আলগা নয়, সুদৃঢ় হোক পারিবারিক বন্ধন

আলগা নয়, সুদৃঢ় হোক পারিবারিক বন্ধন

পাভেল রহমান । মঙ্গলবার, ১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৬:২৫

সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে সুখের ঘরে ঢুকে পড়ছে দুঃখের আগুন। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা। ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে প্রথমে ধরা হয় পরকীয়ার বিষয়টি। এ ঘটনায় একের পর এক তছনছ হচ্ছে সাজানো সংসার। বাড়ছে খুনোখুনির ঘটনাও। বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহের জেরে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুসন্তানরা। পরে এ শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। শিশুকাল থেকে পিতৃ-মাতৃহীনতার কারণে ঢুকে যাচ্ছে অন্ধকার নেশার জগতে। আক্রান্ত হচ্ছে নানা মানসিক রোগে। ঝরে পড়ছে বিদ্যাপীঠ থেকে।

কোন বিষয়গুলো এর পেছনে দায়ী? অন্যতম কারণ হিসেবে যেগুলো বিবেচনা করা যায় তা হলোÑমোবাইল ফোন, চ্যাটবক্স, ফেসবুক, যৌতুক, নেশার উন্মাদনা, বিপরীত লিঙ্গ থেকে যৌন চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, আর্থিক দৈন্য, বিদেশি বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলের নাটক-সিনেমার প্রভাবসহ মানসিক হীনম্মন্যতার কারণে পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। এর ফলে ভাঙছে সংসার। বিষয়গুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করলেও মূল বিষয় কয়েকটি। পরকীয়া, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, দাম্পত্য যৌন জীবন। পরকীয়ার বিষয়টি সবার ওপরে। মোবাইল ফোন, ফেসবুকের মাধ্যমে দিনে দিনে মানুষ এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই অপরাধকে উসকে দেওয়ার জন্য রয়েছে টিভি চ্যানেলের নাটক-সিনেমা, যা প্রতিদিনই আগের দিনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন। ফেসবুক, চ্যাটবক্সের মাধ্যমে যে পরকীয়ার সূত্রপাত হয়, তাও এই জীবনযাপন থেকেই শুরু হয়। শহুরে জীবনযাপনে যারা অভ্যস্ত, তারা প্রতিক্ষণে এই জীবনযাপনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ছে। আজকাল ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কোনো বিষয়কে উদযাপন করার জন্য এই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনকে বেছে নিচ্ছে। ডিজে পার্টি, বিভিন্ন নিষিদ্ধ পানীয় পান থেকে শুরু করে রাত যাপন এখন অনেক সহজসিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা বাবা-মা থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে সন্তানের ওপর প্রভাব পড়ছে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে আমরা আমাদের জীবনকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। কিন্তু খুব ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায়, পাশ্চাত্যে পারিবারিক বন্ধন বলে তেমন কিছুই নেই। পারিবারিক এ ভাঙনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল থাকে, সেখানকার সন্তানরাও মানসিক সমস্যায় ভোগে। ভবিষ্যতে ওই সন্তান জড়িয়ে পড়ে বহুবিধ অপরাধে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে রয়েছে নারীর আর্থিক সচ্ছলতা। নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় সে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। তাই স্বামী ও তার পরিবারের নির্যাতন তারা এখন আর মুখ বুজে সহ্য করছে না। তাই বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে।

শহরের তুলনায় গ্রামে এ ঘটনাগুলো খুবই কম। গ্রামের মানুষ শহরের মতো এত প্রযুক্তিনির্ভর নয়। টেলিভিশন, ফেসবুক কিংবা ডিজে পার্টি গ্রামে নেই বললেই চলে। যৌথ পরিবারের সবাই নিজেদের মধ্যেই আনন্দগুলো ভাগ করে নেয়। সামাজিকভাবে এদের বন্ধন এতটাই অটুট, অন্যের সঙ্গে রাতে ঘুরে বেড়ানো কিংবা নিজের ব্যক্তিগত ছবি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করার সময়ও চিন্তা খুব কমই আসে। তারপরও শহরের ছোঁয়া গ্রামে লাগাতে এখন গ্রামেও বিচ্ছিন্নভাবে অনেক ঘটনাই ঘটছে। কিন্তু এর সংখ্যা খুবই নগণ্য।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল সময় যেন সবকিছুকেই ডিজিটালাইজড করে দিচ্ছে ক্রমাগত। পরিবার, সম্পর্ক, হূদ্যতা চলে এসেছে হাতের মুঠোয়, মোবাইল ফোনের মনিটরে। পরিবারকেন্দ্রিক যে সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ঝরনায় ছিল বাঙালি সিক্ত, সেখানে জমেছে যেন বিচ্ছিন্নতার গল্পহীন ধূলোর আস্তরণ। আবেগের পলেস্তরাগুলো ক্রমশ উঠে যেতে বসেছে। পড়ে আছে চুনকামহীন একান্নবর্তী পরিবারের সেই মর্মছোয়া বিমর্ষ অনুভূতি। নাগরিক জীবনে বহুকাল ধরে জীবন এখন একচিলতে বারান্দা, একরত্তি জানালা আর মুক্ত আকাশবিহীন আচ্ছাদনের ঘেরাটোপে আবৃত হয়ে আছে। শহুরে নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির অপূর্বময়তার সংস্পর্শ থেকে আজ বঞ্চিত। সবমিলিয়ে পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় সংকটে পড়ছে ছোট পরিবারগুলো। কোনো কোানা সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিশ্লেষক জানান, একাধিক কারণে গ্রামাঞ্চলে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। আধুনিক শিক্ষার প্রভাব, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রভাব ছাড়াও বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব, ননদ-ভাবির দ্বন্দ্ব, একা থাকার প্রবণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাও এর জন্য দায়ী। তারা জানান, যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় পারিবারিক অশান্তি, কলহ, বিবাদ ও অবিশ্বাসের ঘটনা বাড়ছে।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/সিফাত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading