ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম আকাশচুম্বী

ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম আকাশচুম্বী

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার , ২১ আগস্ট, ২০২৫, আপডেট ১০:০০

বর্ষার ভরা মৌসুমেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। অল্প পরিমাণে মাছ বাজারে পাওয়া গেলেও তার দাম আকাশচুম্বী। বর্তমানে ইলিশ মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকায়। ফলে কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে ১৭শ থেকে ২৮শ টাকা। এর মধ্যেও যদি দুই কেজি বা তার চেয়ে বড় ইলিশ পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি কেজিতে দাম আরও বেশি। দাম নাগালের বাইরে থাকায় এখন রূপালী ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবর্ষণ আর তীব্র খরা-তাপদাহ এবং সাগর-নদী মোহনায় অসংখ্য ডুবোচর ও অস্বাভাবিক দূষণের কারণে উপকূলে পুরো ভরা মৌসুমেও চলছে ইলিশের চরম আকাল। এতে এই পেশার সঙ্গে জড়িত জেলে, আড়তদার ও সাগরপাড়ের জেলা পটুয়াখালীর লাখ লাখ মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা।

পটুয়াখালীর সাগরপাড়ের জেলে ও ব্যবসায়ী এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈশাখ থেকে আশ্বিন এ ছয় মাস ইলিশের পুরো ভরা মৌসুম। তাদের হিসাব মতে, মৌসুমের অর্ধেকের বেশি সময় প্রায় শেষ। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে উপকূলের নদী ও সমুদ্রে মিলছে না ইলিশের দেখা। ফলে তাদের দাদন আর ঋণের বোঝা দিন দিন ভারি হচ্ছে। হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

কলাপাড়ার সমুদ্রগামী ফিশিং বোটের প্রধান মাঝি খলিল উদ্দিন জানান, ভারত ও মিয়ানমারের পতাকাবাহী শতাধিক অত্যাধুনিক জাহাজ সব সময় সাগরের বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান করছে। প্রতিটি জাহাজের সঙ্গে রয়েছে ২০-২৫টি মাছ ধরার ছোট ট্রলার। সেসব ট্রলার থেকে যান্ত্রিক উপায়ে এক ধরনের জাল ফেলা হয় সাগরে। এগুলো লাশা জাল নামেও পরিচিত। তিন স্তরের ওই জাল ভেদ করে ছোট-বড় কোনো ইলিশই সাগরের বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে পারছে না। ফলে দিন-রাত উত্তাল সাগরে জাল ফেলে মাছ না পেয়ে খালি হাতে তাদের ঘাটে ফিরতে হচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়ছেন ট্রলার মালিকসহ উপকূলের জেলেরা। এ কারণে বর্ষার ভরা মৌসুমেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। দিন দিন তারা ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও জানান।

অল্প পরিমাণে মাছ বাজারে পাওয়া গেলেও তার দাম আকাশচুম্বী। বর্তমানে ইলিশ মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকায়। ফলে কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে ১৭শ থেকে ২৮শ টাকা। এর মধ্যেও যদি দুই কেজি বা তার চেয়ে বড় ইলিশ পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি কেজিতে দাম আরও বেশি।

পটুয়াখালীর নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারে ইলিশ কিনতে এসেছেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য ৪৬শ টাকা দিয়ে ১ কেজি ২২ গ্রাম ওজনের দুটি ইলিশ কিনলাম। এ বাজারে সাত-আট বছর আগেও আষাঢ় শ্রাবণ মাসে প্রতিদিন মণে মণে ইলিশ উঠত। অথচ এখন ইলিশই নেই। তারপর নানা হাত পেরিয়ে সিন্ডিকেটের কারণে এত বেশি দাম হয় যে আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দর ঘুরে দেখা গেছে, ৪০০ গ্রাম সাইজের প্রতি মণ ইলিশের দাম ৬৮ থেকে ৭০ হাজার, ৮-৯শ গ্রাম সাইজের প্রতি মণ ইলিশ এক লাখ টাকা। এক কেজির বেশি সাইজের প্রতি মণ ইলিশ এক লাখ আট থেকে এক লাখ ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের ইলিশের দাম গত দশ দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি ১২ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার জেলে সুজন আকন বলেন, নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে সাগর উত্তাল। ঘন ঘন সিগন্যাল থাকায় সাগরে গিয়ে জেলেরা টিকতে পারেন না। তাছাড়া সাগরেও চাহিদামতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এখন এক একটি বোট নিয়ে সাগরে যেতে ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকার মালামাল প্রয়োজন হয়। সেই টাকা উঠবে কিনা, তার নিশ্চয়তা না থাকায় হতাশ ইলিশ আহরণে জড়িতরা।

সাগরের লোনাপানিতে বেড়ে উঠা একটি মা ইলিশ ১৫-২০ লাখ ডিম ধারণ করে। প্রজননের সময়ে পটুয়াখালীর তেঁতুলিয়া, রামনাবাদ, আগুনমুখা, বুড়াগৌরঙ্গ, আন্ধারমানিক ও পায়রার বিষখালীর অভায়াশ্রমে আসতে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়। আবার ডিম ছাড়া শেষে সাগরে ছুটতেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৎস্য অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. সাজেদুল হক যুগান্তরকে জানান, ইলিশ কম পাওয়ার কারণ হিসেবে জলবায়ুর প্রভাব তো আছেই, তারপর সাগরের অতিরিক্ত লবণাক্ততা, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, অসংখ্য ডুবোচর, নদীর নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ জালের ব্যবহারের ফলে সাগরের মাছ ইলিশের নদীতে এসে মাইগ্রেশন দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর কারণেই আজ ইলিশের এই দুস্প্রাপ্যতা। একে সহনীয় পর্যায়ে আনতে সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে চলা ও জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

মহিপুর মৎস্য বন্দর আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস জানান, অস্বাভাবিক বৃষ্টি, অতি খরা ও নদীতে ফেলা ময়লা সাগরের তলদেশে জমে অক্সিজেনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। যার জন্য সাগরের উপারিভাগে মাছের বিচরণ কমে যাওয়ায় তীরে ইলিশ খুবই কম আসছে। এসব কারণেই ইলিশের এ সংকট।

পটুয়াখালীর তেঁতুলিয়া ও রামনাবদ নদীপাড়ের উপজেলা গলাচিপার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুন্নবী বলেন, উপকূলজুড়ে ডুবোচর, নদীর মোহনা ভরাট, নদীদূষণ, আবহাওয়ার বৈরিতা ও জেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে অন্যদিকে চলে যাওয়ায় ইলিশের পরিমাণ কমছে বলে তিনি মনে করেন।

সাগরপাড়ের উপজেলা কলাপাড়ার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহার ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার বিমাতাসুলভ আচরণ, জেলের ইলিশ শিকারের আধুনিক সরঞ্জামাদির অভাব, সাগরের ৩০-৪০ কিমি এলাকায় ডুবোচর, নাব্য সংকট ও দূষণের কারণে ইলিশের মাইগ্রেশন হচ্ছে না। এসব কারণে ইলিশের মাইগ্রেশন রুটও পরিবর্তনের সম্ভাবনাসহ নানা কারণে আজ ইলিশের এই দুস্প্রাপ্যতা। সাগরে ইলিশের সহজলভ্যতা নিশ্চিতে স্টক ও মাইগ্রেশন রুট নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য অফিসের হিসাব মতে- পটুয়াখালীতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫১৮৩৯.৫৬৪ মেট্রিক টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০০০২.০০ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৭৯৬৬.৫৫ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭২০৬৩.০০ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৭৬৭১.০২ টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৪৭০৩.১০ মেট্রিক টন ইলিশ আহরিত করা সম্ভব হয়েছে।

আবহাওয়া পরিবেশ-প্রতিবেশ সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি অর্থবছরেও ৭২ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা আর্জন করা সম্ভব হবে বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading