ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল প্রবণতা
মোমিন মেহেদী । সোমবার , ১৭ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১৮:২০
ভাইরালের রাজনীতি-ষড়যন্ত্রনীতি শুরু হয়েছে ২০১৩ সালে। এই ভাইরালের রাজনীতি-ষড়যন্ত্রনীতি-আন্দোলননীতি থেকে ছাত্র-যুব-জনতার বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত অখাদ্য-কুখাদ্য টাইপের রাজনীতিক যেমন উঠে এসেছেন, তেমনি উঠে এসেছেন ইসলামিক-অনৈসলামিক, মানবতাবাদী-দুর্নীতিবাজ-জঙ্গি, নায়ক-গায়ক, আস্তিক-নাস্তিক, কূটনীতিক।
শত শত ভাইরাল হওয়া মানুষের অধিকাংশই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের উত্তরণ নিয়ে ব্যস্ত। তাদের কেউ কেউ ভাইরালের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে যতটা নিজেরা লাভবান হয়েছেন, ততটাই প্রতারিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ যেমন রক্ষা করেছেন এদের কেউ কেউ, তেমনি ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অবিরাম নিজেদের টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি, ইউটিউব চ্যানেলকেও কেউ কেউ ভেরিফায়েড করিয়ে নিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করছেন।
সাধারণ মানুষের কষ্টগাথা থেকে উত্তরণে এদের কারো কোনো চিন্তা নেই। কেবল নিজেদের ভাইরাল হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরো বেশি টাকা কামানোর চেষ্টা, কেউ কেউ ক্ষমতায় আসার চেষ্টা, আবার কেউ কেউ আরো বেশি করে মাদক-নারীবাজিতে তাদের ভাইরাল হওয়ার সব সুবিধা কাজে লাগাচ্ছেন। এদের কেউ কেউ আবার ধর্মীয় গ্রন্থকে অবমাননা যেমন করেছেন, পরে আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে হয়ে গেছেন চরম রকম ধর্মীয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মরিয়ম মান্নানের মায়ের ‘নিখোঁজ’ হওয়া ভাইরাল নাটকীয়তার ধারাবাহিকতায় মরিয়ম নিজেই দিয়ে আসছিলেন নানা আপডেট। একপর্যায়ে মায়ের মৃত্যুর খবর জানিয়ে তার ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট দেওয়া হয়। এবার সেই আইডি থেকেই দেওয়া হয়েছে মায়ের বেঁচে থাকার খবর। প্রথম দিকে যারা মরিয়মের মায়ের খোঁজের আন্দোলনে এই মাধ্যমে লাইক, কমেন্টে, শেয়ার করে ভার্চুয়ালি সঙ্গে ছিলেন, এখন তাদের অনেকেই মরিয়মের পোস্টে বিরূপ মন্তব্য করছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, ‘আবেগ ফেরত চাই।’ এ নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর ‘ক্ষেপেছিলেন’ কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেত্রী মরিয়ম মান্নান। সাংবাদিকদের বিষোদ্গার করে ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে মায়ের জন্য করা আন্দোলনের জন্য যে চোখের জল পড়েছে, তার দাম চেয়েছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে।
চার বছর আগেও কোটা আন্দোলনে পুলিশি হেফাজতে নিজের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন মরিয়ম মান্নান। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ভাইরাল হন এই শিক্ষার্থী। তখন মরিয়ম তার দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি দিতে পারেননি বলে দাবি পুলিশের। তখন তার একটি ছবি বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল।
উদ্ভট সব কথা-আচরণের মধ্য দিয়ে ভাইরাল হওয়া মরিয়ম যখন নিজের মায়ের নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজিয়ে একের পর এক নতুন নতুন বাঁক নির্মাণের নায়িকাকে নিয়ে রুয়েল মাহমুদ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে এই একটা মেয়ে মরিয়ম মান্নানকে দেখেছি, যে তার মাকে হারানোর পরেও অনলাইনে দফায় দফায় প্রোফাইল পিকচারে তার কান্নার ছবি দিত! এক অজ্ঞাত মহিলার লাশকে খুব কনফিডেন্টলি তার মা বলে দাবি করল! ইভেন তখন ঐ লাশের কাছে থাকাকালেও তাকে নিয়ে যেই পোস্ট করেছে, সেখানে সে কমেন্টস করছে, রিপ্লে দিচ্ছে!! কীভাবে সম্ভব ২৭ দিন পর মায়ের লাশ (তার ভাষ্যমতে) পেয়েও এভাবে অনলাইনে এত অ্যাক্টিভ থাকা? আচ্ছা যাই হোক, উনি নাকি ওনার মাকে চিনতে ভুল করেননি! করবেনও না! তাহলে এখন কীভাবে তার মাকে জীবিত অক্ষত উদ্ধার করা হলো? সব যেন কেমন রহস্যময়!!’ অন্যদিকে মরিয়ম মান্নানের ফেসবুক পেজে দেওয়া তার নিজের স্ট্যাটাসে সিলেটের এক বাসিন্দা মন্তব্যের ঘরে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মন্তব্যে লেখেন, ‘মেরিল-প্রথম আলো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে রয়েছে আপনার জন্যে পরিবেশ বান্ধব দুইটা গাছ, একটা কামাল সাবান।’
এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনে ভাইরাল হওয়া মানুষগুলো অপরাধ-দুর্নীতি-কুনীতির রামরাজত্ব তৈরি করছে যেমন, তেমনি শিল্প-সংস্কৃতি-ধর্মপ্রীতিকে কাজে লাগিয়ে শুধু নিজেদের টাকা কামানোর রাস্তাটাই প্রশস্ত করছে। কত মিলিয়ন ভিউ হলে কত টাকা আয় হবে—এই ভাবনা নিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষকে ওয়াজ, জাতির উদ্দেশ্যে সংবাদ, দেশের কল্যাণকথা শোনার আগে তাই ভাবুন নিজের ভিউ বাড়ানোর জন্য, নাকি আপনার কল্যাণের জন্য কথা বলছেন, গান গাইছেন, অভিনয় করছেন, ওয়াজ করছেন স্ক্রিনে থাকা ব্যক্তিটি! নিজেকে আর কত প্রতারকদের খপ্পরে ফেলবেন! এখন নিজের দায়িত্ব থেকে ভাবুন একজনের আন্ডাওয়্যার পরা নাচ দেখবেন, আরেকজনের কুরুচিপূর্ণ নাচ উপভোগ করবেন, কোটা বিরোধী আন্দোলনের নাটক করে রাজনীতিতে জেঁকে বসা নতুন হালুয়ারুটির ভাগিদারদের বক্তব্য শুনবেন, বাংলা গান শুনে শুনে সেগুলোকে মুখস্থের পর প্যারোডি করে লোক হাসানোর মধ্য দিয়ে ভাইরাল হওয়া বক্তাদের বক্তব্য শুনবেন, নাকি সত্যিকারের ধর্ম পালনের জন্য পবিত্র কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন, দেশপ্রেমের জন্য নিবেদিত থেকে পরিবারতন্ত্র-দুর্নীতিবিরোধী রাজনৈতিক বলয়ে যুক্ত হয়ে আওয়াজ তুলবেন, সমাজের সব অন্যায়-অপরাধ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামর্থ্যানুযায়ী সোচ্চার থাকবেন। জীবন আপনার, ভাবনাও আপনার। জাগবেন, নাকি ঘুমাবেন!
লেখক: সাংবাদিক
ইউডি/সিফাত

