আইন উপদেষ্টা জানালেন: নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে
উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৪:৪০
ইসি পুনর্গঠনে সার্চ কমিটি’র প্রজ্ঞাপন শিগগিরই
আসাদ এফ রহমান: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো নির্বাচন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সংস্কার ও নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘিরেই চলতে থাকে আলোচনা-সংলাপ। অনেক রাজনৈতিক দল সংস্কারে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচন চায়, আবার অনেক রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট ভাষ্য হলো এই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিৎ নির্বাচন। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার ও নির্বাচন এই দুই বিষয়কেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এবার এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, নির্বাচনমুখী প্রক্রিয়া গ্রহণ করার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) সচিবালয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বিফ্রিংকালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সার্চ কমিটি গঠন হয়ে গেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাক্ষরের পর প্রজ্ঞাপন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, হয়তো ইতোমধ্যে স্বাক্ষর হয়ে থাকতে পারে। না হলে শিগগিরই হয়ে যাবে।
সার্চ কমিটি হয়ে গেলে ইসি গঠন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া গ্রহণ শুরু হয়েছে। সার্চ কমিটি কত সদস্যের হবে, এ প্রশ্নের জবাবে ড. আসিফ নজরুল বলেন, আইনে যা বলা আছে, তা-ই হবে। তিনি আরও বলেন, ভোটার তালিকা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন রয়েছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচন ছিল ভুয়া। তাই ভোটার তালিকা নিয়ে তেমন কথা হয়নি। এবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে। একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুন্দর নির্বাচন দেবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
যেভাবে গঠিত হয় সার্চ কমিটি: জাতীয় সংসদে পাস হওয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটি (অনুসন্ধান কমিটি) গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এ অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হয়। আইনে বর্ণিত যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিবেচনা করে তারা ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবেন। ১০ জনের মধ্য থেকেই ৫ জনকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি গঠন করবেন নতুন নির্বাচন কমিশন। রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন। যার সভাপতি হন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। এ দুই বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন হবেন নারী। তিন সদস্যের উপস্থিতিতে কমিটির সভার কোরাম হবে। এ কমিটির কাজে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী
সার্চ কমিটির প্রধান হচ্ছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী
শহীদ রানা: নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সার্চ কমিটির প্রধান হচ্ছেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। ইতোমধ্যে তার নাম মনোনীত করেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। সদস্য হিসেবে হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে মনোনীত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এ দুজন বিচারপতির নাম প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত হওয়ার পর তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক মাসের মাথায় গত ৫ সেপ্টেম্বর বিদায় নেয় কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন, যাদের অধীনে এ বছরের প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়েছিল।
আইনের অধীনে প্রথম ইসি গঠন হয়েছিল যে প্রক্রিয়ায়: ইসি গঠনে দীর্ঘদিন কোনো আইন ছিল না বলে তা নিয়ে ছিল সমালোচনা। সবশেষ হাবিবুল আউয়াল কমিশন গঠনের আগে আকস্মিকভাবেই আইন প্রণয়ন হয়। ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ আইন প্রণীত হয় ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি। ওই আইনের ধারায় ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। সার্চ কমিটির দায়িত্ব ছিল সিইসিসহ ইসির প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজনের নাম ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা। কমিটি প্রথমে রাজনৈতিক দলসহ সবার কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করে ৩২২টি নাম সংগ্রহ করে। এরমধ্যে বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠক করেও মতামত নেয়। সাতটি বৈঠকের পর কমিটি ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করে নিজেদের সুপারিশ দেয় রাষ্ট্রপতিকে। প্রথমে আসা ৩২২টি নাম প্রকাশ করলেও চূড়ান্ত সুপারিশে থাকা ১০টি নাম সার্চ কমিটি প্রকাশ করেনি। ফলে এটা জানা যায়নি যে হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে আর কার নাম সার্চ কমিটি সিইসি হিসেবে প্রস্তাব করেছিল। আর কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়াদের বিপরীতে কার কার নাম ছিল, তাও অজানাই রয়ে যায়। এর আগের দুবার প্রস্তাবিত নামগুলো পরে প্রকাশ করা হয়েছিল।

নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার চায় ইসি কর্মকর্তারা
রিন্টু হাসান: অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার চায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনকে একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। এই প্রস্তাবনার একটি পার্টে যেকোনো নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার চেয়েছেন তারা। ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার চাওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ইসি কর্মকর্তারা জানান, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রতিদ্বদ্বী প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রার্থী/রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে বাধ্য করা। ইতোপূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের আচরণবিধি মানাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনের আগেই নির্বাচন কমিশনের প্রতি রাজনৈতিক দল তথা প্রার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হলে সার্বক্ষণিক নিবিড় তদারকি ও আইন ভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের এ বিষয়টি দেখভাল করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি ভঙ্গ করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা সত্তে¡ও তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রতিহত করার জন্য তাকে আইনি ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি।
কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, নির্বাচনে যেকোনো উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে জনগণ মনে করেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ইলেক্টোরাল ম্যাজিস্ট্রেসি দেওয়া প্রয়োজন। যাতে তারা নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান করতে পারেন এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন।
প্রস্তাবনায় আরও জানানো হয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের ইলেক্টোরাল ম্যাজিস্ট্রেসি প্রদান করে আচরণবিধি তদারকিতে নিয়োজিত করা হলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা সহজ হবে। আরপিও প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ইলেক্টোরাল ম্যাজিস্ট্রেসি প্রদান করতে পারে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি তদারকি করার জন্য চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে/চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিয়োগ করা যেতে পারে বলে জানায় সংস্থাটি।
‘না ভোটের’ বিধান চালুর প্রস্তাব: ‘না ভোটের’ বিধান চালু চান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনকে এই প্রস্তাব দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। সংস্কার কমিশনকে দেওয়া লিখিত প্রস্তাবনায় ইসির কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, নির্বাচনে ‘না ভোট’ প্রদানের সুযোগ নাগরিকদের ক্ষমতায়নকে সংহত করবে যা প্রকৃত নেতৃত্ব বাছাই করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। আমাদের উন্নত গণতান্ত্রিক চর্চা এগিয়ে নিতে হলে অবশ্যই ‘না ভোট’ এর বিধান চালু রাখতে হবে। এক্ষেত্রে না ভোটের পরিমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে পুনঃনির্বাচনের ব্যবস্থা আমরা করতে পারবো।
‘না ভোট’-এর বিধান পুনরায় চালু করার যৌক্তিকতা হিসেবে ইসি কর্মকর্তারা জানান, সঠিক প্রার্থী বাছাইয়ে রাজনৈতিক দলের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করবে, প্রার্থীদের ওপর চাপ তৈরি করে, যাতে তারা তাদের নির্বাচনী প্রচারণা এবং কাজের মান উন্নত করে। যদি ভোটাররা দেখে যে কোনো প্রার্থীই যোগ্য নয়, তারা ‘না ভোট’ দিয়ে তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারে, যা পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থীদের দায়িত্বশীল হওয়ার উৎসাহ দেয়।

আওয়ামী লীগ কী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে?
আশিকুর রহমান: একটি গণহত্যা চালানোর পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার থাকা উচিত কি না, তা দেশের সাধারণ মানুষ বিচার-বিবেচনা করবেন বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। মঙ্গলবার সচিবালয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না জানতে চাইলে আইন উপদেষ্টা বলেন, এটা আমার বলার জায়গা না। এখন আপনি যদি মনে করেন, যারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার মানুষকে অঙ্গহানি করেছে, চোখ কেড়ে নিয়েছে, এখনো তারা সেই অপকর্মের পক্ষে কথা বলে। যদি ফাঁস হওয়া রেকর্ডটা সঠিক হয়, তাহলে এখনো তাদের নেত্রী ২৮৭ জনকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। অন্য দেশে বসে সন্ত্রাসী হুমকি দিচ্ছেন, যিনি একটা গণহত্যার মামলার আসামি। বিচারের আগে, দায়মুক্তির আগে তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাবে আরও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার জন্য? কাজেই সবকিছু একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা বিবেচনা করে দেখেন, একটা গণহত্যা চালানোর পর এখনো একটা দল বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমাদের এত বড় আন্দোলনের নেতাদের তারা কিশোর গ্যাং বলছে, আরও মানুষকে হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে, সেই দলের রাজনৈতিক অধিকার থাকা উচিত কি না তা দেশের প্রতিটি মানুষ বিবেচনা করবে। বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা যাবে, তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জাতিসংঘ’র প্রত্যাশা কী

ফলকার টুর্ক
সাদিত কবির: আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এসেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জাতিসংঘ তাদের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছে। ফলকার টুর্ক সরকারের সংস্কার কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি দুটি প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। এক. বিচার বিভাগ স্বাধীন করা। দুই. মৃত্যুদণ্ড রহিত করা। আইন উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা এটিকে নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছি। ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে টুর্ক বেশি প্রশ্ন করেছেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডরহিত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এটা রহিত করার সুযোগ আছে কিনা। আমরা বলেছি, বর্তমান বাস্তবতায় মৃত্যুদ- রহিতের সুযোগ নেই। পেনাল কোডে মৃত্যুদণ্ড’র কথা বলা আছে। হুট করে এটা পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
নির্বাচন নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আসিফ নজরুল বলেন, নির্বাচন নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তবে আপনাদেরকে আমি একটা কথা বলতে পারি- আমাদের সরকারের নির্বাচনমুখী প্রক্রিয়া গ্রহণ করার যে কাজ, সেটা শুরু হয়ে গেছে।
মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা সম্ভব নয়: দেশে ফৌজদারি আইনে মৃত্যুদণ্ড’র যে বিধান রয়েছে তা ‘বাস্তবতার নিরিখে বাতিল করা সম্ভব নয়’ বলে জাতিসংঘকে জানানোর কথা বলেছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। মঙ্গলবার সচিবালয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা সাংবাদিকদের বলেন। আসিফ নজরুল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এটা নিয়ে উনি (টুর্ক) বেশি প্রশ্ন তুলেছেন। উনি বলেছিলেন যে, মৃত্যুদø রহিত করার কোনো সুযোগ আছে নাকি। আমি বললাম এটা তো বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব না। কারণ আমাদের পেনাল প্রভিশন; আমাদের শত বছরের যে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম, যেখানে মৃত্যুদণ্ড’র বিধান আছে। এখন আমরা হুট করে যে ফ্যাসিস্টদের হাতে হাজার-হাজার তরুণ নিহত হয়েছে, হঠাৎ করে তার বিচারকে সামনে রেখে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করার প্রশ্নই আসে না।
২০১৭ সালে পিলখানা হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে হত্যা, ধর্ষণ, গুপ্তচরবৃত্তি, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিল হাই কোর্ট। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন না করলেও বেসামরিকদের অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে তা বড় ভূমিকা রাখে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩০ অক্টোবর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
আইনগত সংস্কারের সঙ্গে জাতিসংঘ ইনভলব: আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের যে আইনগত সংস্কার, সেটার সঙ্গে জাতিসংঘ ইনভলব আছে। আমাদের যদি কোনো ফরেনসিক বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট লাগে বা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং লাগে, সেটা উনারা দেবেন বলেছেন। আমরা সুবিচার করব। আমরা প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা থেকে বিচার করছি না। আমরা অবিচার করব না।
অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা, অভিযুক্তদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সাক্ষী আনার সুযোগ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক রাখার সুযোগ, অভিযুক্তদের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ প্রভৃতি বিষয়ে ফলকার টুর্ক প্রশংসা করেছেন বলে জানিয়েছেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার কথা বলেছেন হাই কমিশনার, সে বিষয়েও আমরা আমাদের প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছি। আমাদের সরকারের সংস্কারের যে কাজ, ট্রানজিশনাল ট্রান্সফরমেশনের কাজ, এই সরকারের প্রতি উনার সর্বাত্মক সমর্থনের কথা উনি জানিয়েছেন। উনি দুটি প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন, একটা হচ্ছে বিচার বিভাগ স্বাধীন করা। সেটা আমরা বলেছি, আমরা অবশ্যই কমিটেড এই প্রসঙ্গে। আমাদের প্রধান বিচারপতি একটা পৃথক সচিবালয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। অবশ্যই, সেটা আমরা নীতিগতভাবে গ্রহণ করি। কিন্তু এটা কীভাবে বাস্তবায়ন হইবে, সেটা আমরা আলাপ-আলোচনা করা ঠিক করব।
ইউডি/এজেএস

