ডেপুটি গভর্নর কবিরকে আসামি করার ব্যাখ্যায় যা বলছে দুদক

ডেপুটি গভর্নর কবিরকে আসামি করার ব্যাখ্যায় যা বলছে দুদক

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ০৯:২০

জাল রেকর্ডপত্র তৈরি করে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ, সিকদার গ্রুপের মালিক, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে গত ৪ জানুয়ারি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সম্পৃক্ততায় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কমিশন সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য করায় দুদক থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুদক অবহিত হয়েছে এই ঋণ প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ার পরও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কমিশন সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। দুদক মনে করে, সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে উক্ত ডেপুটি গভর্নরের ভূমিকা স্পষ্ট করা দরকার।

প্রেস নোটে দুদকের ব্যাখ্যায় ঋণ বিতরণে যে সব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো-
সিসিইসিসি-ম্যাক্স-জেভি’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্রটি যার বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে, তা ভুয়া এবং জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজিত, যা ব্যাংক যাচাই করেনি।

যে তারিখে হিসাব খোলা হয়েছে, একই তারিখে ঋণের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

ঋণ অনুমোদন সংক্রান্ত কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি।

মাত্র ৪ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ আবেদন থেকে শুরু করে ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।

কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ও পর্যাপ্ত ডিউ ডিলিজেন্স অনুসরণ করা হয়নি এবং জামানত গ্রহণ করা হয়নি। আর এখন পর্যন্ত কোনো টাকা ব্যাংকে ফেরত দেওয়া হয়নি।

ব্যাখ্যায় ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে দুদক বলছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯-এর উপধারা (১) অনুসারে ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সূচকসমূহের ক্রমাবনতি এবং সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় তাকে অবজার্ভার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল। পর্যবেক্ষক নিয়োগের শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩ কার্যদিবস পূর্বেই পর্যবেক্ষককে বোর্ড সভার আলোচ্যসূচি প্রেরণ করা হয়। ৪৩৩তম বোর্ড সভায় মোট ৬ জন পরিচালক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ড. মো. কবির আহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন। তাদের সকলের সম্মতিতে সকল রীতি-নীতি উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভূতভাবে অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ঋণ আবেদনের মাত্র ৬ দিন (৪ কার্যদিবস)-এর মধ্যে বোর্ড সভায় ওই ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে ঋণ অনুমোদনে সহায়তা করেন বলে দুদক প্রমাণ পেয়েছে।

ব্যাখ্যায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে বলা হয়, ঋণ, বিনিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সিকিউরিটি ও জালিয়াতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করা এবং বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে তা তুলে ধরা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গঠনমূলক পর্যবেক্ষণ দেওয়া। এছাড়াও তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালনা পর্ষদ সভায় নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া। নিয়ম হচ্ছে, পর্যবেক্ষককে সভা শেষে এক দিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক মতামতের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। এছাড়া সভার সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি ঋণের সমুদয় অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে আত্মসাতের প্রায় এক মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন (ডিওএস) বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করেন। আত্মসাতের ঘটনায় ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। বর্ণিত ঋণ অনুমোদনের বিষয়ে পর্যবেক্ষক হিসেবে ড. মো. কবির আহাম্মদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তকালে আরও পর্যালোচনা করা হবে।

দুদকের দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের (সাবেক পর্যবেক্ষক, ন্যাশনাল ব্যাংক) ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ, সাবেক পরিচালক মনোয়ারা সিকদার, পারভীন হক সিকদার, রন হক সিকদার, মোয়াজ্জেম হোসেন, খলিলুর রহমান ও মাবরুর হোসেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) আরিফ মো. শহীদুল হক, সাবেক এমডি চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ ওয়াদুদ, এ এস এম বুলবুল, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু রাশেদ নওয়াব এবং ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান, ব্যবসায়ী কৌশিক কান্তি পণ্ডিত, ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের এমডি সালাহ উদ্দীন খান মজলিশ, পরিচালক আব্দুর রউফ, বেঙ্গল ও এম সার্ভিসেসের মালিক জন হক সিকদার, মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজের মালিক সৈয়দ মাহবুব-ই-করিম, সিকোটেক হোল্ডিংস লিমিটেডের এমডি মো. মাহফুজুর রহমান, পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম, টেক ইনটেলিজেন্স লিমিটেডের এমডি মো. জামিল হুসাইন মজুমদার, এম এস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার্সের মালিক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন, জুপিটার বিজনেস লিমিটেডের এমডি মমতাজুর রহমান ও পরিচালক মোসফেকুর রহমান।

অভিযোগের বিষয়ে এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ভুয়া ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট দাখিল করে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলন করেন। পরবর্তীতে ঋণের অর্থ নগদ, পে-অর্ডার ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়। ঋণের আসল অর্থ পরিশোধ না করায় ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদ ও অন্যান্য চার্জ বাবদ ব্যাংকের প্রাপ্য দাঁড়ায় ৩০৩ কোটি ৬৭ লাখ ২ হাজার ৬২১ টাকা ২০ পয়সা। ফলে ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ ২ হাজার ৬২১ টাকা। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading