জলাবদ্ধতা: ভোগান্তির শেষ কোথায়?

জলাবদ্ধতা: ভোগান্তির শেষ কোথায়?

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১১:৫৫

দীর্ঘদিনের সমস্যা ভয়ঙ্কর রূপ: রাজধানীতে জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। এখনো অল্প বৃষ্টিতেই বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায় হাঁটু সমান। সামান্য বৃষ্টি হলে ঢাকার কম করে হলেও দেড়শ’ জায়গায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। তবে জলাবদ্ধতা এখন শুধু রাজধানীর সমস্যা না; বরং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও দেখা দিচ্ছে এ সমস্যা। রাজধানীতে শুক্রবার (১২ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত যে তুমুল বর্ষণ হয়েছে, তাতে ডুবে গেছে উঁচু-নিচু বিভিন্ন সড়ক এবং পাড়া মহল্লার অলি-গলি। তাতে গন্তব্যে পৌঁছাতে ঘরের বাইরে পা দেওয়া মানুষেরা নাকালতো হয়েছেনই, রাস্তা উপচে ময়লা পানি ঢুকেছে বাজারে, দোকানে এমনকি অনেক বাসাবাড়িতেও। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় আছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি থেকে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। যার কারণে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা গণমাধ্যমকে বলেন, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির কারণে রাজধানীর কাকরাইল, মোহাম্মদপুর, শ্যাওড়াপাড়া, কাজীপাড়াসহ মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং মিরপুরে মাজার রোড, অ্যালিফেন্ট রোড, মৎসভবন, সেন্ট্রাল রোড, ধানমøির ২৭ নম্বর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেইট, তেজগাঁও, বিজয় সরনী, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, তেজকুনি পাড়া, দক্ষিণ মনিপুরের মোল্লাপাড়া, মহাখালীর বিভিন্ন রাস্তায় পানি জমেছে। ওয়াসা থেকে সিটি করপোরেশন খালগুলো বুঝে পাওয়ার পর কিছু এলাকায় সমস্যার সমাধান হলেও এখনো জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়নি মানুষ। দুই সিটি করপোরেশন বলছে, কিছু কিছু এলাকায় এখন বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলমান। যার কারণে ড্রেনগুলো দিয়ে পানি সড়তে না পারায় পানি জমে থাকছে। অন্যদিকে, স্থায়ীভাবে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে পরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে। তবে এসব এলাকায় কুইক রেসপন্স টিম কাজ করে।

জলাবদ্ধতার কারণে নগরীতে ভোগান্তি ও হয়রানি যেন এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর এ কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হলেও এর বাস্তব কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে জলাবদ্ধতার চিত্র। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় শহরের দুই-তৃতীয়াংশ স্থান এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জলমগ্ন থাকে বিভিন্ন সড়ক ও জনপদ। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, জলাবদ্ধতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ না করলে অল্প বৃষ্টিতেই আরো অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। এ জলাবদ্ধতায় সৃষ্টি হবে নগর বন্যা। এজন্য প্রয়োজন যথাশিগগির স্থায়ী প্রতিকার এবং সুপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প। আমাদের সবার দায়িত্ব নিষ্ঠাই এ জলাবদ্ধতা ও সড়কডুবি সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারবে। প্রয়োজনে পানি নিষ্কাশনের জন্য ওয়াসা, সিটি করপোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একত্রে কাজ করতে হবে। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য প্রাকৃতিক আঁধারগুলোকে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। এজন্য নদী-খাল দখলমুক্ত করে পানি নিষ্কাশনের সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করারও প্রয়োজন রয়েছে।

পানি নিষ্কাশনে বাধা নেপথ্যে যত কারণ: ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় ঘাটতি। পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খালগুলো অবৈধ দখল ও কঠিন বর্জ্যে ভরাট থাকা। নগরের খাল, ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও ব্রিক স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে পানি নদীতে যেতে পারে না। ড্রেনেজ সিস্টেমেও সমস্যা রয়েছে। যেখানে সহজেই পানির সঙ্গে বিভিন্ন বর্জ্য যেমনÍপলিথিন এবং অন্যান্য অপচনশীল পদার্থ ভেসে গিয়ে নালার মধ্যে আটকে যায়, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। এতদিন ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার ওপর। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশনকে এ দায়িত্ব দেয়। ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, গত এক যুগে জলাবদ্ধতা নিরসনে কমপক্ষে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর সিটি করপোরেশন পানি নিষ্কাশনের জন্য কয়েকটি খালকে আবর্জনামুক্ত করে পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করে। তাছাড়া কয়েকটি বক্স কালভার্ট থেকেও বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কিন্তু এতে কয়েকটি এলাকায় কিছুটা সুফল হলেও ভারি বৃষ্টিপাতে তেমন কোনো কাজে আসে না। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এখন কাগজে-কলমে মাত্র ২৭টি খাল রয়েছে। একসময় এই খালের সংখ্যা ছিল ১১৭টি। বৃষ্টির পানি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা না থাকলে পানি তো জমবেই। সূত্রে জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বৃষ্টির পানি সরানোর জন্য আছে ২৫ হাজার কিলোমিটার খোলা ড্রেন এবং ৪ হাজার কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ড্রেন। কিন্তু এসব ড্রেন পরিষ্কার থাকে না। ৪০ ভাগেরও বেশি ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে এসব ড্রেনে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকায় প্রতিদিন ১৫ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ এসব ড্রেনে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, ঢাকায় কংক্রিটের স্থাপনা আছে ৮৫ ভাগের মতো। এর ফলে ৯০ ভাগ পানি ড্রেনে চাপ সৃষ্টি করে এবং এ চাপ নেওয়ার মতো অবস্থা ড্রেনগুলোর নেই। অর্থাৎ খুব সহজেই বুঝা যাচ্ছে, স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। আর এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে আমাদের দ্বারাই। উন্নয়নের বিভিন্ন প্রয়োজনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পানি সরতে পারছে না। ড্রেন যা আছে, তা-ও কার্যকর নয়। বক্স কালভার্টের গভীরতা ছিল যেখানে ৯ থেকে ১১ ফুট, এখন তা আছে মাত্র দেড় থেকে ২ ফুট। এসব সমস্যা দেখার যেন কেউ নেই! বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারির (২০২২) প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, রাজধানী ঢাকায় ১ কোটি ২ লাখেরও বেশি মানুষ বসবাস করে। জলাবদ্ধতা মানুষের জীবনে নানাভাবে দুর্ভোগ তৈরি করে; চলাচলের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। জলাবদ্ধতা অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরে জলাবদ্ধতার কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এখন এই ক্ষতির পরিমাণ তো আরো বেশি।

ঢাকার দুই নগর কর্তৃপক্ষ যা বলছে: দুই সিটি করপোরেশনেরই দাবি-রাজধানীর কোথায় কোথায় জলাবদ্ধতা হয়, তারা জানে। এ নিয়ে বছরব্যাপী তাদের কর্মযজ্ঞও চলে। তবু বৃষ্টি এলেই দুর্ভোগে পড়েন মানুষ। জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন-ডিএনসিসি’র কাজ করছে ‘কুইক রেসপন্স’ টিম। শুক্রবার ৫ হাজারেরও বেশি পরিচ্ছন্নতা কর্মী কাজ করেছে। ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকার ১০টি অঞ্চলে ১০টি কুইক রেসপন্স টিম কাজ করেছে। যারা বিভিন্ন ক্যাচমেন্ট এলাকায় কাজ করছে। কিন্তু, অসুবিধা হচ্ছে যেসব পয়েন্ট থেকে আমরা ড্র্বেইনেজ সিস্টেম পরিষ্কার করি, সেই পয়েন্টগুলোতে মানুষ বিভিন্ন ধরণের আবর্জনা ফেলায় এলাকাভিত্তিক জলাবদ্ধতা নিরসনে সময় লাগছে। তবে বড় সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা কমেছে। এছাড়া কোথাও কোনো পানি জমে থাকলে ডিএনসিসির হটলাইন ১৬১০৬ এই নম্বরে ফোন করার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও।

পানি নিষ্কাশনে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও। দক্ষিণের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের গণমাধ্যমকে বলেন, পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০০টি টিম কাজ করছে। এছাড়া দোলাইর পাড় ও কমলাপুরে পাম্প চালু আছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, সরকারের অন্যান্য সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন চলমান থাকায় বর্তমানে কমলাপুর ও গ্রিন রোড এলাকার (মূলত অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চলমান উন্নয়নকাজ) মতো সুনির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে এবং নিউ মার্কেট এলাকা (বিজিবি কর্তৃক ২০০৯ সালে একটি পানি নিষ্কাশন নর্দমা বন্ধ করে দেওয়ায় ও ওয়াসা কর্তৃক আরেকটি নর্দমার মধ্য দিয়ে সুপেয় পানির সরবরাহ পাইপ স্থাপন করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে), পুরান ঢাকা এবং শহরের গুটিকয়েক এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও জলাবদ্ধতা হয় না। অন্য এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ড্রেন নির্মাণ করে তার পর রাস্তা নির্মাণ হবে। আগে কখনো পরিকল্পিতভাবে ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণ হয়নি। নভেম্বরের মধ্যে নতুন ওয়ার্ডের রাস্তা ও ড্রেনেজের কাজ সম্পন্ন হবে। জলাবদ্ধতার সমস্যা স্থায়ী সমাধান হবে।

চট্টগ্রাম-বরিশাল-সিলেট সিটিতেও একই রূপ: সম্প্রতি ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামে অঞ্চলেও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পুরো বান্দরবান জলাবদ্ধতার কারণে দেশ থেকে এক রকমের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলা শহরটির অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। মূলত সাঙ্গু নদীর পানিতে পার্বত্য এলাকাগুলো ডুবে গেছে। চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রামের সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী জলাবদ্ধতার জন্য দুষলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ)।

রেজাউল বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন খালে বাঁধ দিয়েছে সিডিএ। বর্ষার আগে বাঁধ সরিয়ে নেয়ার তাগিদ দিলেও কর্ণপাত করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া চট্টগ্রামে যেসব প্রকল্প হচ্ছে সেগুলোর পরিবেশগত সম্ভাব্যতাও যাচাই করেনি তারা। বাঁধ-প্রকল্প সব জায়গায় ত্রুটি থাকায় ভুগতে হচ্ছে বন্দরনগরীকে। মেয়র যখন দায় চাপাচ্ছেন সিডিএর ওপর, সেখানে সিডিএ আবার সংবাদ সম্মেলন করে দায় চাপাচ্ছেন সিটি করপোরেশনের ওপর। সম্প্রতি সিডিএ চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সব দোষ সিডিএর ওপর চাপানো হচ্ছে। সিটি করপোরেশন শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি করেনি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কাজ পারে না বলে সরকার সিডিএকে কাজ দিচ্ছে। পানি উঠেছে ঠিকই; কিন্তু আগের মতো পানি ওঠেনি। সিডিএ এবং সিটি করপোরেশন যখন কাঁদা ছোড়াছুড়ি করছে তখন ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করছেন চট্টগ্রামবাসী। বাসাবাড়িতে পানি ওঠায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ। রান্নাঘরে পানি ওঠায় বন্ধ থাকছে চুলা, অনেকে দিন কাটাচ্ছেন খেয়ে না খেয়ে। এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডুবে যাওয়ায় এবং মার্কেট বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

চট্টগ্রামের মতোই অবস্থা বরিশাল বিভাগের। একদিনের বৃষ্টিতে বিভাগীয় শহরে পানি জমে মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের পানি শহরে প্রবেশ করায় ডুবে গেছে শহরের ৯০ শতাংশ। বিশেষ করে ভাটিখানা, গোরস্থান রোড, সার্কুলার রোড, নবগ্রাম রোড এবং অক্সফোর্ড মিশন রোডের অবস্থা বেশি ভয়াবহ। নগরবাসীরা বলছেন, এ কয়দিনের বৃষ্টিতে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে তা আগে কোনোদিন হয়নি।

বরিশাল বিভাগের বাইরে সিলেট বিভাগেও একই অবস্থা। গতমাসে মাত্র দুদিনের বৃষ্টিতে ডুবে গিয়েছিল সিলেট। সড়কে জাল ফেলে মাছ ধরা কিংবা রাস্তা বন্ধ করে প্রতিবাদ জানানো থেকে সবকিছুই করেছেন সিলেটবাসী। কিন্তু তাতে করে কাজের কাজ এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।
শুধু সিলেট নয়, পানি উঠে গৃহবন্দি হয়েছেন সুনামগঞ্জের কয়েক লাখ মানুষ। এছাড়া ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা ও যশোর এলাকার মতো অনেক অঞ্চল যেখানে আগে জলবদ্ধতা দেখা যায়নি, সেসব এলাকায়ও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।
এত অল্প বৃষ্টিতে কেন এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো জানতে চাইলে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত প্রকল্প এবং খারাপ ড্রেনেজ ব্যবস্থা এমনভাবে বিস্তার পেয়েছে যে জলাবদ্ধতার সমস্যা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ঢাকার থেকে অন্যান্য জেলার অবস্থা বেশি খারাপ। ঢাকা নিয়ে অনেক কথা হয়, এসব জেলা নিয়ে তাও হয় না।

জলাশয় ভরাটের প্রবণতা থেকে বের হতে হবে: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারসের (বিআইপি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ৯ বছরে ঢাকার মহানগর ও এর আশপাশে কমপক্ষে ৩ হাজার ৪৮৩ একর জলাশয় এবং নিম্নভূমি ভরাট হয়েছে এবং ২০১০ সালে প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঢাকার ৩৬ শতাংশ জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করা হয়েছে, যা জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম একটি কারণ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের আসলে উন্নয়নের পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে গেছে। এই উন্নয়ন হচ্ছে ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন৷ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, আমাদের ঢাকা শহরে খাল বা জলাশয় এখন ৫ শতাংশের নিচে। আর সবুজ ৭ ভাগের নীচে৷ ফলে, পানি নিষ্কাশনের সুযোগ নেই। যদি, জলাশয় ভরাট করা না হত এবং পর্যাপ্ত সবুজ থাকত, তাহলে হয়ত এমন চিত্র হত না। তিনি আরও বলেন, কংক্রিট নিয়ে আমরা একটা গবেষণা করেছিলাম, যেখানে ঢাকার উন্নত এলাকাগুলোতে ৮০ শতাংশের উপর কংক্রিট। কোথাও-কোথাও ৯০ শতাংশ। ফলে, পানি নিষ্কাশনের সুযোগ নেই। এই জলাবদ্ধতা আমাদের মেনে নিতেই হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, আমরা যেটা করতে পারি, যে ড্রেনেজ সিস্টেম এবং জলাশয় অবশিষ্ট আছে, সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা করে জলাশয় ভরাট করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকায় বৃষ্টির পর ৬০-৭০ শতাংশ পানিই ‘রানঅফ বা ভূ-উপরিস্থিত পানি’ হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এ ‘রানঅফ বা ভূ-উপরিস্থিত পানি’ দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য যে ধরনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা খাল-নালা থাকার কথা তার ধারেকাছেও আমাদের নেই। আর যা আছে তাও ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে জলাবদ্ধতা এখানে অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে দায়ী আরেকটি জিনিস হচ্ছে বাঁধ। আব্দুল্লাহপুর থেকে শুরু করে ঢাকার পুরো পশ্চিমাঞ্চল শহর রক্ষা বাঁধ দিয়ে ঘেরা। ফলে পশ্চিমে পানি যাওয়ার মূল রাস্তা মূলত দুটি গোড়ান চাটবাড়ী ও কল্যাণপুর পাম্প স্টেশন। কিন্তু এ দুটি পাম্প স্টেশনে পানি পৌঁছার মতো পর্যাপ্ত পথও নেই। একভাবে পাম্প স্টেশনের সামনে পানি সাময়িক জমা হওয়ার জন্য জলাধার দুটিও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যাতে পানি শহরের ভেতরে জমে থাকা ছাড়া উপায় নেই। তারা বলছেন, ঢাকা ওয়াসার হাত ঘুরে জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব গেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিতে চাই। শহরের যেসব স্থানে বৃষ্টিতে পানি বেশি জমে, সেসব স্থানের অধিকাংশতেই দেখা গেছে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও হকার বসে। তারা একদিকে রাস্তার প্রায় অর্ধেক অংশ দখল করে যানজট বাড়িয়ে তোলে, অপরদিকে নানা আবর্জনা ফেলে রাস্তা নোংরা করে। পুলিশসহ প্রশাসনের উচিত এ ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নেওয়া। সব পক্ষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা ছাড়া ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়।

এই প্রতিবেদনটি লিখেছে মো. শহীদ রানা, আরিফ হোসেন, আশিকুর রহমান, আরেফিন বাঁধন, পারভেজ আহমেদ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading