করোনার নতুন স্ট্রেন: বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড় নয়তো?
উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ | মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
মশিউর রহমান :: স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, সার্স, মার্স, ইবোলা, এভিয়ান ও কোভিড-১৯সহ যুগে যুগে অনেক ফ্লু’র সম্মুখীন হয়েছে বিশ্ব। এর মধ্যে অনেক ফ্লু মহামারীতেও রূপ নিয়েছে, যেগুলোকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে একটি নাম সবার প্রথমেই তুলতে হবে সেটি হচ্ছে স্প্যানিশ ফ্লু। এক শতাব্দীর আগের এই মহামারী, বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ। এই ভাইরাসের নাম তোলার প্রধান কারণ হল বর্তমান সময়ের মহামারী ভাইরাস করোনার সাথে এর মিল ‘অঙ্গাঙ্গীভাবে’ জড়িত।
করোনার জন্মস্থান বলা হয় চীনের উহানকে। যদিও এ নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক। এক দেশ দোষারোপ করছে আরেক দেশকে । কটাক্ষ করে করোনাকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু এ ভাইরাসের উৎপত্তি কোথা থেকে তা এখনও কেউ কোনও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি।
গত এক বছরে এই করোনা ভাইরাস বহু মানুষের প্রাণ নিলেও সম্প্রতি ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়ায় মানুষের মধ্যে এক ধরণের শান্তি বিরাজ করছিল। কিন্তু এর মধ্যে বাধ সাধল মহামারী এই ভাইরাসটির নতুন স্ট্রেন বা প্রজাতি। বিশ্ব যখন এই মুহূর্তে করোনাভাইরাসকে বাগে আনতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বিজ্ঞানীরা খারাপ প্রকৃতির নতুন স্ট্রেন, যা রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে বড়ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে, তার সন্ধান পায়।
গত এক বছরে করোনা বারবার রূপ বদলালেও এবারের নতুন স্ট্রেইনটি ভয়ঙ্কর। জ্বর, অবসাদ, শুষ্ক কাশি, বমি হওয়া, শ্বাসকষ্ট, গলা ব্যাথা, অঙ্গ বিকল হওয়া, পেটের সমস্যা, মুখ ও নাকের স্বাদ হারিয়ে যাওয়া- চলতি বছরের রূপ পরিবর্তনে বিভিন্ন সময়ে করোনার এসব লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু এবারের নতুন স্ট্রেনের লক্ষণগুলো খুবই ভিন্ন ও একদম সাধারণ যা শনাক্ত করাও কঠিন। যেমন- মাথা ব্যাথা, ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, পেশী ব্যথা, পেটে সমস্যা, বিভ্রান্তি (প্রলাপ বকা) আর চামড়ায় ফুসকুড়ি।
একদিকে যখনই ধীরে ধীরে সারাবিশ্বে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে তখনি এই নতুন স্ট্রেনের দেখা মিলছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের সময়ই কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি। এ নিয়ে দেখা দিচ্ছে অনেক প্রশ্ন। এমনকি করোনা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নিয়েছে নতুন মোড়।
কেউ বা কোন গোষ্ঠী কি ব্যবসায়িক স্বার্থে এই স্ট্রেইন ছড়িয়ে দিচ্ছে? নাকি ভ্যাকসিন ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কারণ নতুন এই স্ট্রেনের সাথে জড়িত? নাকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ফাইজার আর মডার্নার ভ্যাকসিন বিক্রিতে পরিবর্তন আনতে ষড়যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে? নাকি প্রাকৃতিকভাবেই করোনা তাঁর রূপ বদলেছে? সেটাই এখন প্রশ্ন।
প্রথমত নতুন এই স্ট্রেইনটি ধরা পড়ে ইংল্যান্ডে। দেশটির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আক্রান্ত ওই দুই ব্যক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করে এসেছে এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ভাইরাসটির নতুন বৈশিষ্ট্য দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত হয়েছে।
তবে দুঃখের বিষয় এই যে বাংলাদেশেও নতুন একটি স্ট্রেন (প্রজাতি) শনাক্ত হয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে সম্প্রতি ব্রিটেনে পাওয়া নতুন ধরনের করোনার। নতুন স্ট্রেন শনাক্তের পর থেকেই অনেক দেশ ইংল্যান্ডে আর সাউথ আফ্রিকার সাথে সাময়িকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।
করোনার মৃত্যু তালিকায় প্রবীণদের সংখ্যা যেখানে বেশি, সেখানে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের মূল টার্গেট ছিল তরুণরাই। তবে করোনার নতুন স্ট্রেন তরুণদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি দেখা দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের নতুন এই বৈশিষ্ট্য “দ্রুত ছড়ায়” এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক এলাকায় এর সংক্রমণও বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ চলছে। এখনো পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে এটি আগের তুলনায় অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে শান্তির ব্যাপার এই যে কোয়ারেন্টিন এবং ভ্রমণে বিধি-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে নতুন বৈশিষ্ট্যটির ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই এই ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
কিন্তু কথা হলো- এটি যদি বিশ্ব রাজনীতির নতুন কোনো চাল্ হয়, তবে বিষয়টি আরও আতঙ্কের। লেখক: সাংবাদিক

