ইন্ডিয়ার দুই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন : জম্মু-কাশ্মীরে মোদির ‘স্বপ্ন’ ভঙ্গ!

ইন্ডিয়ার দুই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন : জম্মু-কাশ্মীরে মোদির ‘স্বপ্ন’ ভঙ্গ!

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ০৯ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৬:২০

প্রত্যাখ্যাত হলো ‘কাশ্মীর নীতি’

আসাদ এফ রহমান: ইন্ডিয়ার দুই রাজ্য হরিয়ানা ও জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটের ফলাফল প্রকাশ করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। সেই ফলাফল বলছে, হরিয়ানায় জিতলেও জম্মু-কাশ্মীরে পরাজিত হয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। পাঁচ বছর ধরে নানা চেষ্টা সত্তে¡ও সেখানে ক্ষমতায় আসতে পারল না কেন্দ্রের শাসক দল। ফলে, সেখানে নরেন্দ্র মোদির ‘কাশ্মীর নীতি’ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হলো। মুসলিম প্রধান এই রাজ্যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে জম্মু-কাশ্মির ন্যাশনাল কনফারেন্স (জেকেএনসি)। ক্ষমতায় আসতে চলেছে ন্যাশনাল কনফারেন্স (এসি), কংগ্রেস ও সিপিএমের জোট। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভার ৯০টি আসনের মধ্যে ৪২টি আসন জিতেছে ফারুক আবদুল্লাহ এবং তার ছেলে ওমর আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন দল জেকেএনসি। বিজেপি পেয়েছে ২৯টি আসন এবং কংগ্রেস ৬ আসনে জয় পেয়েছে। বাকি আসনে জয়ী হয়েছে অন্যরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, জম্মু-কাশ্মীরে প্রয়োজনীয় ৪৬টি আসনে জয় না পেলেও সরকার গঠনে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না ন্যাশনার কনফারেন্সকে। কারণ জেকেএনসি এবং কংগ্রেস উভয়ই বিজেপিবিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’র শরিক দল।

অন্যদিকে, হরিয়ানায় ৯০ টি আসনের মধ্যে ৪৯টি আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। যেখানে সরকার গঠনে প্রয়োজন ৪৬টি আসন। এই রাজ্যে কংগ্রেস জয় পেয়েছে ৩৬টি আসনে, বাকি ৫টি আসনে জয়ী হয়েছে অন্যান্য দল। বুথফেরত জরিপগুলো কংগ্রেসকে আশা দেখালেও রাজ্যের মানুষ শেষ পর্যন্ত ভরসা রেখেছে বিজেপিতেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, নরেন্দ্র মোদীকে চিন্তায় রাখবে জম্মু-কাশ্মীরের ব্যর্থতা। প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে তার কাশ্মীর নীতিকে। দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক স্তরেও। কারণ, এই ভোট এক অর্থে ছিল ৩৭০ অনুচ্ছেদ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণভোট। মোদি এই রাজ্যকে এনসি, কংগ্রেস ও পিডিপির হাত থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তার সেই ইচ্ছাও ব্যর্থ হলো। জম্মু-কাশ্মীরের ভোটের ফল মোদি সরকারের কাশ্মীর নীতি অসাড়ত্ব প্রমাণ করে দিল। সাবেক এই রাজ্যের জনগণ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন, যে লক্ষ্যে পাঁচ বছর আগে বিজেপি এই রাজ্য দ্বিখণ্ডিত করেছিল, সংবিধান প্রদত্ত ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিশেষ মর্যাদা খারিজ করেছিল, পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সৃষ্টি করেছিল, জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই অর্থে এই ফল নিশ্চিতভাবে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে গণভোট।

অথচ কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেনি। লোকসভা ও বিধানসভার কেন্দ্রগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে সাতটি আসন বাড়িয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ৬টি হিন্দু প্রধান জম্মুতে, মুসলমান প্রধান কাশ্মীর উপত্যকায় মাত্র ১টি। দুই অঞ্চলের আসনের মধ্যে যেখানে ৯ আসনের ফারাক ছিল, তা কমিয়ে করা হয় ৪টি। শুধু তা–ই নয়, আইন করে উপরাজ্যপালকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিধানসভায় পাঁচজনকে মনোনীত করার, যাঁদের মধ্যে তিনজন থাকবেন নারী। মন্ত্রিসভাকে এড়িয়ে সেই মনোনয়নের চেষ্টা গতকাল সোমবার রাতেই শুরু হয়, যার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার হুমকি দিয়েছে এনসি। এত চেষ্টা সত্তে¡ও এনসি-কংগ্রেস জোট তর্কাতীতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে। এই ফল মোদির কাশ্মীর নীতির পরাজয় ছাড়া আর কিছু নয়।

নানা ফন্দিফিকিরের পরও বিজেপি’র হিসেব-নিকেশ ওলট-পালট

শহীদ রানা: জম্মু-কাশ্মিরে জেকেএনসি’র ফলাফলকে ‘মহাকাব্যিক’ বলে উল্লেখ করেছেন ইন্ডিয়ার অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক। কারণ ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ইন্ডিয়ার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মিরের স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যের মর্যাদা বাতিল করে নয়াদিল্লিতে আসীন কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জম্মু-কাশ্মিরজুড়ে বিক্ষোভ ডেকেছিল জেকেএনসি। সে সময় দলটির অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহও দীর্ঘদিন গৃহবন্দি ছিলেন। সেই অবস্থা কেটে যাওয়ার পর এ জয়কে জেকেএনসির বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

ওমর আবদুল্লাহ

৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর এই প্রথম জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই নির্বাচন জিততে চেয়েছিল বিজেপি। জম্মু-কাশ্মীরে সরকার গঠন করা ছিল বিজেপির স্বপ্ন। তাই এই রাজ্যে নিজেদের সুবিধার জন্য রাজ্য দ্বিখøকরণ, নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোর পুনর্বিন্যাস, হিন্দু এলাকার আসন বৃদ্ধিসহ নানা ফন্দিফিকির করেন নরেন্দ্র মোদি। তাই অনেকে বলছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের এই ভোট নরেন্দ্র মোদির অগ্নিপরীক্ষা। নানা হিসেব নিকেশ ও সমীকরণ মিলিয়ে বিজেপির জন্য কিছুটা আশাও হয়ত তৈরি করতে পেছিলেন তিনি। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনী ফলাফলে বিজেপিকে হতাশ হতেই হল।

পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরে পাবে জম্মু-কাশ্মীর? : প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার কি জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে? এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এখন ইন্ডিয়ার এই রাজ্যের সাধারণের মুখে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো নেই। বরং এমন শঙ্কা দেখা দিচ্ছে, যেভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেন্দ্রশাসিত দিল্লি উপরাজ্যপাল মারফত শাসিত হচ্ছে, জম্মু-কাশ্মীর ঠিক সেভাবেই শাসিত হবে। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পৌরসভার চেয়ারম্যানের বেশি হবে না। কাশ্মীর উপত্যকায় এনসি-কংগ্রেস-সিপিএম জোট এবং পিডিপির প্রাধান্য খর্ব করতে বিজেপি অন্য ব্যবস্থাও করেছিল। যেমন, বিচ্ছিন্নতাবাদী জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদকে আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি) গঠনে মদদ, জামায়াতে ইসলামীকে স্বতন্ত্রভাবে ভোটে দাঁড়াতে উৎসাহিত করা এবং গুলাম নবি আজাদ ও আলতাফ বুখারির দলকে খোলামেলা সমর্থন করা।

বিজেপি উপত্যকায় মাত্র ১৯ কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্তু ফল দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির প্রতিটি কৌশল উপত্যকার মানুষ ব্যর্থ করেছে। প্রবল সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়েছে এনসি-কংগ্রেস জোটের পক্ষে। একদা প্রবল প্রতাপান্বিত দল পিডিপিও এই ভোটে চ‚ড়ান্তভাবে ব্যর্থ। বোঝা গেল, ২০১৪ সালের ভোটের পর বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে তাদের সরকার গড়া উপত্যকার মানুষ মেনে নেয়নি।

হরিয়ানায় বিজেপি’র হ্যাটট্রিক, কংগ্রেসের আশায় গুড়েবালি

সাদিত কবির : টানা এক দশক ক্ষমতায় থাকার পরেও ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া’ অতিক্রম করে হরিয়ানায় আবার নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি। কৃষক আন্দোলনের আঁচ, বিনেশ ফোগাটের ‘বঞ্চনা’, বিজেপি নেতা ব্রিজভ‚ষণ শরণ সিংহের বিরুদ্ধে হরিয়ানার কয়েক জন মহিলা কুস্তিগিরের তোলা যৌন নিগ্রহের অভিযোগ, চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগের ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প ঘিরে ক্ষোভের ছায়া পড়েনি হরিয়ানার বিধানসভা ভোটের ফলে। এর পেছনে পদ্মশিবিরের নিপুণ ‘বুথ লেভেল ম্যানেজমেন্ট’-এর পাশাপাশি জাতপাতের অঙ্কেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। হরিয়ানায় ৯০ টি আসনের মধ্যে ৪৯টি আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। যেখানে সরকার গঠনে প্রয়োজন ৪৬টি আসন। এই রাজ্যে কংগ্রেস জয় পেয়েছে ৩৬টি আসনে, বাকি ৫টি আসনে জয়ী হয়েছে অন্যান্য দল। বুথফেরত জরিপগুলো কংগ্রেসকে আশা দেখালেও রাজ্যের মানুষ শেষ পর্যন্ত ভরসা রেখেছে বিজেপিতেই। হরিয়ানার বিধানসভায় গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি।

রাহুল গান্ধী

২০২১ সালের কৃষক আন্দোলনকে ঘিরে অবশ্য রাজ্যে দলটির ভাবমূর্তি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই এই নির্বাচনে ভোটাররা সদয় হবেন কি না-তা নিয়ে সংশয় ছিল বিজেপির। ফলাফল প্রকাশের পর সেই সংশয় কেটে গেছে। ২০১৪ সালে ৪৭টি আসনে জিতে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা ক্ষমতা দখল করলেও ২০১৯-এ বিজেপির আসন ৪০-এ নেমে গিয়েছিল। সরকার গড়তে আইএনএলডি-ছুট দুষ্মন্ত চৌটালার দল জননায়ক জনতা পার্টি (জেজেপি)-র উপর নির্ভর করতে হয়েছিল তাদের। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, ইন্ডিয়ার উত্তর ও মধ্য হরিয়ানার জাঠ প্রভাবিত অঞ্চলে কংগ্রেস ভাল ফল করলেও দক্ষিণে অ-জাঠ অঞ্চলে বড় জয় পেয়েছে বিজেপি। ভাল ফল করেছে রাজ্যের পশ্চিম অংশেও। পরিসংখ্যান বলছে, হরিয়ানায় জাঠ ভোট প্রায় ২৭%, দলিত (এসসি) ২১%, অন্যান্য অনগ্রসর (ওবিসি) প্রায় ৩৩%। জাঠ ভোট কংগ্রেস, আইএনএলডি, জেজেপির মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে।

টানা হারলেও ভোট-আসন বেড়েছে কংগ্রেসের: টানা তিন বার ভোটে হারলেও কংগ্রেসের ভোট এবং আসন দু’টিই বেড়েছে হরিয়ানায়। ২০০৪ থেকে টানা এক দশক ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস ২০১৪-য় হরিয়ানার ভোট এবং আসনসংখ্যার হিসাবে তৃতীয় স্থানে নেমে গিয়েছিল। সাড়ে ২০ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছিল মাত্র ১৫ আসনে। ২৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯ আসনে জিতে দ্বিতীয় হয়েছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমপ্রকাশ চৌটালার আইএনএলডি। ২০১৯ সালের বিধানসভা ভোটে ২৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ৩১টি আসনে জিতে দ্বিতীয় হয়েছিল কংগ্রেস। এ বার আসনসংখ্যায় বিজেপির তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও ভোট শতাংশের হিসাবে কংগ্রেস প্রায় তুল্যমূল্য। সে রাজ্যে রাহুল গান্ধী-মল্লিকার্জুন খড়গের দলের ঝুলিতে গিয়েছে প্রায় ৩৯.১ শতাংশ ভোট। বিজেপি প্রায় ৩৯.৯ শতাংশ। অর্থাৎ, দু’দলের ব্যবধান এক শতাংশেরও কম। অন্য দিকে আপ পৌনে ২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে।

বিরোধী ঐক্যে ফাটলের পেছনে আপ!

আরাফাত রহমান : ইন্ডিয়ার হরিয়ানায় কংগ্রেসের আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন আম আদমি পার্টি (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরীওয়াল। বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে কার্যত নিশ্চিত করলেন সে রাজ্যে টানা তিন বার বিজেপির ক্ষমতায় আসা। মঙ্গলবার ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমনই কথা বলছেন দেশটির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। ভোটের শতাংশের হিসাব বলছে, বহু আসনে নোটার চেয়ে কম ভোট পেলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে নিজের ‘নাক কেটে’ কংগ্রেসের ‘যাত্রাভঙ্গ’ করেছে আপ। তাছাড়া, লোকসভা ভোটের পাঁচ মাসের মধ্যেই ‘ইন্ডিয়া’য় ফাটল ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করেছে বলেও বিরোধীদের অনেকে মনে করছে। বিধানসভা ভোটে দু’দলের জোট হলে বিজেপির জয় সহজ হত না বলেই তাদের ধারণা।

অরবিন্দ কেজরীওয়াল

এ ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে কংগ্রেসের চেয়েও আপের উপর ‘চাপ’ বেশি। কারণ, আগামী ফেব্রæয়ারি মাসে দিল্লির বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। সেখানে ২০১৩ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় রয়েছে আপ। এ বারের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও দিল্লির সাতটি আসনে বিজেপির জয় ঠেকাতে পারেননি কেজরী। আবগারি মামলায় গ্রেফতারির পরে ছ’মাস তিহাড় জেলে কাটিয়ে হরিয়ানায় প্রচারে নেমেছিলেন আপ প্রধান। কিন্তু দলের বিপর্যয় ঠেকাতে পারেননি। ঘটনাচক্রে, হরিয়ানার প্রতিবেশি রাজ্য পঞ্জাবে সরকার চালাচ্ছে আপ। দুই রাজ্যের যৌথ রাজধানী চণ্ডীগড়ে কংগ্রেসের সমর্থনেই কেজরীর দলের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

কংগ্রেসের ‘পরিণতি’ দেখে কেজরীওয়ালের খোঁচা: আত্মবিশ্বাস ভাল, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে একেবারেই ঠিক নয়, হরিয়ানায় কংগ্রেসের ‘পরিণতি’ দেখে সেই খোঁচা দিলেন আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান তথা দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল। তিনি বলেন, ভোটের ফল নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ঠিক নয়। আর এটাই শিক্ষণীয় বিষয়।’ সরাসরি নাম না করে কংগ্রেসকে এ ভাবেই কটাক্ষ করলেন কেজরী। বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষায় এই রাজ্যে কংগ্রেসকেই এগিয়ে রাখা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভাল ফল নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিল কংগ্রেসও। কিন্তু মঙ্গলবার গণনা যত এগিয়েছে, ছবিটা ততই বদলাতে শুরু করে। প্রথমে কংগ্রেসের দিকে পাল্লা ভারী থাকলেও, গণনা যত এগিয়েছে, পাল্লা ভারী হয়েছে বিজেপির।
কিন্তু যে ভাবে বিজেপির পাল্লা ভারী হয়েছে, সেই প্রবণতা দেখেই কংগ্রেসকে আক্রমণ করতে ছাড়লেন না কেজরী। এ প্রসঙ্গে নাম উচ্চারণ না করে তিনি বলেন, কোনও নির্বাচনকেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি আসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত, হরিয়ানার নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে লড়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আপের। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। তার পরই আলাদা ভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নেয় আপ। ৯০টি আসনের মধ্যে ৮৯টি আসনে প্রার্থী দেয় তারা।

আঞ্চলিক সমীকরণ ভোটের মেরুকরণ

আশিকুর রহমান : ২০১৪-য় অবিভক্ত জম্মু ও কাশ্মীরে ৮৭টি আসন ছিল। ৩৭০ বাতিল এবং রাজ্য ভাগের পরে লাদাখের ৪টি আসন বাদ পড়ে। এর পর জম্মু ও কাশ্মীরের আসন পুনর্বিন্যাসের দায়িত্বে থাকা ‘ডিলিমিটেশন কমিশন’-এর রিপোর্টের ভিত্তিতে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা আসনসংখ্যা ৮৩ থেকে বাড়িয়ে ৯০ করা হয়েছিল গত বছর। সাতটি আসনের মধ্যে ছ’টি বেড়েছে জম্মুতে (৩৭ থেকে ৪৩) এবং একটি কাশ্মীরে (৪৬ থেকে ৪৭)। কমিশন জানিয়েছে, ২০১১ সালের জনসংখ্যার ভিত্তিতেই আসন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও অভিযোগ ওঠে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হিন্দুপ্রধান জম্মুতে মুসলিম প্রধান কাশ্মীর উপত্যকার তুলনায় বেশি আসন বাড়ানো হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রতিটি লোকসভায় ১৮টি করে বিধানসভা রয়েছে।

লোকসভা নির্বাচনেও জম্মু এলাকার দু’টি লোকসভা আসন উধমপুর এবং জম্মুতে জয় পেয়েছিল বিজেপি। কাশ্মীর উপত্যকার ফলে অবশ্য চমক ছিল। ফারুক আবদুল্লাহর দল মধ্য কাশ্মীরের শ্রীনগরে জয় পেলেও উত্তর কাশ্মীরের বারামুলা কেন্দ্রে নির্দল প্রার্থী শেখ এর রশিদের কাছে ২ লক্ষেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন ফারুক-পুত্র জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এনসি নেতা ওমর আবদুল্লা। দক্ষিণ কাশ্মীর এবং জম্মুর একাংশ নিয়ে গঠিত অনন্তনাগ-রাজৌরি আসনে এনসি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন আর এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপির সভানেত্রী মেহবুবা মুফতি।

হরিয়ানায় বিজেপি উত্থানের নেপথ্যে: এক দশক আগেও হরিয়ানায় তৃতীয় বা চতুর্থ ‘শক্তি’ হিসাবেই বিবেচিত হত বিজেপি। কখনও দেবীলাল-ওমপ্রকাশ চৌটালার আইএনএলডি, কখনও বংশীলালের হরিয়ানা বিকাশ পার্টির ছোট শরিক হয়ে কয়েকটি মন্ত্রীপদ পেলেও অটলবিহারী বাজপেয়ী-লালকৃষ্ণ আডবাণীদের জমানায় কখনও উল্লেখ্যযোগ্য শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি তারা। কিন্তু ইন্ডিয়ার জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির উত্থানের পরেই পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে রাজ্যের ১০টি লোকসভা আসনের মধ্যে আটটি আসনে লড়ে সাতটিতে জিতেছিল তারা। সে বছরের অক্টোবরের বিধানসভা ভোটে এক দশকের কংগ্রেস শাসনের ইতি টেনে প্রথম বার হরিয়ানায় ক্ষমতা দখল করেছিল পদ্মশিবির। ৩৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ৯০ আসনের মধ্যে ৪৭টিতে জিতেছিল। এর পর ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ‘মোদী ঝড়ে’ ভর করে ১০টি আসনেই জিতেছিল বিজেপি। পেয়েছিল ৫৮ শতাংশ। কিন্তু সে বছরের অক্টোবরের বিধানসভা ভোটে ধাক্কা খায় তারা।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৯ অক্টোবর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

ত্রিশঙ্কু বিধানসভায় জেতে ৪০টি আসনে। শতাংশের হিসাবে বিজেপি প্রায় সাড়ে ৩৬ শতাংশ, কংগ্রেস প্রায় ২৯ শতাংশ এবং জেজেপি সাড়ে ১৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। প্রাক্তন শাসকদল আইএনএলডির ভোট আড়াই শতাংশেরও নীচে নেমে গিয়েছিল ২০১৯-এর বিধানসভা ভোটে। এর পরে জেজেপির ১০ বিধায়কের সমর্থনে ফের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মনোহরলাল খট্টর। কিন্তু চলতি বছরে লোকসভা ভোটের আগে সে জোট ভেঙে যায়। গত মার্চে খট্টরকে সরিয়ে নয়াব সিংহ সাইনিকে মুখ্যমন্ত্রী করে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব। এ বারের লোকসভা ভোটে কংগ্রেস এবং বিজেপি দু’দলই হরিয়ানায় পাঁচটি করে আসনে জিতেছিল।

লোকসভায় আপ এবং কংগ্রেস আসন সমঝোতা করলেও এ বার দু’দল আলাদা ভাবে লড়েছে। লোকসভা ভোটের হিসাবে বিজেপি ৪৬ শতাংশ এবং কংগ্রেস ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অর্থাৎ, মাত্র দু’শতাংশের ফারাক ছিল দু’দলে। এ বার আপের সাহায্য ছাড়াই সেই ব্যবধান আরও কমিয়ে আনল কংগ্রেস। তবে ঠেকাতে পারল না বিজেপির জয়ের হ্যাটট্রিক। যার নেপথ্যে ভ‚মিকা রইল কেজরীর।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading