নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে ‘বন্ধ’, প্রতিবাদ সমাবেশে ‘হামলা’ : সংস্কৃতি চর্চা ঘিরে কী হচ্ছে

নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে ‘বন্ধ’, প্রতিবাদ সমাবেশে ‘হামলা’ : সংস্কৃতি চর্চা ঘিরে কী হচ্ছে

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১০ নভেম্বর , ২০২৪, আপডেট ১৫:২০

শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় বাধা, সুষ্ঠু তদন্তের দাবি

আশিকুর রহমান: রাজধানীতে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় নাটক বন্ধ করতে আসা ব্যক্তি এবং গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশনের সমাবেশে হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ বলেছেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেওয়া হবে। শনিবার (০৯ নভেম্বর) শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত করে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সারাদেশের নাট্যকর্মীদের নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন কামাল বায়েজীদ।

প্রসঙ্গত, গত ২ নভেম্বর দেশ নাটক প্রযোজিত ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই দিন টিকেট বিক্রি শুরু হয় বিকাল থেকে। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে একদল লোক শিল্পকলার গেইটের সামনে দেশ নাটকের সদস্য এহসানুল আজিজ বাবুকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জামিল আহমেদ গিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করলে যথারীতি নাটকের প্রদর্শনী শুরু হয়। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা ফের সংগঠিত হয়ে নাট্যশালার গেইটের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে মহাপরিচালক ‘দেশ নাটকের’ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রদর্শনী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেন।

পরদিন এক ব্রিফিংয়ে জামিল আহমেদ বলেন, দর্শকের ‘নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে’ নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি দেখে তার আশঙ্কা হয়েছিল, শিল্পকলা একাডেমিও ‘আক্রান্ত হতে পারে’। এই ঘটনায় উদীচী, দেশ নাটক বিবৃতি দিয়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বিক্ষুব্ধ থিয়েটারকর্মীরা। নাটক বন্ধের ঘটনায় গত শুক্রবার (০৮ নভেম্বর) প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করে গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশন। সমাবেশ চলাকালীন কয়েকজন লোক এসে পেছন থেকে ‘ডিম ছুঁড়ে’ মারে এবং নাট্যকর্মীদের ধাওয়া খেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে নাট্যকর্মীরা নাট্যশালার সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে ‘নাটক মোদের অধিকার/রুখবে নাটক সাধ্য কার’। এর আধা ঘণ্টা পর ৪০/৫০ জন বিক্ষোভকারী সংগঠিত হয়ে আবারও এসে নাট্যশালার সামনে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় সেনাবাহিনীসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী উভয়পক্ষের মাঝে ব্যারিকেড তৈরি করেন। নাট্যকর্মীরা অবস্থান নেন নাট্যশালার মেইন গেইটের সামনে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেন দুর্নীতি দমন কমিশনের গেইটের সামনে। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি ¯েøাগানে উত্তপ্ত হয়ে উঠে নাট্যশালার সামনের চত্বর। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বিক্ষোভকারীরা নাট্যশালার সামনে থেকে চলে যান।

এমন প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে থিয়েটার বা নাট্যচর্চা করতে চায় মঞ্চশিল্পীরা। পাশাপাশি যারা বিক্ষোভ করে হুমকি দিয়ে নিত্যপুরাণ নাটকের প্রদর্শনী বন্ধ করেছে এবং শুক্রবার নাট্যকর্মীদের প্রতিবাদ সমাবেশে হামলা করেছে তাদের ভিডিও ফুটেজ দেখে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমিসহ অন্তর্বর্তী সরকারকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শনিবার শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। এদিকে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে শিল্পকলা একাডেমির গেটের সামনে বিক্ষোভের চেষ্টা করলে মহিউদ্দীন হৃদয় (৩৮) ও রাসেল (৪২) নামে দুই বিক্ষোভকারীকে আটক করে নিয়ে যায় রমনা থানা পুলিশ।

নাট্যকর্মীদের পরিচয় স্পষ্ট, হামলাকারী কারা?

সাদিত কবির : গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ বলেছেন, আমরা তো নাট্যকর্মী, আমাদের পরিচয় স্পষ্ট। তবে যারা নাটক বন্ধ করতে চায়, তারা কারা? আমরা তাদের পরিচয় জানতে চাই। তারা যেভাবে আমাদের উপর হামলা করেছে, তা সন্ত্রাসী আচরণ। আমরা এর বিচার চাই। কামাল বায়েজীদ বলেন, যারা হামলা করেছে, এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় এনে শিল্পচর্চার সুষ্ঠ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিক্ষোভকারীদের দাবি স্পষ্ট নয় জানিয়ে কামাল বায়েজীদ বলেন, তারা এসে বলছে ‘দেশ বাংলা’র নাটক বন্ধ করতে হবে। তারা নাটকের দলের নামও জানে না। বলছে, বাংলা একাডেমিতে নাটক করতে দেওয়া হবে না। এটা যে শিল্পকলা একাডেমি, এটাও তারা জানে না। তাহলে তারা কারা? নাটক বন্ধ করার মতো দাবি তুলে যে সন্ত্রাসী আচরণ করছে, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাদেরকে কারা মদদ দিচ্ছে, তাদের পরিচয়ও সামনে আনতে হবে। আলোচনায় বসে সমাধান করার চিন্তা আছে কি না প্রশ্নে কামাল বায়েজীদ সাংবাদিকদের বলেন, তারা কারা, এটাই তো আমরা জানি না। তাদের তো একটা প্ল্যাটফর্ম থাকতে হবে। তারপর তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়। কয়েকজন ব্যক্তি একটা ‘মব’ সৃষ্টি করে নাটক বন্ধ করার দাবি তুলবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অনুষ্ঠান সম্পাদক খন্দকার শাহ আলম বলেন, যারা এই হামলা করেছে, তারা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা বলে পরিচয় দিচ্ছে। নাট্যাঙ্গনেও তো অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, আহতও হয়েছে। যে দলের নাটক তারা বন্ধ করার দাবি তুলেছে, সেই দলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া আছে। নাট্যদলে তো নানা রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ আছে। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, কিন্তু নাটক বন্ধ করতে চায়। তারা আসলে কি চায়? সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী, তপন হাফিজ, ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের নির্দেশক ও নাট্যকার মাসুম রেজা, অভিনেতা কামাল আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনের বাইরেও বিক্ষোভ: গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সংবাদ সম্মেলন চলাকালীন শিল্পকলা একাডেমির মেইন গেইটের সামনে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ১০ থেকে ১৫ জন বিক্ষোভকারী। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ/শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘তুমি কে আমি কে বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। তাদের কাছে পরিচয় জানতে চাইলে, তারা ‘সাধারণ জনতা’ বলে নিজেদের পরিচয় দেন। তবে তাদের বেশিরভাগই নিজেদের নাম বলতে রাজি হননি।
তাদের মাঝে রনি নামে একজন গণমাধ্যমকে বলেন, এহসান বাবু দেশ নাটকের পৃষ্ঠপোষক, সে আওয়ামী লীগের দালাল। আমাদের উপদেষ্টাদের নিয়ে কটুক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে। আমরা তার নাটক এখানে করতে দেব না। এহসান বাবুর কোনো নাটক তিনি দেখেছেন কী না বা কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন কী না প্রশ্নে রনি বলেন, আমি মালিবাগে থাকি, সংস্কৃতি অঙ্গনের কেউ না। প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানোদের মধ্য থেকে চারজনকে রমনা থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। তাদের মধ্যে রনিও আছেন। এ সময় দায়িত্বরত মোস্তফা নামে একজন পুলিশ সদস্য গণমাধ্যমকে বলেন, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।

সৈয়দ জামিল আহমেদ

শিল্পকলাকে বাঁচাতে হবে জনগণকেই

আসাদ এফ রহমান : দেশ নাটকের ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের প্রদর্শনী বন্ধের পরদিন গণমাধ্যমে এর পেছনের কারন তুলে ধরেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ। ওইদিন তিনি বলেছিলেন, দর্শকের ‘নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে’ শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি দেখে তার শঙ্কা হয়েছিল শিল্পকলা একাডেমিও ‘আক্রান্ত হতে পারে’। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় নয়, জনগণের আন্তরিক চেষ্টায় একটি ‘জনবান্ধব শিল্পকলা একাডেমি’ গড়ে তোলার প্রত্যাশাও রেখেছেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, সা¤প্রতিক সময়ে দেশের ২২ জায়গায় শিল্পকলা একাডেমিতে হামলা হয়েছে। সেসব মাথায় ছিল। আর এখানে ভেতরে দর্শক ছিল।

উত্তেজিত কেউ গিয়ে যদি দর্শকদেরও আক্রমণ করে বসে। দর্শকের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমরা প্রদর্শনী বন্ধ করি। আমি ভেতরে গিয়ে দর্শকের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। শিল্পকলাকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ার স্বপ্নের কথা বলেন জামিল আহমেদ। তিনি বলেন, গত এক মাসে এখানে এমন অনেক নাটকের দল নাটক করেছে, যাদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আমি এবং আমার সহকর্মীরা বলেছি, তাদের নাটক করতে দিতে হবে। দর্শক তাদের নাটক দেখে বিবেচনা করবে, তাদের নাটক দর্শক দেখবে কী না। তারা কিন্তু নাটক করেছে। কোনো সমস্যা হয়নি। দেশ নাটকের ‘নিত্যপুরাণ’ নাটক নিয়েও আপত্তি ছিল না। উত্তেজিত জনতার আপত্তি কেবল একজন ব্যক্তিকে নিয়ে। পরে তারা দেশ নাটকের প্রদর্শনীও বন্ধের দাবি তোলে। ‘জনগণকেই শিল্পকলার দায়িত্ব নিতে হবে’ মন্তব্য করে জামিল আহমেদ বলেন, সেনাবাহিনীর পাহারায় নয়। জনগণই যেন শিল্পকলাকে রক্ষা করে। আমরা এমন জনবান্ধব শিল্পকলা চাই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বলে আসছি, ‘শিল্প-সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে বিবেচনা করতে হবে’। সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

ঘটনার বর্ণনা করে জামিল আহমেদ বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে শিল্পকলার আয়োজনে যাত্রা উৎসব চলছে। আমি এবং নাট্যকলা বিভাগের পরিচালক ফয়েজ জহির সেখানে ছিলাম। নাট্যশালার সামনে বিক্ষোভ হচ্ছে শুনে আমি যাই। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলি। তারা বলে, এহসানুল আজিজ বাবু স্বৈরাচারের দোসর। তার নাট্যদলের প্রদর্শনী করতে দেবে না। আমি তাদের বুঝিয়েছি, দেশ নাটকের জনা বিশেক সদস্যও জুলাই গণঅভ্যুথানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধও আছে। জামিল আহমেদ বলেন, প্রথমে তারা মেনে নেয়, আমরা নাটকের প্রদর্শনী শুরু করতে বলি। কিন্তু পরে আবার বিক্ষোভ শুরু করে। তখন তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তাদের একজন নিজেকে রিকশাচালক পরিচয় দিয়ে জানায় যে জুলাই আন্দোলনে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

শিল্পকলা একাডেমি ‘আক্রান্ত হওয়ার’ শঙ্কা তৈরি হয়েছিল মন্তব্য করে জামিল আহমেদ বলেন, “আমি এটাও বলেছি, আমার বুকের উপর দিয়ে যান। তখন আমাকে পাশ কাটিয়ে দেয়াল টপকে কয়েকজন ঢুকে পড়ে। যখন গেইট ভেঙে ফেলে, তখন আমরা দেশ নাটকের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রদর্শনী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী সহযোগিতা কেন নেওয়া হল না প্রশ্নে জামিল আহমেদ বলেন, মাত্র কিছুদিন আগেই গুলি চলেছে। আমরা আর দমনপীড়ন চাইনি। সেখানে বিক্ষোভ করতে যারা এসেছিলেন, তাদের মাঝেও দুজন ছিলেন জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ, এর মধ্যে একজন রিকশাচালকও ছিলেন। আমি তাদের বুঝিয়েছি, শিল্পকলার কণ্ঠ যেন কেউ রোধ না করে। শেখ হাসিনার মত স্বৈরাচার আমরা হতে চাই না। আমি নাটক করে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। দুবার তাদের বোঝাতেও পেরেছিলাম। কিন্তু পরে আর পারিনি।

‘নিত্যপুরাণ’ নাটক

‘নিত্যপুরাণ’ প্রদর্শনী বন্ধের নেপথ্যে

শহীদ রানা : শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় একদল ব্যক্তির বিক্ষোভের মুখে ‘নিত্যপুরাণ’ গত ২ নভেম্বর নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকরা। বিক্ষোভকারীরা শিল্পকলা একাডেমির গেইট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ করা হয় বলে নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক ফয়েজ জহির জানিয়েছেন।

এদিন বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে নাটকটি শুরু হলেও পরের দফায় গেইটের বাইরে তারা মারমুখী হয়ে উঠলে একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ নাট্যদল ‘দেশ নাটকের’ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রদর্শনী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন বলে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, ‘দেশ নাটক’ প্রযোজিত ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের পূর্বনিধারিত প্রদর্শনী ছিল ওইদিন। দেশ নাটকের এহসানুল আজিজ বাবুকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে একাডেমির মহাপরিচালক জামিল আহমেদ গিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করলে যথারীতি নাটকের প্রদর্শনী শুরু হয়। কিন্তু পরে বিক্ষোভকারীরা আরও সংগঠিত হয়ে নাট্যশালার গেইটের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তার গেইট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে মহাপরিচালক ‘দেশ নাটকের’ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রদর্শনী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। বিক্ষোভের কারণে মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ মিলনায়তনে দর্শকের কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আপনাদের কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। নিত্যপুরাণ নাটকের নির্দেশক ও নাট্যকার মাসুম রেজা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা থিয়েটারটা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু থিয়েটারকে রাজনীতির মধ্যে ফেলে আমাদেরকে নাটক বন্ধ করতে বাধ্য করা হল। আমরা বন্ধ করে চলে এসেছি। জামিল ভাই তো খুবই চেষ্টা করেছেন যেন নাটকটা শেষ করা যায়। কিন্তু আমাদেরকে বন্ধ করতে হল, এটা খুবই দুঃখজনক।

শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক ফয়েজ জহির গণমাধ্যমকে বলেন, এই বিক্ষোভকারী কারা? আমরা তাদের চিনতে পারিনি। কিন্তু উত্তেজিত এই বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে শিল্পকলাকে রক্ষা করতেই তাৎক্ষণিকভাবে এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বাধ্য হয়েছি। বিক্ষোভকারীরা দেশ নাটকের একজন নাট্যকর্মীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি শিল্পকলার কোনো বিষয় নয়। কিন্তু ওই মুহূর্তে শিল্পকলা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। তাই আমাদের বাধ্য হতে হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ওই নাট্যকর্মীকে ‘ফ্যাসিবাদের’ দোসর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আবার আমরা কিন্তু দেশ নাটকের অনেক সদস্যকেও দেখেছি সা¤প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুথানে ছাত্র-জনতার পক্ষে আন্দোলন করতে। তাই একজন ব্যক্তির প্রতি ক্ষোভ থেকে পুরো নাট্যদলের প্রদর্শনী বন্ধ করতে হল, তা একটা নিন্দনীয় উদাহরণের জন্ম দিল। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম মঞ্চে আসে ‘নিত্যপুরাণ’ নাটক। এরপর ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত মঞ্চায়ন হয়। পরে প্রায় এক যুগ প্রদর্শনী বন্ধ থাকার পর ২০১৭ সাল থেকে পুনরায় নিয়মিত মঞ্চায়ন শুরু হয়।

গত ১৭ অক্টোবর নাট্যদল ‘দেশ নাটকের’ এহসানুল আজিজ বাবু তার ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে লেখেন, আসুন আমরা সবাই এই দেশকে বাঁচাই, জয় বাংলা বলে এই বাংলাদেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। পোস্টের সঙ্গে একটি ছবিও শেয়ার করেন তিনি, যেখানে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের ছবি ‘এডিট করে জিন্নাহ টুপি পরানো হয়েছে’ এবং তাদেরকে ‘রাজাকার’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। ওই পোস্ট ঘিরেই কিছু মানুষ জাতীয় নাট্যশালার সামনে আসেন বলে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জামিল আহমেদের ভাষ্য। তিনি বলেন, যে পোস্টটি করা হয়েছিল, সেটি অত্যন্ত নিম্নরুচির। এটি বাবুকেও আমি বলেছি। আমি তাকে বলেছি, এভাবে নিম্নরুচির পোস্ট ফেসবুকে না লিখে যুক্তি দিয়ে নাটক করুন। নাটকের মধ্য দিয়ে সরকারের সমালোচনা করুন।

মামুনুর রশীদ

এত নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে কি শিল্প চর্চা করা যায়

মহোসু: শিল্পকলা একাডেমিতে স¤প্রতি কতিপয় ব্যক্তির বিক্ষোভের জেরে দেশ নাটকের ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকটি বন্ধের প্রতিবাদে সরব নাট্যাঙ্গন। তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়, যাতে হামলা করেছে দুস্কৃতিকারীরা। শিল্পকলা একাডেমির মূল ফটকে আয়োজিত সমাবেশটির শেষের দিকে ওই হামলার ঘটনা ঘটে। বিকেল ৫টার দিকে সমাবেশের শেষ পর্যায়ে নাট্যজন মামুনুর রশীদের বক্তব্যের সময় অতর্কিতে একদল ব্যক্তি ডিম ছুঁড়ে মারেন। শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে দুর্নীতি দমন কমিশন ভবনের দিক থেকে এ হামলা হয়। এ সময় নাট্যকর্মীরা প্রতিরোধে চেয়ার ছেড়ে ছুটে গেলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।

সমাবেশে ডিম ছুঁড়ে মারার পর বক্তব্যে মামুনুর রশীদ বলেন, সভা শেষ করব না। ভেতরে নাটক হবে, বাইরে আমরা পাহারা দেব। এই দুষ্কৃতিকারীদের দেখে ছাড়ব। সমাবেশে এমন হামলার প্রেক্ষিতে সকাল সন্ধ্যাকে নাট্যজন মামুনুর রশিদ বলেন, আমরা নাটক বন্ধ করে দিব। এত নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে কি শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা করা যায়? তিনি বলেন, অনেক দুঃখ, বেদনা, ক্ষোভ থেকে এ কথা বলছি। এখন নাকি প্রতিবাদ উš§ুক্ত করে দিয়েছে। আমরা তো প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম। এই কী তবে মুক্ত পরিবেশ? শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রতিবাদ সভায় হামলায় কয়েকজন নাট্যকর্মী আহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে শুক্রবার জানায়।

ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, হামলার পরবর্তীতে দুস্কৃতিকারীরা পুনরায় শিল্পকলা একাডেমির গেটে অবস্থানরত নাট্যকর্মীদের আক্রমণে উদ্যত হয়। এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনচেষ্টা করছে শিল্পকলায় অবস্থানরত শিল্পীদের রক্ষা করতে। এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে শনিবার বেলা ১১টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে জরুরী সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করা হলো।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১০ নভেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

শিল্পচর্চার বিরুদ্ধে অবস্থান সমর্থন করে না সরকার

রিন্টু হাসান: জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘দেশ নাটক’ প্রযোজিত নাটক ‘নিত্যপুরাণ’ মঞ্চায়নের সময় ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। গত ৪ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ব্যাখ্যাটি বিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়, গত ২ নভেম্বর (শনিবার) সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘দেশ নাটক’ প্রযোজিত নাটক ‘নিত্যপুরাণ’ মঞ্চায়নের সময় এক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভকারীদের নির্বৃত্ত করার লক্ষ্যে ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত, সে প্রক্রিয়ায় না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য শিল্পকলা একাডেমি একাধিকবার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা ক্ষান্ত হয়নি। বরং তাদের সংখ্যা বেড়ে গেলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন অভিনয়শিল্পী ও দর্শকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ‘দেশ’ নাটকের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে দর্শকের নিকট দুঃখপ্রকাশ করে প্রদর্শনী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যাখ্যা আরও বলা হয়েছে, গত ৩ নভেম্বর দেশের কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় ‘শিল্পকলায় নাটকের প্রদর্শনী বন্ধের ঘটনা সমর্থন করে না সরকার’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের মূল বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে এটি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি বিক্ষুব্ধকারীদের নাটক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাকে অর্থাৎ শিল্পচর্চার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা সরকার সমর্থন করে না মর্মে বুঝিয়েছেন; তিনি মনে করেন মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

তা ছাড়া, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বাবস্থায় জনগণের শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশ্বাস করে। এজন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে কাজ করছে। সুস্থ, উৎসবমুখর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনবান্ধব শিল্পচর্চায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পাশে থেকে দেশের শিল্প সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখতে দেশের সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবীসহ দেশের জনসাধারণ এগিয়ে আসবে এটাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রত্যাশা বলেও ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading