শীতের সকালে হাওড়পারে প্রাণচাঞ্চল্য

শীতের সকালে হাওড়পারে প্রাণচাঞ্চল্য

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৫, আপডেট ১১:০০

সারাদেশে শীত পড়েছে। চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজারে কয়েকদিন ধরে শীত বেড়েছে। সকালে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে প্রকৃতি। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে কনকনে শীত অনুভূত হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে বের হওয়া শ্রমজীবী মানুষেরা বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে ঘন কুয়াশার কারণে যানবাহন চলছে ধীরগতিতে।

শনিবার (২৫ জানুয়ারি) মৌলভীবাজারের সারাটা দিন এমনই কুয়াশায় জড়ানো ছিল।

তখনও ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটেনি। জেলার সদর উপজেলার নাজিরাবাদ ইউনিয়নের হাইল হাওড়পারের ছিকরাইল গ্রামে গেলে একসময় হঠাৎ যেনো জেগে ওঠে একদল মানুষের চঞ্চলতায় মুখর খেজুরের বাগান।

সকাল ছয়টার কাছাকাছি। এর মধ্যে ছিকরাইল গ্রামের খেজুরের বাগান ঘেঁষে মানুষের জটলা। আশপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা কিছুই স্পষ্ট নয়, কুয়াশায় মোড়ানো। সড়কে দাঁড়িয়ে আছে বেশকিছু প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল।

এসময় দেখা যায়, দিঘিরপারের প্রায় দুইশত খেজুর গাছে গড়ে ওঠা বাগানে ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষজন। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে কথা বলছেন। কেউবা অস্থায়ী একটি টংঘর থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ করছেন।

এই খেজুরের বাগানের গাছিরা রাজশাহী জেলার মুজিব মিয়া, কলুমুদ্দিন আহমদ ও আবজাল হোসেন। আলাপকালে তারা জানান, শীত মৌসুমের শুরুতেই মৌলভীবাজারের ছিকরাইল গ্রামে তারা আসেন রস সংগ্রহ করতে। এখানকার বাগানে প্রায় দুইশত খেজুর গাছ থেকে দিনে ১৪০ থেকে ১৫০ লিটার রস পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিদিন এমন পরিমাণ মানুষ আসেন, অনেকেই রস পান না। শেষ হয়ে যায়। শীতের পিঠা ও পায়েসের জন্য খেজুরের রসের বাড়তি চাহিদা রয়েছে। এখানে প্রতি লিটার খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে একশো টাকায়।

এ রস থেকে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেকেই। কিন্তু, দিন দিন তা কমে যাচ্ছে। খেজুর গাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই একসময় হয়তো খেজুর রসের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। বর্তমানে গাছির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। এখন খেজুর গাছ থেকে রস নামানোর প্রক্রিয়া নতুন করে কেউ শিখতে চাচ্ছে না। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বেশি বেশি খেজুর গাছ রোপণ করা প্রয়োজন বলে জানান গাছিরা।

এই বাগানে কথা হয় পাশের ভুজবল গ্রামের জুনেদ আবেদিন এবং আমীর মিয়ার সঙ্গে। তারা জানান, এই কনকনে শীতের মধ্যে খেজুরের রস খেতে শহরের অনেকেই ছিকরাইল গ্রামে আসেন। রাত ৪টা থেকে বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে তারা আসেন। এখানে যে শুধু খেজুরের রস খাবেন তা নয়, সাথে হাইল হাওড়পারের ছিকরাইল গ্রাম ও খেজুরের বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

পৌর শহর থেকে রস নিতে এসেছেন ফজল তালুকদার। তিনি বলেন, ছোটবেলায় খেজুর রস পেট ভরে খেয়েছি। এই খেজুর রস বাজারেও বিক্রি হতো, শহরের লোকজন কিনে খেতো। সময়ের পরিবর্তনে আজ খেজুর রস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মানুষজন। এখন খেজুর রসে ভরা মৌসুমেও খেজুর রস পর্যাপ্ত না পাওয়ায় আর কেউ খাচ্ছেন না। বর্তমান প্রজন্ম কোনো একদিন খেজুর রসের নামটাও মুখে আনবে না। চিনবেও না।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী আব্দুর রব বলেন, কয়েক বছর আগেও শীত এলেই এলাকার হাট বাজারগুলোতে বিক্রি হতো খেজুরের রস। পরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খেজুর গাছ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় খেজুর রসের প্রতি মানুষের রয়েছে অনিহা। ফলে খেজুর রস এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না।

এই বাগানের তত্ত্বাবধায়ক মো. আবু সাঈদ বলেন, বয়স্ক গাছে রস খুব কম হয়। তবে শীত যত বাড়ে, সমান্তরালে কম বয়স্ক গাছেও রস বাড়ে। গাছের উপরিভাগের নরম অংশে চাঁছ দিয়ে রস নামানো হয়। একবার গাছে চাঁছ দিলে দুই থেকে তিনদিন রস পাওয়া যায়।

এই খেজুর বাগানের ইজারাদার মো. ইউসুফ হাসান বলেন, এখানে প্রায় দুইশত খেজুর গাছ রয়েছে। এগুলো থেকে গত এক মাস ধরে নিয়মিত রস নামানো হচ্ছে। খেজুরের গাছ থেকে প্রচুর রস কিংবা খেজুর উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিকভাবে কেউ চাষাবাদ করলে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading