দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী : কী ঘটতে যাচ্ছে ইন্ডিয়ার রাজনীতিতে
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০২৪, আপডেট ২১:১৫
আবগারি দুর্নীতি মামলায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ইন্ডিয়ার রাজধানী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করে ইন্ডিয়ার ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে দেশটির বিরোধীদলীয় নেতারা। তাদের মধ্যে ইন্ডিয়া জোট থেকে স¤প্রতি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অনেক নেতাও রয়েছেন। এ ঘটনায় দেশটির জনগণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ‘বিপ্লব’ করতে পারে বলে সতর্কও করেছেন কিছু নেতা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেজরিওয়ালের গ্রেফতার নিয়ে ইন্ডিয়ার বিরোধীরা আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার (২২ মার্চ) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এই খবর জানিয়েছে।
ইন্ডিয়ার লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করার ঘটনা দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কেননা, ভারতের ইতিহাসে কেজরিওয়ালই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি পদে থাকাকালীন গ্রেফতার হলেন। প্রয়োজনীয় নথি দেখিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে ইডির ১২ জন সদস্য। এসময় তার বাড়ির সামনে বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিকে ইডি জানিয়েছে, আবগারি মামলায় এএপি প্রধানকে নয় বার সমন পাঠানো হয়। কিন্তু আটবারই হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি। শেষ পাঠানো সমনে বৃহস্পতিবারই ইডি দফতরে হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর। তবে দুর্নীতির অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছে এএপি প্রধান। হাজিরা না দিয়ে নিরাপত্তা চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন কেজরিওয়াল। তবে হাইকোর্ট কোনও সুরক্ষা না দেওয়ায়, শেষে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন তিনি।
আম আদমি পার্টির পরিকল্পনা কি: কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির (এএপি) এক মুখপাত্র বলেছেন, একটি ‘বোগাস মামলা’ নিয়ে মোদি ‘নোংরা রাজনীতি’ করছেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, তাদের দলনেতা পদত্যাগ করবেন না। বরং ‘কারাগারে থেকেই সরকার চালাবেন।’ দিল্লির আবগারি দুর্নীতি মামলায় কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করা হয়। দিল্লি সরকারের ২০২১-২২ সালের আবগারি নীতি বেশ কিছু মদ ব্যবসায়ীকে সুবিধা করে দিচ্ছিল। এই নীতি প্রণয়নের জন্য যারা ঘুষ দিয়েছিলেন, তাদের সুবিধা করে দেওয়া হয়েছিল বলে তার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আল জাজিরাকে এক বিবৃতিতে দিল্লির স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং কেজরিওয়ালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৌরভ ভরদ্বাজ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যা ইচ্ছা করতে পারেন। এখন পর্যন্ত দুইজন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করেছে তারা এবং আরও মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করতে পারে।’ গত মাসে হেমন্ত সোরেনকে গ্রেফতার করেছিল ইডি। দুর্নীতির অভিযোগে ঝাড়খÐ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টা পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এএপি এবং কংগ্রেসের মতো সোরেনের দল ঝাড়খÐ মুক্তি মোর্চাও ভারতের বিরোধী জোটের অংশ। এটি আসন্ন নির্বাচনে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ২০১১ সালে আম আদমি পার্টি (এএপি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কেজরিওয়াল। ২০১৫ সালে ২০২০ সালে মোদির শক্তিশালী দল বিজেপির বিরুদ্ধে লড়েইয়ে তুমুল নির্বাচনী জয় পেয়েছিলেন তিনি। ৭০ সদস্যের বিধানসভা নির্বাচনে ২০১৫ সালে ৬৭ এবং ২০২০ সালে ৬২টি আসন জিতেছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি কোন পথে: কিছু বিশ্লেষক বলছেন, কেজরিওয়ালের গ্রেফতারের ঘটনাটি মোদি এবং বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। কেননা, সম্ভাব্যভাবে লক্ষ্যবস্তু করা নেতাদের প্রতি জনগণের সহানুভ‚তি তৈরি হয়ে থাকে। এমনকি এই ঘটনার পর যৌথ হুমকি মোকাবিলায় বিভক্ত বিরোধীরা বৃহত্তর ঐক্য গঠনও করতে পারেন। কেজরিওয়ালকে গ্রেফতারের পরপরই তার বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন আম আদমি পার্টির সমর্থকরা। এসময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তিও হয়। দিল্লিজুড়েই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ শুরু করেন তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। শত শত বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দিয়ে বলেছিলেন ৩৪ বছর বয়সী এএপি কর্মী দেবেন্দর সিং। আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন ‘এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য অশোভন। একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী জনসম্মুখে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মোদির মনে কি চলছে?’ তিনি আরও বলেন, বিরোধীদের উইচহান্টের’ শিকার বানিয়েছে সরকার, যারা যেকোনও বিকল্পকে ভয় পায়। রাজনৈতিক ভাষ্যকার অসীম আলি বলেছেন, কেজরিওয়ালের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে মোদি সরকার শুধু নিজেকে কর্তৃত্ববাদী এবং অহংকারী হিসেবেই উপস্থাপন করছে না, বরং বিজেপি এবং এএপি-র মধ্যে কাকে ভোট দিবে-এমন সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ভোটারদেরও হাতছাড়া করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ওই সব ভোটারদের এখন ‘সহানুভ‚তিবশত এএপিকে সমর্থন করতে পারে। এমনকি কংগ্রেসকেও ভোট দিতে পারে তারা।’

রাহুল গান্ধী
কী বলছেন বিরোধী নেতারা: কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তার ঘিরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এক্স-এ লিখেছেন, শাহেনশাহ ভয় পেয়ে গেছেন। তিনি একটা মৃত গণতন্ত্র চান। মিডিয়াসহ সব সংস্থাকে কবজা করার পর, দলগুলোকে ভাঙা হচ্ছে, প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হচ্ছে। তারপরেও অসুর-শক্তি থামেনি। এখন তারা নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করছে। রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াংকা গান্ধী বলেছেন, কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তার অন্যায় ও অসাংবিধানিক। অন্যদিকে সমাজবাদী পার্টি নেতা রাহুল গান্ধীর টুইটের জবাবে বলেছেন, বিজেপি হটাও, দেশ বাঁচাও। দেশটির সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, বিজেপি অনেকদিন ধরে পরিকল্পনা করছিল। সুযোগ পেলেই তারা যে গ্রেপ্তার করবে তা বোঝা যাচ্ছিল। বিজেপি বুঝতে পারছিল, আপ তাদের পক্ষে যাবে না। আপকে নিয়ে তাদের সুবিধা হচ্ছে না। তাই এভাবে তাকে গ্রেপ্তার করল। যারা বিজেপিকে সাহায্য করছে, তাদের জন্য সব ঠিক আছে। সাহায্য না করলে এটাই করছে। তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ওব্রায়েন বলেছেন, আমরা কেজরিওয়ালকে গ্রেপ্তারের নিন্দা করছি। তিনি একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী। এখন নির্বাচন কমিশনই প্রশাসনের দায়িত্বে এবং আদর্শ আচরণবিধি চালু আছে। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেছেন, লোকসভা নির্বাচন হার হবে জেনে বিজেপি এখন মরিয়া হয়ে কামড় দিচ্ছে। এজেন্সি দিয়ে অবিজেপি নেতাদের গ্রেপ্তার করা, তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চক্রান্ত চলছে। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, যতই করো কান্নাকাটি, মাফলারের পর হাওয়াই চটি। কেজরিওয়াল মাফলার ম্যান বলে পরিচিত। আর মমতা বন্দোপাধ্যায়কে হাওয়াই চটি নিয়ে নিয়মিত কটাক্ষ করে বিজেপি। বিজেপি নেতা রবিশংকর প্রসাদ বলেছেন, উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাদের আদালতও কোনো রেহাই দিচ্ছে না। আমরা একটা কথাই বলব, আইনকে নিজের কাজ করতে দেওয়া উচিত। এটা শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
ইউডি/এজেএস

