বিদেশ থেকে এসেছেন ৬.২৪ লাখ!

বিদেশ থেকে এসেছেন ৬.২৪ লাখ!

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২০ মার্চ ২০২০ । আপডেট ২০:১০

চীনে উৎপত্তি করোনাভাইরাস বিশ্বকে বড় ধরনের ঝাকুনি দিয়েছে। একদেশ থেকে অন্যদেশে মানুষের ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণঘাতি এই জীবাণুটিও ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর অর্ধশতাধিক রাষ্ট্রে। সেই তালিকায় আছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের আগমন ঘটেছে প্রবাসীদের মাধ্যমে। এছাড়া বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিরা এ জীবাণু বহন করে থাকতে পারেন- সেই আশঙ্কায় তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে দেশে করোনাভাইরাসে কমপক্ষে ২০ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা গেছেন একজন। আরও একজনের অবস্থা গুরুতর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে বিদেশ ফেরৎ প্রবাসীদের। তবে তাদের মাধ্যমে পরিবারের অন্য সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। ফলে মানুষের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছে।

এরই মধ্যে মাদারীপুরের শিবচরকে ‘লকডাউন’ করা হয়েছে। তবে একটি উপজেলাকে  লকডাউন করে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা কি সম্ভব- এ নিয়ে মানুষের মাঝে প্রশ্ন আছে। কারণ, গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে করোনার সূচনার পর চলতি বছরের গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত ৫৫ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ করোনার কারছে আক্রান্ত দেশ থেকে ফিরেছেন। অন্যরা এসেছেন দেশে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ও সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূত্রে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর দিয়ে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন বিদেশ থেকে এসেছেন। এসব বন্দরে তাদের স্বাস্থ্যগত স্ক্রিনিং করা হয়েছে বলে দাবি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)। যদিও এ নিয়ে আগতদের ভিন্ন কথা আছে। সরকাটি সংস্থাটি জানায়, গত ১৭ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৪৫ জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ২ হাজার ৫১৮ জন। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আগত। প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টানে আছেন ৪৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ২০ জন। আইসোলেশনে রয়েছেন ১৯ জন।

আইইডিসিআরের তথ্য মতে, এ বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের শারীরিক স্ক্রিনিং শুরু হয়। ১৭ মার্চ পর্যন্ত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা স্ক্রিনিং করা যাত্রীর সংখ্যা ৩ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ জন, চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে ৭ হাজার ৯৫৫ জন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশনে ৭ হাজার ২৯ জন এবং অন্যান্য চালু স্থলবন্দরে স্ক্রিনিং করা যাত্রীর সংখ্যা ৩ লাখ ৬২১ জন।

দেশে প্রথম করোনা আক্রান্তরা ইতালিফেরত এবং তাদের স্বজন। গত ৮ মার্চ এ তথ্য জানায় আইইডিসিআর। এর এক সপ্তাহ পর সরকার ১৬ মার্চ দুপুর থেকে ব্রিটেন ছাড়া ইউরোপের বাকি দেশগুলো থেকে দেশে যাত্রী প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করে। অবশ্য ওই ঘোষণা খুব একটা বাস্তবায়ন বা কার্যকর হয়নি। তাছাড়া আগেই করোনাভাইরাস দেশে প্রবাসীদের মাধ্যমে প্রবেশ করেছে। এতে প্রবাসীসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন।

আইইডিসিআর জানায়, দেশে করোনা আক্রান্তদের বেশির ভাগ ইতালিফেরত প্রবাসী ও তাদের স্বজন। ফেরত আসা প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশে ক্রমান্বয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

২০ মার্চ, শুক্রবার পর্যন্ত আইইডিসিআরের তথ্য মতে, দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে একজন। আক্রান্তের সংখ্যা ২০ জন। যদিও আগে ১৭ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ জন। এরপর বুধবার (১৮ মার্চ) নতুন করে চারজন আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে একজন নারী ও তিনজন পুরুষ। আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা সেদিন বলেছিলেন, নতুন করে করোনায় আক্রান্ত চারজনের মধ্যে একজন আগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছিলেন। আর বাকি তিনজন বিদেশ থেকে এসেছেন। বিদেশ ফেরতদের মধ্যে দুজন ইতালি এবং একজন কুয়েত থেকে এসেছেন। এরপর আইইডিসিআরের সংবাদ ব্রিফিয়ে জানানো হয়, নতুন করে আরও তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তথা কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই তিনজনসহ দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ জনে। যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন, একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক আর তিনজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

চলতি মাসের ৮ তারিখে দেশে  প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করার তথ্য প্রকাশ করে আইইডিসিআর। আক্রান্তদের মধ্যে দু’জন ইতালিফেরত রয়েছেন। আরেক নারীও আক্রান্ত হন, যিনি ইতালিফেরত একজনের পরিবারের সদস্য। ওই তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে আইইডিসিআর জানিয়েছে।

এদিকে গত ১৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একব্যক্তি মারা যাওয়ার তথ্য প্রকাশ করে আইইডিসিআর। তিনি বিদেশফেরত ছিলেন না। করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ব্যক্তির বয়স ৭০ বছর। তিনি বিদেশ থেকে আসা ও সংক্রমিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাস উপদ্রুত চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে আটকে পড়া ৩১২ জন বাংলাদেশিকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। ২ ফেব্রুয়ারি তারা দেশে ফেরার পর হজ ক্যাম্পে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। তবে এদের মধ্যে কেউই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। সবাই সুস্থ অবস্থায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। এরপর চীন থেকে অনেকে ফিরেছেন। তবে বিমানবন্দরে তাদের স্ক্রিনিং করা হলেও কাউকেই আর কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়নি।

জানা গেছে, প্রথমে ইতালি ফেরতসহ আক্রান্ত দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা বলে আইইডিসিআর। গত ১৪ মার্চ থেকে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক করে সরকার। ওইদিন এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীদের কারাদণ্ড ও জরিমানা হবে।’ সরকারের এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে ব্রিটেন ফেরত সিলেটের সাবেক মেয়র কামরনা আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচিতে গত ১৭ মার্চ অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন কামরানও। বিষয়টি গণমাধ্যমে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ সমালোচিত হয়। কিন্তু তাকে জরিমানার আওতায় আনা হয়নি। এ নিয়ে বিএনপি নেতারা প্রশ্ন তোলেন। এর পর ১৯ মার্চ তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন বলে জানান।

দেখা গেছে, বিদেশফেরতদের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা হলেও অনেকেই তা মানছেন না। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বিভিন্ন জনের ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এই অভিযোগে বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকজনকে অর্থদণ্ড দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিদেশফেরতদের মধ্যে ১৫ জেলায় ৩৪ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে না থাকায় অর্থদণ্ড দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু এই জরিমানা বা অর্থদণ্ড দিয়ে প্রকৃতপক্ষে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা কতটা সম্ভব তা নিয়ে নানা মহলের প্রশ্ন আছে।

কারণ আইইডিসিআর জানিয়েছে, করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯ রোগ) অত্যন্ত ছোঁয়াচে, যা  শরীরে ১৪ দিন সুপ্ত থাকতে পারে। শুধু মানবদেহ নয়, বাতাস এবং যেকোনো বস্তুর উপর কমপক্ষে চারদিন পর্যন্ত করোনার জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে বলে মার্কিন এক গবেষণায় দেখা গেছে। কাজেই বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস যাতে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে না পড়তে পারে, সেজন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশে ফেরা প্রবাসীদের নিজ নিজ বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার খুব যে সুফল মিলেছে তা বলার সুযোগ নেই। কারণ, এখন পর্যন্ত ২০ জন আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন তারা ইতালি, কুয়েত ও আমেরিকা থেকে আসা ব্যক্তি ও তাদের মাধ্যমে পরিবারসহ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা রয়েছেন।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ লক্ষণযুক্ত মার্কিন প্রবাসী একব্যক্তি বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কোনও প্রকার যোগাযোগ ছাড়াই মার্কিন আমেরিকায় ফিরে গেছেন। তার তথ্য মার্কিন দূতাবাসে জানানো হয়েছে। আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘যেসব ব্যক্তি কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশ থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসে গৃহ/স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনের নিয়মকানুন মানছেন না এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে  দূরত্ব বজায় রাখছেন না, তারা পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। বাংলাদেশে যে পাঁচ ব্যক্তি দেশে বসেই কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন, তারা সবাই প্রবাস থেকে ফিরে আসা নিকটজনদের কাছ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন।’ তবে এই সংক্রামণ আরও যে ছড়িয়ে যাবে না তা বলার সুযোগ নেই। কারণ, প্রায় ৬ লাখ বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের কোনোভাবেই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। সরকারি নির্দেশনা অনেকেই মানছেন না। তারা সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পাশাপাশি উম্মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। আবার হাসপাতাল থেকে কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর আক্রান্ত রোগির পালিয়ে যাওয়ার খবরও আছে। ফলে দিন দিন পরিস্থিতি জটিল হতে যাচ্ছে বলে ধারণা অনেকের।

আইইডিসিআর পরিচালক ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘আমাদের অনুরোধ পরিবার, সমাজ ও দেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থে বিদেশ থেকে ফিরে আসা যাত্রীরা ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন পালন করুন। কোয়ারেন্টাইন পালন করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।’ সেই সঙ্গে করোনা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে বেশ কিছু হটলাইন নম্বর দেয়া হয়েছে আইইিডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। জনসচেতনায় প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য হটলাইন নম্বরগুলো এখানে তুলে ধরা হলো-

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইন নম্বর: ১৬২৬৩, আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বর: ০১৫৫০০৬৪৯০১, ০১৫৫০০৬৪৯০২, ০১৫৫০০৬৪৯০৩, ০১৫৫০০৬৪৯০৪, ০১৫৫০০৬৪৯০৫, ০১৪০১১৮৪৫৫১, ০১৪০১১৮৪৫৫৪, ০১৪০১১৮৪৫৫৫, ০১৪০১১৮৪৫৫৬, ০১৪০১১৮৪৫৫৯, ০১৪০১১৮৪৫৬০, ০১৪০১১৮৪৫৬৩, ০১৪০১১৮৪৫৬৮, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯৩৭১১০০১১।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading