জানান। মুজিবুল হক বলেন, ঢাকা শহরে মানুষের বসবাস করা কঠিন। এসব বাহিনী যারা চাঁদাবাজি করছে, লুটপাট করছে, মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, তারা পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এবং কমিশনারদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব করছে। যারা এসব কাজে জড়িত, সেটা সরকারি দলের হোক বা পুলিশের হোক, সারা দেশের মানুষ বিশেষ করে ঢাকা শহরের মানুষকে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এদের বিরুদ্ধে একটা ‘ড্রাস্টিক অ্যাকশন’ নেওয়ার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মুজিবুল হক।

এ জন্য তিনি পরিকল্পনা করে এদের ধরপাকড় করে আইনের আওতায় আনাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য খসরু চৌধুরীও কিশোর গ্যাং নিয়ে সংসদে কথা বলেন। তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

কিশোর গ্যাং গোষ্ঠীগুলো তৈরির পেছনে কী: কিশোর গ্যাং গোষ্ঠীগুলো তৈরি হলো কেন? কেনই বা তারা এত ভয়ংকর হয়ে উঠেছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের মধ্য অ্যাডভেঞ্চার ফিলিং বা হিরোইজম ভাব বেশি দেখা যায়। কিশোর বয়সে বেড়ে উঠার পরিবেশ তাকে অপরাধী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। কিশোর বয়সে ইতিবাচক চর্চার দিকে না গিয়ে, নেতিবাচক চর্চার দিকে চলে যায়। আবার যখন তারা দেখে যে, অপরাধ যারা করছে তারা সমাজে বেশি লাভবান হচ্ছে, সেটা কিশোররা অনুসরণ করে। তাদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকে না। লক্ষণীয় বিষয়, আমাদের সমাজে নানা অসংগতি রয়েছে। নিজেদের সাংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ও সময়ের অনেক কিশোর, তাদের আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে। অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন লোমহর্ষক ও ভিনদেশি সংস্কৃতি ইচ্ছা মতো তাদের আয়ত্তে চলে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এছাড়া কিশোরদের রাজনৈতিক ব্যবহার করার কারনে তাদের মধ্য গ্যাং কালচার গড়ে উঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহচার্য, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রের নানাবিধ উপকরণ গ্যাং কালচার তৈরির উপাদান হিসাবে কাজ করে। একই কমিউনিটির ভেতর যখন দরিদ্র শ্রেণি ও উচ্চবিত্তের বসবাস থাকে, তখন উচ্চবিত্তের জীবনযাত্রা দেখে দরিদ্র শ্রেণির সন্তানরা নিজেদের ভাগ্যকে বঞ্চিতদের ভাগ্যের সঙ্গে তুলনা করে হতাশা অনুভব করে। আবার কমিউনিটিতে যখন অস্ত্র ও বিশেষ করে মাদকের দৌরাত্ম্য থাকে তখন গ্যাংয়ের অস্তিত্ব থাকে এবং বিপরীতে আরেকটি গ্যাং তৈরি হতে পারে অথবা ওই গ্যাংয়ের বিদ্রোহী, দলছুট বা বহিষ্কৃত সদস্যরা আরেকটি গ্যাং তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ কমিউনিটিতে যখন গ্যাংয়ে যোগদান করার অভ্যাস অথবা প্রথা হয়ে দাঁড়ায়, তখন একজন অপরকে বা সিনিয়রকে দেখে গ্যাং সদস্য হতে উৎসাহী হয়। কখনো ভিনদেশি কালচারের অনুপ্রবেশে অনুকরণপ্রবণশীল কিশোররা সহিংসতা সম্পর্কে জানতে পারে। তখন সহিংসতায় আকৃষ্ট হয়ে ওই কালচার রপ্ত করতে চায় কিশোররা। তাই পরিবারের করণীয়টা এখানে বড় হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রেই এ সমস্যার পেছনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

রিবারিক বিশৃঙ্খলা অথবা ডিভোর্সের কারণে ভেঙে যাওয়া পরিবারে সন্তানদের মাঝে হতাশা তৈরি হয়। নেশাগ্রস্ত পরিবার যেখানে মাদক/নেশাজাতীয় দ্রব্যের নিয়মিত আসর বসে, সেখানে কম বয়সে অপরাধে জড়িয়ে যাওয়া খুবই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অনেক সময় দেখা যায় পরিবারের কেউ গ্যাং সদস্য থাকলেও কিশোররা এ পথে আসতে উৎসাহিত হয়। পরিবারের কোনো সদস্য বা পিতা-মাতা রোল মডেল হতে ব্যর্থ হলে অথবা পিতা-মাতার কর্ম অদক্ষতা ও বেকারত্বের ফলে আর্থিক উপার্জনের জন্য সন্তানদের মাঝে গ্যাং সদস্য হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আবার কখনো কখনো কর্মজীবী বা ব্যবসায়ী পিতা-মাতার পক্ষে সন্তানকে সময় দেওয়া দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে গ্যাং তৈরির মধ্য দিয়ে সন্তান একাকিত্ব ও হতাশা দূর করার চেষ্টা করে। একাধিক বিবাহ এবং পারিবারিক অশান্তিও গ্যাং তৈরির কারণ হতে পারে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। প্রথম পৃষ্ঠা

এমন অপরাধ দমনে বিশ্লেষকরা যা বলছেন : অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দুর্নীতি, অপরাধ ও অপরাধের নানা উপাদান রয়েছে, কিশোররা তার বাইরে নয়। পারিবারিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে। এলাকায় খেলার মাঠ নেই। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তারকাখ্যাতি, হিরোইজম, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্বতা, অর্থলোভ। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পারিবারিক শিক্ষার অভাবও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আবার মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত অনেকেই নিজের সামান্য লাভের জন্য কিশোরদের অপরাধজগতে টেনে নেন। অপরাধমূলক কর্মকাÐে কিশোরদের ব্যবহার করেন। কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোর গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পর্যায়ক্রমে আলাদা আলাদা গ্রæপ তৈরি করে। তাদের ড্রেস কোড থাকে, আলাদা হেয়ার স্টাইল থাকে, তাদের চালচলনও ভিন্ন। তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। তারা নানা অপরাধমূলক কর্মকাÐে জড়িয়ে পড়ে। নানাভাবে তারা অর্থ সংস্থানের চেষ্টা করে। এলাকার কোনো ‘বড় ভাই’র সহযোগী শক্তি হিসেবেও তারা কাজ করে। তারা বলছেন, এখন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও অপরাধে জড়াচ্ছে। সঠিক ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে কিশোরদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা তৈরি হচ্ছে। এগুলো প্রশমিত না হওয়ায় তারা নানা ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব কারণ বিশ্লেষণ করে সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কিশোর অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। তারা বলছেন, পরিবারের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে কিশোরদের গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। শিশু কিশোরদের জন্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা এবং তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থাকতে হবে। কিশোরদের সমাজের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাও এ কালচার গড়ে ওঠার পেছনে কিছুটা দায়ী। যেমন- দুর্বল ছাত্রদের মধ্যে গ্যাং গড়ে তোলার প্রবণতা থাকে। ক্রমাগত শিক্ষকের বঞ্চনা, খারাপ ফলাফল, সহপাঠী দ্বারা বিদ্রæপের শিকার থেকে হতাশা তৈরি হতে পারে। হতাশা থেকে পরে গ্যাংয়ে যোগদানের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। স্কুলের পাঠদান প্রক্রিয়া কোনো কারণে ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জাগ্রত হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে মাদককে কেন্দ্র করে আড্ডা ইত্যাদি তৈরি হয়, যা থেকে গ্যাংয়ের উদ্ভব হতে পারে। বন্ধু-বান্ধবের যদি অপরাধপ্রবণতা থাকে বা তারা অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে, মাদক সেবনের প্রবণতা থাকে বা মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এভাবে জড়িত হওয়ার কারণের মধ্যে আরও রয়েছে- ব্যক্তি পর্যায়ে অপরাধ জগতে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা, দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিত্ব, হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা, অনুকরণপ্রবণতা, অল্প বয়সে যৌন আসক্তি বা যৌন আসক্তি হওয়ার ক্ষেত্র ও সুযোগ তৈরি হওয়া।


ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading